মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া একটি নদীবেষ্টিত প্রাচীন উপজেলা। চারপাশ ঘিরে রেখেছে মেঘনা নদীসহ অসংখ্য শাখা নদী। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই এ উপজেলার নদীসংলগ্ন ইউনিয়নগুলোর মানুষ সবসময় নদীভাঙন ও ভিটে হারানোর আতঙ্কে বসবাস করে। এর মধ্যে গজারিয়া ইউনিয়ন, ইমামপুর ইউনিয়ন ও গুয়াগাছিয়া ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
আজ সোমবার সকাল ১১টায় গজারিয়া ইউনিয়নের নয়ানগর ও বালুচর মৌজার তীর ঘেঁষে একটি বালু খেকো চক্র অবৈধভাবে দিন-রাত বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। এতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের শত শত শতাংশ জমি। ভিটে-বাড়ি রক্ষার দাবিতে উপজেলা চত্বরের প্রধান ফটকে দুই ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করে এলাকাবাসী। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করে বালুচর ও নয়ানগর গ্রামের শত শত নারী পুরুষ।প্রথমে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ থাকলেও, ইউএনও’র সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠকের পর ভুক্তভোগী গ্রামবাসী শান্ত হয়। এ সময় স্থানীয় সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন।
গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেন, বালু মহলের প্রভাবশালী একটি চক্র গ্রামবাসীর ওপর হামলা চালিয়ে একজনকে আহত করেছে। তাদের দাবি, নদীতে স্থায়ীভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে এবং যারা নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে লোকালয়ের পাশ থেকে বালু কাটছে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
স্থানীয় যুবক সাব্বির বলেন, আমাদের গ্রামের বিদ্যালয়টি নদীর কূল ঘেঁষে রয়েছে। এভাবে বালু কাটতে থাকলে আগামী বর্ষায় স্কুলটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। শিশুরা তাদের শিক্ষার অধিকার হারাবে। আমরা এই অন্যায়ের স্থায়ী সমাধান চাই।
এলাকার গৃহবধূ সাহেদা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,আমাদের ভিটে-বাড়ি, বাগান সবকিছু ঝুঁকিতে পড়েছে। দিন-রাত আতঙ্কে থাকতে হয় কখন নদী গিলে খাবে জানি না। আমরা কি গজারিয়ার ভোটার নই।তাহলে কেনো আমাদের কষ্ট কেউ দেখছে না।
প্রবীণ গ্রামবাসী আব্দুল মতিন বলেন,বালুচর গ্রামের নামকরণ হয়েছে বালুর কারণে। অথচ আজ এই বালুই আমাদের অস্তিত্ব বিলীন করে দিচ্ছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী প্রজন্ম হয়তো এই গ্রামের নামটাও ইতিহাসে খুঁজে পাবে।গ্রামবাসীর অভিযোগ, বিএনপি’র প্রভাবশালী নেতার একটি চক্রর তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চলছে এ অবৈধ বালু উত্তোলন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান,এখানে আদন ড্রেজিং ট্রেডার্সের একটি বৈধ ইজারা বালু মহল রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে লোকালয়ের কাছাকাছি এসে বালু তুলছে। সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী লোকালয় থেকে ৭৫০ মিটার দূরে বালু উত্তোলন করতে হবে। আমরা গিয়ে ১২০০ মিটার দূরে উত্তোলনের নির্দেশ দিয়েছি। আশা করি আর কোনো সমস্যা হবে না।বৈধ্য ইজারাদারদেরও রাতে বালু কাটার কোনো সুযোগ নেই।ভোর হতে সন্ধ্যার আলো থাকা পর্যন্ত তারা নদীতে বালু উত্তোলন করতে পারবে।
তিনি আরও বলেন,ভুক্তভোগীরা আমাদের একটি স্মারকলিপি দিয়েছে যেখানে উক্ত বালু মহল সরকারি ভাবে বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। যেহেতু এটি বৈধ ইজারা, আইনগতভাবে তাৎক্ষণিক বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে আগামী ১৪ এপ্রিলের পর যাতে নতুন করে টেন্ডার না হয় সে বিষয়ে আমরা উদ্যোগ নেব। এছাড়া নয়ানগর মসজিদসংলগ্ন এলাকায় জিও ব্যাগ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
সার্বিক পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট প্রশাসনের কিছু পদক্ষেপ থাকলেও এলাকাবাসীর আস্থা ফেরাতে এবং গজারিয়ার ভিটে-বাড়ি রক্ষায় আরও কঠোর ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়েছে।