
মো. খায়রুল ইসলাম হৃদয়
ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ পরিবহনে নিরাপত্তা বিধি মানতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে গজারিয়ার সিঁকিরগাঁও এলাকায় অবস্থিত সামুদা কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডবাহী একটি ট্রাক রাস্তার মাঝখানে ট্যাংক ফেটে রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বাতাসে মিশে যায় তীব্র ধোঁয়া। পথচারী, দোকানদার, স্কুলগামী শিক্ষার্থী, এমনকি গৃহস্থালি কাজে বের হওয়া মানুষজন চোখ-মুখ জ্বালা ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন। অনেকে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।
গত এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা কমপক্ষে তিনবার ঘটেছে। গত বছরের একই এলাকায় এক ট্রাক থেকে তরল রাসায়নিক পড়ে কয়েকজন ধোঁয়ার ঝাঁজালো দূরগন্ধ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এর আগে মে মাসে হোসেন্দি ইউনিয়নের জামালদি স্টান্ড সড়কে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিকের ধোঁয়ায় যাত্রী সহ স্কুলের কয়েক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। এসব ঘটনার পরও কোম্পানির পক্ষ থেকে পরিবহন নিরাপত্তা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।তাছাড়া কয়েকদিন পর পর এ প্রতিষ্ঠানের গাড়িগুলো দূর্ঘটনা ঘটায়।এ মাসের শুরুতে হোসেন্দি ইউনিয়নের সিরাজুল হক স্কুলের প্লে শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থীর উপর কোম্পানির গাড়ির দেয়াল ধাক্কায় একজন নিহত হয়েছে,অপর জন্য এখনও সুস্থ্য হয়নি।এ বিষয়ে স্থানীয়রা মানববন্ধন করে সে সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট স্বারক লিপি জমা দিলেও কোনো সমাধান পায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ বলেন, এভাবে বারবার রাসায়নিক পড়ে গেলে আমরা কিভাবে বাঁচব? আমার ছোট্ট সন্তান বমি করেছে। একদিন হয়তো বড় দুর্ঘটনা হবে। শিক্ষক রহিমা বেগম জানান, রাস্তার ধোঁয়ায় চোখে পানি আসায় কিছুই দেখতে পাইনি। এভাবে দুর্ঘটনা হলে প্রাণহানি ঘটতে পারে। রিকশাচালক রফিক মিয়ার প্রশ্ন, আমরা যদি অসুস্থ হই, চিকিৎসার খরচ দেবে কে? কোম্পানির অবহেলায় আমরা কষ্ট পাচ্ছি।
চিকিৎসক ও স্থানীয়রা বলছেন, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও অন্যান্য রাসায়নিক বারবার বাতাসে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এর ফলে হাঁপানি, ত্বকের সমস্যা, চোখের স্থায়ী ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এলাকায় শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ডাকা হয়েছে। নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়টি যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তবে কোম্পানির মানবসম্পদ কর্মকর্তা মো. হাফিজ দুর্ঘটনার জন্য রাস্তার খারাপ অবস্থা দায়ী করেন। আর লজিস্টিক ম্যানেজার শহিদুল্লাহ বলেন, আজকের ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত, আমরা ভবিষ্যতে পরিবহনে আরও সতর্ক হবো।
গজারিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন কমান্ডার মো. ফিরোজ আলম জানান, তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে রাসায়নিক পরিষ্কার করেন।অন্যদিকে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন,কেউ অভিযোগ না করলেও এটি পরিবেশ দূষণ। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাসায়নিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড উত্তপ্ত হলে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। তাই উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান কঠোরভাবে অনুসরণ বাধ্যতামূলক। সামুদা কেমিক্যাল কোম্পানি এ নিয়ম লঙ্ঘন করছে কিনা, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।