
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশত্যাগের তীব্র প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটা কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক গভীর ও বহুমুখী প্রতিফলন। কেন দেশ ছেড়ে যাওয়া আজ অনেক বাঙালির কাছে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে (বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে), তা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন, তথ্য ও জনমতের ভিত্তিতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
গবেষণার আলোকে ‘ভাগতে চাওয়া’ প্রজন্ম
ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ- ২০২৪’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন এই প্রবণতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
১। বিদেশের প্রতি তীব্র আগ্রহ- গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ তরুণ (১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী) পড়াশোনা বা কাজের উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে যেতে আগ্রহী।
২। আস্থাহীনতা- ২০১৫ সালের জরিপে ৬০ শতাংশ তরুণ বিশ্বাস করতেন, দেশ ঠিক পথেই এগোচ্ছে, কিন্তু ২০২৩ সালে এসে এই হার নেমেছে ৫১ শতাংশে, যা তরুণদের মধ্যে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থাহীনতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
৩। উদ্বেগের কেন্দ্রে বেকারত্ব- দেশের ৪২ শতাংশ তরুণ বেকারত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, বেকারত্বের প্রধান কারণ হলো-
*দুর্নীতি ও স্বজনপোষণ- ৩৭ শতাংশ।
*নিয়োগে বৈষম্য- ২০ শতাংশ।
*যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের অভাব- উচ্চশিক্ষা শেষেও শিক্ষার সাথে সংগতিপূর্ণ পেশায় কাজ করতে না পারা ও বেতন বৈষম্য তাদের বিদেশে যেতে উৎসাহিত করছে।
অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা ও আর্থিক লুণ্ঠন
দেশের অর্থনীতিতে চলমান সংকট ও সুশাসনের অভাব মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে।
১। আর্থিক বৈষম্য ও সংকুচিত আয়- মূল্যস্ফীতি, টাকার মূল্যমান কমে যাওয়া, রিজার্ভ সংকট ও ব্যাংকিং খাতে নানা সমস্যার কারণে সাধারণ মানুষের আয়ের সংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, আয়ের ও সম্পদের বৈষম্য দিন দিন বেড়েই চলছে। এটা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
২। দুর্নীতি ও অর্থ পাচার- অর্থনৈতিক সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অর্থ খাতের লুণ্ঠন ও ব্যাংক খাতের দুর্নীতি। বিপুল অর্থ গোপনে বিদেশে পাচার হচ্ছে এবং দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের সাথে জড়িত অভিজাত শ্রেণির ক্ষমতা তাদের আর্থিক সংস্কারের বিরোধিতা করতে উৎসাহিত করছে। এই অর্থ পাচারের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সৎ ও সাধারণ নাগরিককে হতাশাগ্রস্ত করছে।
৩। কর্মসংস্থানের ব্যর্থতা- বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত ও অল্প-শিক্ষিত তরুণের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ধরনের ব্যর্থতা আছে। এই হতাশা থেকেই অনেকে নিরুপায় হয়ে কঠিন পথে বা মানবেতর জীবনযাপনের ঝুঁকি নিয়েও বিদেশে পাড়ি জমাতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুশাসনের অভাব ও জবাবদিহিতার ঘাটতি দেশকে তরুণদের চোখে অনিরাপদ করে তুলেছে।
১। জবাবদিহিতার অভাব- বাংলাদেশের সুশাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাব। দুর্বল সংসদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাব ও প্রশাসনের অস্বচ্ছতা দুর্নীতির জন্ম দিচ্ছে।
২। আইনের শাসনের দুর্বলতা- দেশে আইনের শাসনের অভাব রয়েছে এবং বিদ্যমান আইনের সঠিক চর্চা হয় না। ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও অপহরণের মতো ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
৩। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ- এখানে প্রশাসন সবসময় রাজনৈতিক দলের নির্দেশনায় চলে, যা প্রশাসনিক স্বাধীনতা ও প্রকৃত কর্মক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে জনস্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পায়।
৪। স্থিতিশীলতার অভাব- ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের পারস্পরিক অসহনীয় আচরণের কারণে দেশের উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।
শিক্ষার মান ও চাকরির বাজারে মেধার অবমূল্যায়ন
উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন এবং চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী করছে।
১। শিক্ষার নিম্নমান ও মুখস্থ সংস্কৃতি- ব্রিটিশ কাউন্সিলের গবেষণা অনুযায়ী, ৪৯ শতাংশ তরুণ ‘পুওর টিচিং কোয়ালিটি’ বা পাঠদানের নিম্নমানের কথা বলেছেন, যা আধুনিক কর্মবাজারের সাথে সামঞ্জস্যহীন। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের নিয়োগ প্রক্রিয়া (বিশেষ করে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে) এখনো মূলত মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে জ্ঞান প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা বা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাইয়ের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।
২। মেধার অবমূল্যায়ন- মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শীরা এগিয়ে যাওয়ায় বাস্তব দক্ষতায় সক্ষম তরুণরা চাকরির দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে। এর ফলে প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণে বিশ্লেষণশক্তিহীন কর্মকর্তারা স্থান পাচ্ছেন, যা উদ্ভাবনী চিন্তার পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক জড়তা তৈরি করছে।
৩। বিদেশী কর্মীর আধিপত্য- মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেখানে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, সেখানে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অনেক বিশেষায়িত চাকরির ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে কর্মী এনে চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ১৫ হাজারের বেশি বিদেশীকে চাকরির জন্য ওয়ার্ক পারমিট অনুমোদন দিয়েছে।
মেধা পাচার এর অশনি সংকেত
ইউনেস্কোর তথ্যমতে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫ বছরে তিন গুণ বেড়েছে। এই প্রবণতা দেশের জন্য ‘ব্রেন ড্রেইন’ বা মেধা পাচারের অশনি সংকেত। তরুণ প্রজন্ম দেশকে ভালোবাসে, কিন্তু তাদের এই দেশত্যাগ ‘বাধ্য হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত’। তারা এমন একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মেধা-ভিত্তিক ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা চায়, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হবে, চাকরি পেতে তদবির বা ঘুষের প্রয়োজন হবে না এবং আর্থিক নিরাপত্তা থাকবে। যতদিন পর্যন্ত সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও মুখস্থনির্ভর নিয়োগ প্রক্রিয়ার অদৃশ্য শেকল ভাঙা না যাবে, ততদিন পর্যন্ত ‘জাগো বাঙালি জাগো, দেশ ছেড়ে ভাগো’ মন্ত্রটি প্রজন্মের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে। এই প্রবণতা থামাতে হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে মৌলিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
লেখক- ত্বাইরান আবির
লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক