
মুন্সিগঞ্জে সরকারি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন
ত্বাইরান আবির
মুন্সিগঞ্জের জন্য এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত উন্নয়ন সংবাদগুলোর একটি হলো সরকারি পর্যায়ে একটি নতুন পাবলিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন পাওয়া। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান ছিল এবং অবশেষে মন্ত্রিপরিষদ কমিটি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন শেষে প্রকল্পটি অনুমোদনের পর্যায়ে এসেছে। যদিও এখনো ক্যাম্পাসের চূড়ান্ত লোকেশন বা প্লট নির্ধারণ হয়নি, তবে প্রশাসনিকভাবে জেলা সদর এলাকা এবং তার আশপাশকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
এই অনুমোদন শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্থানীয় কর্মসংস্থান, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং জেলাভিত্তিক উন্নয়ন চক্র সব দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করে।
মুন্সিগঞ্জ জেলার স্বাস্থ্য খাত বরাবরই নানামাত্রিক সংকটে পর্যবসিত হয়েছে। ঢাকা থেকে মাত্র ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে হলেও বহু বছর ধরেই বিশেষায়িত চিকিৎসা, উচ্চমানের হাসপাতাল সুযোগ, জরুরী সেবা এবং নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অভাব নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল। বড় কোনো সরকারি চিকিৎসা ইকোসিস্টেম না থাকায় জরুরী রোগী বাঁচাতে জেলার মানুষকে দ্রুত ঢাকায় পাঠানো ছাড়া উপায় থাকে না- এ বাস্তবতা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় জনমত বারবার তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে শিক্ষা ক্ষেত্রে মেডিকেল ও স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষার জন্য মুন্সিগঞ্জের শিক্ষার্থীদের ঢাকামুখী হতে হয়। সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুপস্থিতি (বিশেষ করে পাবলিক সেক্টরে) শিক্ষা বৈষম্য ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘদিনের চাপ ছিল। এই অনুমোদনকে তাই স্থানীয়রা ডুয়াল-ইমপ্যাক্ট হিসেবে দেখছেন, যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা একসাথে উন্নয়ন ঘটাবে।
বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষা খাতকে হাই-ইমপ্যাক্ট ডেভেলপমেন্ট সেক্টর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ চিকিৎসা শিক্ষা মানে শুধু ডাক্তার প্রস্তুত করা নয়- এটি মেডিকেল টেকনোলজি, নার্সিং, ডায়াগনস্টিক, ফার্মা ও হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট খাতকে একযোগে গতিশীল করে। যেসব জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে (গাজীপুর, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, পটুয়াখালী, কিশোরগঞ্জসহ), প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি সেখানে স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
মুন্সিগঞ্জও একই পথ ধরে এগোতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশেষত পদ্মা সেতুর পর দক্ষিণাঞ্চল ও জেলা শহরগুলোর উন্নয়ন চক্র সক্রিয় হওয়ায় মুন্সিগঞ্জ হয়ে উঠছে ঢাকা-দক্ষিণাঞ্চল করিডরের একটি কেন্দ্র। মেডিকেল কলেজ এই ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়াবে।
একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা মানে সাধারণত ১,০০০-২,০০০ সরাসরি চাকরি, ৮০০-১,২০০ স্বাস্থ্যকর্মী, বছরে অনেক ডাক্তারের গ্র্যাজুয়েশন, ১,০০০-৫,০০০ পরোক্ষ কর্মসংস্থান, আবাসন, বাজার, পরিবহন, খাদ্য ব্যবসা বিস্তার, ফার্মা ও ডায়াগনস্টিক সেক্টরের উত্থান।
এছাড়া ভর্তি, হোস্টেল, একাডেমিক স্টাফ নিয়োগ, হাসপাতাল ব্যয়, মেডিকেল সামগ্রী ও অপারেশনাল বাজার সবমিলিয়ে অঞ্চলভিত্তিক অর্থনীতি বছরে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন তৈরি করে।
এজন্য জেলা চেম্বার অফ কমার্সও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে।
এই অনুমোদন শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, সাথে যুক্ত থাকবে পূর্ণাঙ্গ টিচিং হাসপাতাল। সাধারণত ২৫০-৫০০ বেডের সরকারি হাসপাতাল এমন টিচিং ইউনিটের সাথে যুক্ত থাকে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সুবিধা। এতে ডেলিভারি ও শিশু চিকিৎসা, সার্জারি, মেডিসিন, আইসিইউ/সিসিইউ, ট্রমা কেয়ার, এমার্জেন্সি, কার্ডিওলজি, এন্ডোক্রাইন, ডায়াগনস্টিক ইমেজিং, ক্যানসার স্ক্রিনিং, হৃদরোগ/স্ট্রোক চিকিৎসা, নার্সিং ও প্রযুক্তিবিদ প্রশিক্ষণ সব ধরনের সেবা যুক্ত হতে পারে।
মুন্সিগঞ্জে বর্তমানে হাই-ডিপেনডেন্সি হাসপাতাল এর অভাব রয়েছে। বড় দুর্ঘটনা বা সংকটে জেলার মানুষ ঢাকায় যেতে বাধ্য হয়। নতুন হাসপাতালে এ পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
যদিও সরকারিভাবে লোকেশন ঘোষণা হয়নি, তবে স্বাস্থ্য অবকাঠামো, প্রশাসনিক কেন্দ্র, পরিবহন সুবিধা ও ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে জেলা সদরই সবচেয়ে যৌক্তিক।
তবে বিকল্প হিসেবে শ্রীনগর (পদ্মা সেতু করিডর ও ভূমি সুবিধা), টংগীবাড়ি (ভূমি ও পরিবহন), গজারিয়া (ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর ও ঢাকা নিকট) ইত্যাদি এলাকাও আলোচনায় আসতে পারে। এটা চূড়ান্ত নির্ধারণ হবে ভূমি ও রাজস্ব প্রসেস শেষে।
বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো বা শিক্ষা-চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন সাধারণত উন্নয়ন রাজনীতির অভ্যন্তরে কাজ করে, যেখানে কেন্দ্র ও স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামো, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, প্রশাসনিক লবিং ও জনমতের চাপকে বিবেচনায় নেয়া হয়। মুন্সিগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের দাবি ছিল।
সমগ্র মুন্সিগঞ্জেই এ নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে বা পরে উন্নয়ন প্যাকেজ হিসেবে এটি উচ্চ পর্যায় থেকে ধরা হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সিগঞ্জ-মাদারীপুর-ভাঙ্গা এই করিডর এখন দেশের নতুন স্বাস্থ্য ও বাণিজ্য মেগা করিডর হিসেবে আলোচনায়। পদ্মা সেতু খোলার পর ঢাকার চাপ কমানো, স্বাস্থ্যসেবা দক্ষিণে বিতরণ, চিকিৎসা পর্যটন উত্থান, মেডিকেল শিক্ষা সম্প্রসারণ এ চারটি লক্ষ্যই জাতীয় কৌশলে দৃশ্যমান।
তবে অনুমোদন মানেই কাজ শেষ নয়। সাধারণত এরপর থাকে প্রকল্প প্রোফাইল, বাজেট বরাদ্দ, ভূমি অধিগ্রহণ, টেন্ডারিং, ইনফ্রা নির্মাণ, মানবসম্পদ নিয়োগ, এমসিআই এন্ড বিএমডিসি এক্রিডিটেশন, হাসপাতাল কমিশনিং ইত্যাদি।
এসব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া শেষে একটি মেডিকেল কলেজ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হতে ৩-৭ বছর সময় লাগে। তাই ধৈর্য ও প্রশাসনিক গতি দুইয়ের সমন্বয় প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মধ্যে এখন উচ্চ প্রত্যাশা দ্রুত নির্মাণ শুরু, পর্যাপ্ত বাজেট, আধুনিক হাসপাতাল সংযুক্তি, মানসম্পন্ন চিকিৎসক নিয়োগ, জরুরি সেবা চালু, ক্যান্সার/হার্ট/ট্রমা সেবা অন্তর্ভুক্তি। অন্য অংশ বলছে, এ উন্নয়ন ঢাকানির্ভর নয়, জেলা-কেন্দ্রিক হতে হবে।
এ অনুমোদন শুধু একটি প্রশাসনিক সংবাদ নয়, বরং মুন্সিগঞ্জের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ গঠনের কাঠামোতে একটি বড় পরিবর্তনের শুরু