
দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা ডেস্ক :
নীতি রানির বয়স এখন দেড় বছর। গত ১১ মার্চ তাকে মৌলভীবাজার জেলার রাজানগর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তীব্র অপুষ্টি নিয়ে ভর্তি করা হয়। নীতির মা শান্তা রানি জানান, বেশ কিছু দিন হলো নীতির খাওয়া-দাওয়ার প্রতি অনীহা। কিছুই খাচ্ছিল না। কান্নাকাটি লেগেই ছিল। কেমন যেন নেতিয়ে যাচ্ছিল। এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এসময় তার ওজন ছিল ৬ কেজি। কিন্তু বয়স অনুযায়ী তার ওজন হওয়ার কথা ৯ কেজির বেশি। তার উচ্চতাও এ বয়সের অন্য শিশুর চেয়ে কম। শান্তা জানান, তার ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়। তার তিন সন্তান। নীতি রানি জন্মের সময় কম ওজন নিয়ে জন্মায়। সংসার আর অন্য দুই সন্তান রেখে কতদিন হাসপাতালে থাকতে পারবেন সেটা নিয়ে চিন্তিত তিনি।
সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার আদিত্যপুর গ্রামের সমিরন বেগমের ৮ সন্তানের মধ্যে সাদিয়া বেগম সবার ছোট (২০ মাস)। এগার মাস বয়সে ৫ কেজি ৭০০ গ্রাম ওজনের খর্বাকৃতির সাদিয়াকে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনদিন চিকিত্সার পর তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় পুষ্টিকর খাবারের তালিকা। এ তালিকা অনুসরণ করে সাদিয়ার এখন ৮ কেজি ৫০ গ্রাম ওজন হয়েছে।
সম্প্রতি সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, এখানে শিশুরা এখনো মাত্রাতিরিক্ত অপুষ্টিজনিত খর্বতা (স্টান্টিং) নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের পুষ্টি বিষয়ক কার্যক্রম ‘সূচনা’র মাঠকর্মীরা এসব শিশুদের শনাক্ত করে থাকে। তবে এ বিষয়ে সরকারের আলাদা কোনো কার্যক্রম নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে খর্বকায় ও লম্বার তুলনায় কম ওজনের মানুষের সংখ্যা বেশি। অথচ জাতিসংঘ গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) পুষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এসডিজির ২ নং লক্ষ্য ক্ষুধামুক্তি, খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন এবং সব ধরনের অপুষ্টি দূর। এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে তাই অপুষ্টি মোকাবিলার বিষয়টি গভীরভাবে আমলে নিতে হবে।
‘সূচনা’র ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মোহাম্মদ আলী রেজা মনে করেন, অপুষ্টির শিকার শিশুদের মায়েরা জানে না ‘স্টান্টিং’ কী; কেন হয়। তারা সচেতন না শিশুর প্রথম ১ হাজার দিন সম্পর্কে। এমনকি গর্ভধারণ থেকে দুই বছর পর্যন্ত শিশুর সামগ্রিক বিকাশের জন্য পুষ্টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে বিষয়েও তারা অসচেতন। প্রসঙ্গত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পুষ্টির অভাবে শিশুর বৃদ্ধি এবং বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হওয়াকে ‘স্টান্টিং’ বলা হয় ।
২০১৩ সালে ইউনিসেফের একটি জরিপ অনুযায়ী, মায়েদের নিম্নশিক্ষার হার এবং সামাজিক ও আর্থিক সংকট শিশুর পুষ্টিহীনতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০১৪ অনুযায়ী, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বকায় হওয়ার হার ৩৬ শতাংশ। ২০১১ সালে এটি ছিল ৪১ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৪৩ শতাংশ এবং ২০০৪ সালে ৫১ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে খর্বাকায় শিশুর হার সবচেয়ে বেশি। যা ২০১৪ সালে ছিল ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
এ অঞ্চলের শিশুর অপুষ্টি ও খর্বকায় রোধে ‘সূচনা’ ২০১৫ সাল থেকে ছয় বছর কাজ করবে। এসময় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের অপুষ্টি রোধের পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। গর্ভবতী মা ও কিশোরী এবং নবজাতককে পুষ্টি বিষয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা, দারিদ্র্যতা দূর এবং কিশোরীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করছে তারা।
জানতে চাইলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক বলেন, পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে শিশুর বিকাশ ব্যাহত হয়। মানসিক শক্তি কমে যায়। লেখাপড়ায় দুর্বলতা বাড়ে, অনেক সময় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। শিশুর খর্বকায়ত্বের পেছনে মস্তিষ্কের পুষ্টিহীনতা দায়ী বলে তিনি জানান।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. হিমাংশু লাল রায় বলেন, বাবা-মায়ের অজ্ঞতা এবং বাল্যবিয়ে অপুষ্টি ও খর্বকায় শিশুর মূল কারণ। এছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারতো রয়েছেই।
এ বিষয় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, রিপোর্টে অপুষ্টির হার কমেছে। সরকার পুষ্টি নিয়ে আলাদা করে কাজ করে না। তবে সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পুষ্টি কর্নার আছে। এছাড়া আমাদের মাঠকর্মীরা পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক তথ্য দেওয়ার সময় শিশু ও মায়ের পুষ্টির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।