
রমজান মাহমুুদ
বিনয় হোটেল। ১৩০ বছরের প্রাচীন একটি খাবার হোটেল। লৌহজং ঘোড়দৌড় বাজারের ছিমছাম এক হোটেলের নাম; খুব বেশি পরিপাটি না হলেও এর পরিচালনার সাথে যুক্তদের বিনয়ী ব্যবহারে খরিদ্দারদের খুব সহজে আকৃষ্ট করতে পারে । তাছাড়া রয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ঘরোয়া খাবার মান। বর্তমান আধুনিক খাবার হোটেল বলতে যা বোঝায়, তার কোন কিছুই এখানে নেই। তবে বিনয় হোটেল বিনয়ীতার কারণে ক্রেতা মহলে এখনো টিকে আছে। এখানে মালিক যিনি, কর্মচারীও তিনি। এ হোটেলের সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠে ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে। তখন পদ্মার পাড় লৌহজং প্রায়ই ঘুরতে আসতাম। সপ্তাহ একবার নদীর তীরে আসা হতো। বিকেল কাটতো গাউদিয়া গ্রামে। গাউদিয়া বাজার হতে হেটে আসতাম মৃধা বাড়ি পর্যন্ত। আবার কখনো নদীর তীরে বসে থাকতাম ঘন্টার পর ঘন্টা। ২০১৬ থেকে ২০১৯ এখানে আসা বাতিক রোগে পরিণত হয়। এতে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়, পদ্মা পাড় না আসলে নিজেকে এক অস্থির জগতে সমর্পণ করে ফেলি। অবশেষে মানসিক প্রশান্তির জন্য পদ্মার পাড় আসা। এসময় হাঁসাড়া কালীকিশোর স্কুল এন্ড কলেজে কর্মরত ছিলাম। স্কুল স্ট্যান্ড হতে গাঙ্গচিল পরিবহন করে মালিরঅঙ্ক নেমে রিক্সা করে গাউদিয়া বাজার। অথবা ঘোলতলী নেমে রিক্সায় গাউদিয়া। এ দুটি রুটেই যাতায়াত হতো বেশি। বাজার হতে মৃধা বাড়ি পর্যন্ত এ পাশটিতে কেটেছে চার বছর। দুপুরে খেতাম বিনয় হোটেলে। লৌহজং কিংবা পদ্মায় ভ্রমণে গেলে এ হোটেলেই দুপুরে ভোজন সারা হতো। স্বগীয় মনোরঞ্জণ তালুকদার ১৮৯৬ সালে দুয়াল্লি বাজারে এ হোটেলটি প্রতিষ্ঠা করেন। পদ্মায় দুয়াল্লি ভেঙে গেলে তিনি হোটেল ব্যবসা নিয়ে চলে আসেন দিঘলীতে। দিঘলী তখন খুব ব্যস্থ নৌ বন্দর। সমগ্র বিক্রমপুরে এ বন্দরের বেশ নাম ডাক ছিল। দিঘলী বাজার ১৯৮৫ সালে পদ্মায় ভেঙে গেলে বিনয় হোটেল পালের বাজার স্থানান্তরিত হয়। পদ্মা বারবার তার গতিপথ পরিবর্তণের কারনে বিনয় হোটেলকেও পাঁচ বার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে, সর্বশেষ তার ঠিকানা হয়েছে ঘোড়দৌড় বাজারে। মনোরঞ্জন তালুকদারের পুত্র বিনয়কৃষ্ণ তালুকদার(১৯৩৪-২০১৩) এ হোটেল পরিচালনায় ছিলেন, তিনি মৃত্যু বরণ করলে বর্তমান তাঁর দু’পুত্র গোপালকৃষ্ণ তালুকদার ও ভোজেনকৃষ্ণ তালুকদার পূর্ব পুরুষদের এ ব্যবসা ধরে রেখেছেন। এ হোটেলটি ভালো লাগার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। অন্যান্য হোটেলে খেতে গেলে যেখানে সবকিছু প্রয়োজনে চেয়ে নিতে হয়, কিন্তু বিনয় হোটেলে যারা আছেন তারা প্রতিটি ক্রেতার কাছে এসে জিজ্ঞেস করবেন, ‘দাদা, কিছু লাগবে’ কিংবা নিজে উদ্যোগী হয়ে আগতদের আন্তরিকতার সহিত ভাত, তরকারি ও অন্যান্য খাদ্য উপকরণ পরিবেশন করতে গিয়ে বলবেন-‘দাদা আর একটু দেই।’ আমরা কোথাও বেড়াতে গেলে যেমনভাবে খাদ্য পরিবেশন করা হয়। অনেক সময় জোড় করে হলেও প্লেটে খাদ্য সামগ্রী তুলে দেন। তেমনটি করে বিনয় হোটেল কর্তৃপক্ষ। এখানে যে তাদের মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকে এমনটিও নয়! কারণ তাদের খাবার নিদিষ্ট প্যাকেজ অর্ন্তভুক্ত। ১২০-১৫০ টাকায় আনলিমিটেড ভাত, সবজি, ডাল ও তরকারি পাওয়া যায়। বরং ক্রেতাদের আপন ভেবেই তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেন। আমার কাছে তাদের এ ব্যবহারটি মুগ্ধ করে। আমরা বিক্রমপুরের মানুষজন আত্মীয়র বাড়িতে বেড়াতে গেলে এমন আচরণ পেয়ে থাকি। যা ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি। মূলত এ কারণে লৌহজং এলে এ হোটেলেই খাবার খাই।
২০১৯ খ্রিস্টাব্দের আগষ্ট হতে লৌহজং আছি কর্মসূত্রে। এখন আর পদ্মা দেখার জন্য আয়োজন করে আসতে হয় না। ঘুম উঠে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত পদ্মার পাশেই থাকি সার্বক্ষণিক। এজন্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তিনি আমার আন্তরিক চাওয়াগুলো কোন না কোনভাবে পূরণ করেছেন। লৌহজং আছি সাত বছর চলছে, এ সাত বছরে এ হোটেলে মাত্র ৪-৫ বার খেয়েছি। আমার বাসা থেকে দুরুত্ব মিনিট দশেকের পথ। তবুও কনোজানি এতো কাছে অবস্থানের পরও এতো কম যাওয়া। সর্বশেষ গত ২৭ জানুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশিক্ষণে গিয়ে এখানে দুপুরের খাবার খাই ইলিশ দিয়ে। ভোজেনকৃষ্ণ তালুকদার কাছে এসে বেশ উৎফুল্ল হয়ে একটু নিচু স্বরে হাসিমাখা মুখে বললেন, ‘অনেক দিন পর আসলেন দাদা।’ আমি ক্ষাণিকটা অবাক হলাম। সত্যিই তো অনেক দিন পর এসেছি। তবে তা তিনি মনে রেখেছেন! বিনয় হোটেল এ কারণেই আমার মনে গেঁথে থাকে। যদিও সামনাসামনি আসা হয় না। ব্যবহার মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে মানুষের মনে। আমার আর বিনয় হোটেলের ক্ষেত্রে এমন ঘটনাই ঘটেছে!
অথচ বিনয় হোটেলের সামনে দিয়েই সপ্তাহ অন্তত একবার যাতায়াত হয়। লৌহজং পুরনো থানা কমপ্লেক্সের উত্তর পাশে লৌহজং-মুন্সিগঞ্জ প্রধান সড়কের পাশেই বিনয় হোটেল। যখনই এ পথ দিয়ে যাই অটো হতে একবার হলেও তাকাই হোটেলের দিকে। দেখি গোপালকৃষ্ণ ও ভোজেনকৃষ্ণ ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্রেতাদের নিয়ে। আর আমার কানে ভেসে আসে, ‘দাদা আর একটু দেই!’