
বিশেষ প্রতিবেদন
কখন যে রাষ্ট্র আমাকে শত্রু ভাবতে শুরু করল—তা আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।
শুধু বুঝতে পারি, একসময় আমি নিজের নামটাই ভয় পেতে শুরু করেছিলাম।
আমার নাম আর আমার থাকেনি—
কখনো আমি হয়ে গেলাম স্বপনদা,
কখনো বড় ভাই,
কখনো বা আরেকটা কিছু।
আর ফাইলের পাতায় লেখা থাকত একটাই নির্দেশ—
“জীবিত অথবা মৃত, শিবির নেতা খোরশেদকে ধরতে হবে।”
২০১৩ সালের দিকে নারায়ণগঞ্জের একটি আইনশৃঙ্খলা সভা বসে।
সভায় ছিলেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং দলীয় প্রভাবশালীরা।
সভা শেষের পর আমার এক সিনিয়র, বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল বারী ভূঁইয়া ফোন করে এডভোকেট মাইনুদ্দিন ভাইকে বললেন—
“মাইনুদ্দিন, তোমাদের খোরশেদ কে?”
এরপর যে কথাটা আসে, সেটা আজও কানে বাজে—
“আজ সিদ্ধান্ত হয়েছে, ওকে জীবিত না পেলে গুলি করে মৃত অবস্থায় আনতে হবে।”
খবরটা কানে আসতেই বুকের ভেতর শূন্যতা নেমে এলো।
বাইরে কিছু হয়নি এমন ভান করলাম।
প্রথমেই জানালাম আমাদের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি, আজকের মহানগর আমীর—আব্দুল জব্বার ভাইকে।
সে সময় দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ছিলেন কারাগারে।
আব্দুল জব্বার ভাই শান্ত কণ্ঠে কুরআনের আয়াত শোনালেন—
“তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই—যদিও তোমরা সুউচ্চ, সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করো।”
— সূরা আন নিসা, আয়াত ৭৮
আমি ভেতরে ভেতরে ট্রমাটাইজড হয়ে গেলাম।
ভয় পেলাম, কিন্তু কাউকে বলতে পারলাম না।
গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত আমি লড়ে গেছি এক ভয়াবহ মানসিক যুদ্ধে—
নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গে,
আর ভয়ংকর অর্থকষ্ট নিয়ে।
আমাকে ধরতে গিয়ে বক্তাবলীর পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক বদমাইস নাজমুল,
রামনগরের এক নিরীহ খোরশেদকে অমানুষিক নির্যাতন করে অঙ্গহানি করে দেয়।
মাসের পর মাস বিনা চিকিৎসায় জেলখাটার কারণে আজও তার এক কান দিয়ে পুঁজ ঝরে—
রাষ্ট্রের দেওয়া এক নিষ্ঠুর স্মারক হয়ে।
আমাকে ধরতে গিয়ে ধর্মগঞ্জের খোরশেদ ভাইসহ
খোরশেদ নামের আরও কত মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে—
আর আমি ২০২৩ সাল পর্যন্ত অধরাই থেকে গেছি।
আমি প্রায় মোবাইল ব্যবহারই করতাম না।
সিটিসেল নম্বর বদলাতাম কয়েক দিনের ব্যবধানে।
রূপায়নের একটি ফ্ল্যাটে একা থাকতাম।
কর্মসূচি শেষ করেই অন্য জেলায় চলে যেতাম।
একই জামা পরে মিছিল করতাম—
মিছিল শেষ করে জামা বদলে বাইকে উধাও।
অনেকে ধরা পড়ত, নির্যাতিত হতো।
আমি থাকতাম ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বেগম জিয়ার নেতৃত্বে কর্মসূচি চলতো এভাবেই।
আর আমি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছিলাম এক ছায়ামানুষ।
জেলজীবনের শুরু যদি দেরিতে হয়ে থাকে—
তার একটি ঘটনা ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১১।
ধানমন্ডির হারুন আই হাসপাতালে
জীবন্ত শহীদ আব্দুল মোমিন ভাইকে দেখতে গিয়ে
মহানগর সভাপতি নাছির উল্লাহ ভাইসহ
সকল গুরুত্বপূর্ণ সেক্রেটারিয়েট সদস্য গ্রেফতার হন।
আমি পালাতে গিয়ে লিফটে উঠলাম।
নিচে নামার কথা—
কিন্তু লিফট আমাকে উপরে তুলে নিল।
রোগী সেজে সেদিন আমি বাইরে রয়ে গেলাম।
২০১৫ সালে মহানগর সভাপতির দায়িত্ব শেষ হলো।
সেটআপ প্রোগ্রামেই বাইকের চাবি, বাসার চাবি—সব হস্তান্তর করলাম।
অর্থ বিভাগ থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ করলাম।
হিসাবপত্র পাইপাই বুঝিয়ে দিলাম।
সাংগঠনিক বিদায় মানে শুধু পদ ছাড়ানো নয়—
এটা সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে নৈতিক নির্বাসন।
ব্যাংকে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যবহার করার অনুমতি নেই।
জনশক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ না করাই শ্রেয়।
বাড়ি যাওয়ার উপায় নেই—মামলার ভয়ে।
চাকরি নেই।
এক জায়গায় থাকা যায় না।
ঘুমানোর নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই।
কয়েকদিন আগেও আমি ছিলাম প্রভাবশালী এক সভাপতি—
আজ আমি যেন রাস্তার ভিক্ষুক।
মহানগর জামায়াত আমার ওপর আগেই রাগান্বিত ছিল।
কারণ আমি প্রশ্ন করতাম।
জবাব চাইতাম।
কর্মসূচিতে কোন শাখা থেকে কত লোক আসছে—জানতে চাইতাম।
আমি ছোট মানুষ,
আমার প্রশ্নে তারা অপমান বোধ করত।
সম্প্রতি এক সাবেক ভাইয়ের ঘটনার পর এক মিটিংয়ে গিয়ে দেখি—
সেইফ জোনের নেতারা আজও বহাল।
সেখানে রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি।
এভাবেই আমি গুপ্তজীবনের বাসিন্দা হয়ে গেলাম।
আস্তে আস্তে হয়ে উঠলাম দরবেশ।
আমাকে দেখলে সেইফ জোনের নেতারা ঠাট্টা করে বলত—
পীরসাব,
কোন পীরের ভক্ত,
তাহেরী ইত্যাদি।
তারা জানে না—
এই দরবেশি কোনো সাধনা নয়।
এটি বেঁচে থাকার শেষ কৌশল।
(চলবে…)
লেখকের নোট:
এই লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত ফেসবুক টাইমলাইনে ধারাবাহিক আত্মকথা হিসেবে প্রকাশিত।
সংবাদপাঠকের স্বার্থে ভাষা ও বিন্যাসে সামান্য সাহিত্যিক সম্পাদনা করা হয়েছে,
তবে বক্তব্য ও অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব।