
মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুরের দীপ্ত সন্তান
দেশীয় চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র চাষী নজরুল ইসলাম
বর্ষন মোহাম্মদ
দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে কজন নির্মাতা নিজেদের কর্মে এক আলাদা উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তাদের অগ্রভাগে রয়েছেন চাষী নজরুল ইসলাম। নির্মাতা, অভিনেতা ও মুক্তিযোদ্ধা—বহুমাত্রিক পরিচয়ে সমৃদ্ধ এই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্যামেরার পেছনে থেকে ঢালিউডকে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য স্মরণীয় সৃষ্টি।
বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ওরা ১১ জন পরিচালনার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম তার কাজের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল। নির্মাণে নান্দনিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন দর্শকের হৃদয়ের নির্মাতা।
চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালনার জন্য একাধিকবার জাতীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৮৬ সালে শুভদা এবং ১৯৯৭ সালে হাঙর নদী গ্রেনেড চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০৪ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া ‘সংগ্রাম’ চলচ্চিত্রের জন্য বাংলাদেশ সিনে জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড (১৯৭৪), শের-ই-বাংলা স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৮), স্যার জগদীশচন্দ্র বসু স্বর্ণপদক (১৯৯৫), জহির রায়হান স্বর্ণপদক ও আজীবন সম্মাননাসহ আন্তর্জাতিক কালাকার পুরস্কার (২০০৫) অর্জন করেন।
সংগঠন ও ক্রীড়াঙ্গনেও ছিল তার সক্রিয় ভূমিকা। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে চারবার সভাপতি নির্বাচিত হন। পাশাপাশি চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য, যৌথ প্রযোজনা কমিটির নির্বাহী সদস্য, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন ফুটবল লীগ অ্যাসোসিয়েশনের ফুটবল সম্পাদক ও ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও যুক্ত ছিলেন।
১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর শ্রীনগর থানার সমষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা মোসলেহ উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন ভারতের বিহারে টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানির প্রকৌশলী। মা-বাবার জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে পারিবারিক দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিতে হয় তাকে। ১৯৫৭ সালে বাবার মৃত্যুর পর এজি অফিসে পোস্ট-সর্টার হিসেবে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত চাকরি করেন।
তার নামকরণের গল্পটিও ব্যতিক্রমী। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক-এর দেওয়া নাম ‘চাষী নজরুল ইসলাম’—যেখানে ‘চাষী’ শব্দটি নেওয়া হয় তার মামা চাষী ইমাম উদ্দিনের নাম থেকে এবং ‘নজরুল ইসলাম’ অংশটি নেওয়া হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর নাম থেকে।
চলচ্চিত্রে তার আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয় ১৯৬১ সালের জুন মাসে। ‘আছিয়া’ ছবিতে স্বল্প উপস্থিতির চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলেও পরদিনই সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্যতম স্তম্ভ।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের ইতি ঘটে ২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি, লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তবে সৃষ্টি ও কর্মের মধ্য দিয়ে চাষী নজরুল ইসলাম আজও অমলিন—দেশীয় চলচ্চিত্রের আকাশে তিনি চিরজাগরুক এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।