
সৈয়দ মাহমুদ হাসান মুকুট:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে এরই মধ্যে মুন্সিগঞ্জ -১ আসনে (শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলা) বইতে শুরু করেছে আগাম নির্বাচনী হাওয়া। আসনটি ঘিরে বিএনপির ৪ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী এমপি প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। নির্বাচনী এলাকায় সামাজিক নানামুখী উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের চিত্র জনসাধারণের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন, পোষ্টার সাটিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি গণসংযোগ করার মধ্যে দিয়ে উপজেলাবাসীর নজর কাড়ছেন। দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থনকারীরা পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্নভাবে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে আলোচনায় আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মমিন আলী, সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ্ ও সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস ধীরন। এই তালিকায় শোনা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা একেএম ফখরুদ্দিন রাজী, ইসলামিক আন্দোলন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কেএম আতিকুর রহমান, গণ অধিকার পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি মো. জাহিদুর রহমান, জাতীয় পাটির প্রেসিডিয়াম সদস্য এ্যাডভোটেক শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের নাম।
এবার মুন্সিগঞ্জ-১ আসনে একজন যোগ্য প্রার্থীকেই ভোটের মাধ্যমে এমপি হিসেবে নির্বাচিত করবেন বলছেন সাধারণ ভোটাররা।
দলের সঠিক নেতৃত্বের অভাবে সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের মধ্যকার গ্রুপিং এখন দৃশ্যমান। এসব গ্রুপিংয়ের ফলে বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটির মধ্যেও বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে। ৮ জন প্রার্থী থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে আছেন বিএনপির শেখ মো. আব্দুল্লাহ, জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ফখরুদ্দিন রাজী।
রাজধানীর পাশে শ্রীনগর উপজেলা ১৪টি ইউনিয়ন আর সিরাজদিখান উপজেলা ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে সংসদীয় আসন মুন্সিগঞ্জ -১। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সংসদ পর্যন্ত আসনটি ছিলো বিএনপির অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তার ছেলে মাহী বি চৌধুরীর। ২০০৮ সালে জয়ী হন আওয়ামী লীগের সুকুমার রঞ্জন ঘোষ। ২০১৮ সালে মহজোট থেকে নৌকা প্রতীকে বিকল্প ধারা বাংলাদেশের প্রার্থী হিসাবে আবারও সংসদ সদস্য হন মাহী চৌধুরী। ০৮ জানুয়ারি, ২০২৪ সালে সিরাজদিখান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব মহিউদ্দিন আহমেদ নৌকা প্রতীকে বিজয়ী হন।
মুন্সীগঞ্জ জেলায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি পুরোদমে শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ভোট দিতে পারেনি বাংলাদেশের জনগণ। তাই এবার অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ পরিবেশে ভোট দিতে মুখিয়ে আছে গোটা জাতি। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারিতেই হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অনেকেরই প্রত্যাশা, পুরনো চারটি আসন পুনর্বিন্যস্ত হয়ে ফিরে আসবে। এটা হলে জেলার রাজনৈতিক সমীকরণে প্রার্থী বাছাই, কৌশল ও সমর্থন পুনর্বিন্যাস করতে হবে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন এনসিপিসহ অন্যান্য দলকে।
জেলার প্রতিটি আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশা নিয়ে তৎপর থাকলেও জামায়াত তাদের প্রার্থী আগে থেকেই চূড়ান্ত করে রেখেছে এবং তারা এলাকাভিত্তিক গণসংযোগ শুরু করে দিয়েছে। এনসিপির একজন প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে থাকলেও বাকিরা এখনো সংগঠনাত্মক প্রস্তুতি নিতেই ব্যস্ত রয়েছে।
এ আসনে (১৭১ নং আসন) বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু এবং সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপি সভাপতি মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির ১ নম্বর সদস্য শেখ মো. আবদুল্লাহ মনোনয়ন লাভের আশায় ব্যাপক গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক করে যাচ্ছেন। ঢাকা কলেজের সাবেক ভিপি মীর সরফত আলী সপু ছাত্র জীবন থেকে অদ্যাবধি বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটি এবং স্থানীয় রাজনীতিতে নানা দায়িত্ব পালন করে আসছেন। জামায়াত থেকে প্রার্থী হয়েছেন জেলা সেক্রেটারি ও ইসলামপুর কামিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক এ কে এম ফখরুদ্দিন রাজী। মনোনয়ন প্রাপ্তির পর থেকে জামায়াতের অপেক্ষাকৃত নবীন এ প্রার্থীর নেতাকর্মী অনুসারীরা বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ করছেন।
বিএনপির মীর সরফত আলী সপু বলেন, ”দীর্ঘ দিন ধরে আমি মুন্সিগঞ্জ-১ আসনে কাজ করে আসছি। ১৯৯১ সাল থেকেই এই এলাকার রাজনীতির সাথে আমি সম্পর্কিত।এলাকার মানুষের সুখে দুঃখে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। দলের চরম দুঃসময়েও এলাকায় দলের পক্ষে কাজ করেছি। ৩০০এর অধিক মামলায় জর্জরিত থাকার পরেও এলাকায় প্রতিনিয়ত দলীয় কার্যক্রম সহ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।করোনা মহামারির লকডাইনের সময় শ্রীনগর -সিরাজদিখানের খেটে খাওয়া মানুষের পাশে ত্রাণ নিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।শ্রীনগর-সিরাজদিখানের বিভিন্ন জায়গায় আমার উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করে সহস্রাধিক মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ঔষুধ প্রদান করা হয়।”
”সব কিছু মিলিয়ে মুন্সিগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) এর মানুষের সাথে একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছি। তাই মাঠের পরিস্থিতি সহ সবকিছুকে আমলে নিয়ে দল নমিনেশনের ব্যাপারে সিন্ধান্ত নিবে এবং আমি আশাবাদী দল আমার কাজের মূল্যায়ন করবে।”
এই আসনে উন্নয়ন মূলক কাজের ক্ষমতা ও ক্ষমতার বাহিরে থেকেও সর্বদাই আমি চেষ্টা করেছি।২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় শ্রীনগরে বড় একটি সমস্যা ছিল কোন ফায়ার সার্ভিস না থাকা। শ্রীনগর যেহুতু ঢাকা মাওয়া রোড সংলগ্ন, সেহেতু প্রায় এখানে সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে।এছাড়াও, আশে পাশে কোথাও আগুন লাগলে সেটা মোকাবিলার জন্য ফায়ার সার্ভিস কে পাওয়া যেত না। সেই সমস্যা উপলব্ধি করে ফায়ার সার্ভিস নির্মাণের উদ্যোগ নেই।সেই ফায়ার সার্ভিস থেকে আজ ঢাকা মাওয়া রোডে দূর্ঘটনা মোকাবিলা থেকে শুরু করে শ্রীনগর সহ অত্র এলাকায় অগ্নি দূর্ঘটনা মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও, তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রীর সাথে সমন্বয় করে শ্রীনগর বাজারের যানজট নিরসনে বাইপাস সড়ক নির্মাণে ভূমিকা রাখি।শ্রীনগরের ভাগ্যকুল বাজার পদ্মা নদী সংলগ্ন হওয়াতে প্রায় নদী ভাঙনের মুখে পড়ে।নদী ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। এর’ই সাথে বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়ক,ব্রিজ,কালভার্ট নির্মাণে ভুমিকা রাখি।সম্প্রতি ৫ই আগষ্টের পড় সিরাজদিখান উপজেলার বিক্রমপুর ডিগ্রি কলেজে এক কোটি চল্লিশ হাজার টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণে কাজ শুরু হয়েছে আমার উদ্যোগে।এর আগেও ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল ইউনিয়নে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্সটিটিউট স্কুলের ভবন নির্মাণ,এমপিও ভুক্তকরণ ও কলেজ শাখা চালুকরণে ভূমিকা রাখি।এই ছাড়াও,এলাকার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসায় সরকারি অনুদান প্রদানে ভূমিকা রাখি।সম্প্রতি ৫ই আগষ্ট পর থেকে শ্রীনগর-সিরাজদিখানের বিভিন্ন সড়ক,ব্রিজ,কালর্ভাট নির্মাণে ভূমিকা রেখে যাচ্ছি।
শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. মমিন আলী জানান, জনগণ চাইলে আমি নির্বাচনী মাঠে থাকবো।
বিএনপির শেখ মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ”আমি শতভাগ আশাবাদী মনোনয়ন পাবো। দল যে সিদ্ধান্ত দিবে সেটাই আমি মানবো। মাদক ব্যবসায়ীদের নির্মূলে ব্যবস্থা নিবো। আমার গার্মেন্টস এ ৩৫ হাজার শ্রমীকের মধ্যে নির্বাচনী ২ থানার ৩ হাজারের অধিক। নির্বাচিত হলে এ সংখ্যাটা আরো বাড়বে। চাঁদাবাজী কমিয়ে আনবো। শিক্ষা ও রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করবো। নির্বাচনী এলাকায় ৮০ হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শান্তিতে বসাবাস করার ব্যবস্থা করবো। সংখালঘু অত্যাচার বন্ধ করবো”।
বিএনপির আব্দুল কুদ্দুস ধীরন বলেন, ”আমি সংসদ সদস্য হতে পারলে দূর্নীতি মুক্ত সমাজ উপহার দিবো। রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও বিদ্যুৎ এর উপর গুরুত্ব দিবো। এ তিনটা উন্নয়ন করলে জনগণ তার নিজের উন্নয়ন নিজেই করতে পারবে। সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করবো।”
জামায়াতে ইসলামী মনোনিত প্রার্থী মাওলানা একেএম ফখরুদ্দিন রাজী বলেন, এবার এ আসনে আমরা নির্বাচিত হবো ইনশাআল্লাহ। বিক্রমপুরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিক রূপরেখা প্রনয়নের মাধ্যমে নিরাপদ ও সুখী জীবন যাপন উপযোগী একটি মডেল এলাকা হিসেবে গড়ে তোলাই আমার মূল লক্ষ্য।
ইসলামি আন্দোলনের প্রার্থী কেএম আতিকুর রহমান বলেন, ২০১৮ তে প্রহসনের নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে হয়েছে । এতে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়নি। এতে অংশ নিয়েছিলাম । এবার গণসংযোগের কাজ করছি। এ এলাকায় বড় ধরে শিল্প প্রতিষ্ঠান নেই। শিক্ষার মান নেই। এলাকার যুবসমাজ যাতে মাদক সন্ত্রাস এসবে জড়িয়ে না পরে তার জন্য চেষ্টা করবো । দুর্ণীতিমুক্ত প্রশাসন গড়বো। ব্যপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবো।
গণঅধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমান বলেন, আমাদের দল গণঅধিকার পরিষদ দীর্ঘসময় ধরে লড়াই সংগ্রাম করে আসছে। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে গণঅধিকার পরিষদের ভূমিকা কারও অজানা নয়। আমরা নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছি। আমি নির্বাচিত হলে এলাকায় আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবো, আধুনিক হাসপাতাল তৈরি করা হবে। স্কুল ও কলেজে শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা হবে। যাতে করে শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা না লাগে। এছাড়া বেকারদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা হবে। খাল ও নদী খনন করা হবে। মুন্সিগঞ্জ জেলাতে ৫০ লাখ গাছ লাগিয়ে পুরো জেলাকে সবুজে ঢেকে ফেলা হবে। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র রাস্তা পাকা করে দেওয়া হবে। এছাড়া কালভার্ট, সেতুসহ যেসকল উন্নয়ন প্রজেক্টের কাজ চলমান তা কন্টিনিউ করা হবে।
সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের বন্ধু হিসেবে গড়ে তোলা হবে।