
আতিকুর রহমান নয়ন
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার ভোর ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হসপিটালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ সময় হাসপাতালে খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জোবাইদা রহমান, নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, ছোট পুত্রবধূ শর্মিলা রহমান সিঁথি, ছোট ভাই শামীম এসকান্দারসহ দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বুধবার দুপুর ২টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাকে তার স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে দাফন করা হবে।
তার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। দেশের সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানরা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে কখনো ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সমঝোতা বা রাজনৈতিক আপস করেননি। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিরোধী দলের ভূমিকা সব ক্ষেত্রেই তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বিএনপি তার নেতৃত্বে বছরের পর বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। এ কারণে জনসাধারণের কাছে তিনি আপসহীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর ৭ মাস পর ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে তিনি রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন। সামরিক শাসনের অস্থির সেই সময়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এই দীর্ঘ আন্দোলনে তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করেন এবং স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি। অন্যান্য বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো যখন দল ও ব্যক্তি স্বার্থে ক্ষমতাসীনদের সাথে আপোস করেছে, তখন তিনি মানুষের অধিকারের জন্য রাজপথে আন্দোলন করেছেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাকে অসংখ্য বার আটক ও গৃহবন্দী করা হয়েছিল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন–সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিএনপি বিজয়ী হয়। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ নেন। তিনি ১৯৯৬ সালে অল্প সময়ের জন্য দ্বিতীয়বার এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে ও ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
রাজনীতিকদের জীবনে উত্থান-পতন থাকে। জয়-পরাজয় থাকে। বিরোধীদলে থাকাকালে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব–সংঘাত ছাড়াও প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। বহুকালের স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাসের বাড়ি থেকে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে উচ্ছেদ করে ২০১০ সালে। এমন পরিস্থিতিতেও পরম ধৈর্য, আত্মশক্তি ও আত্মমর্যাদা বজায় রেখেছেন। অনমনীয় দৃঢ়তায় অটল থেকে মাথা উঁচু করে যে জীবন তিনি অতিবাহিত করেছেন তা চিরকাল অনুসরণীয়। তার এই চারিত্রিক দৃঢ়তা তাকে মহীয়ান করে তুলেছে।
বিগত স্বৈরাচারী সরকার ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলনে নামেন। দাবি পুরণ না হওয়ায় ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান। ২০১৮ সালে তাকে কারাবন্দি করে আওয়ামী লীগ সরকার। দুই বছরের বেশি সময় জেল খেটে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এসময় নানাভাবে তার সাথে রাজনৈতিক আপোস করার চেষ্টা করে সরকার। তবে কোন ধরনের সমঝোতায় পা বাড়াননি তিনি। বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার আবেদন করলেও সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া দেয়নি।
গত বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টেই নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়া তিনটি আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। নির্বাচনের ঠিক দেড় মাস আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।