
রাজধানী ঢাকার প্রবেশমুখে যানবাহনের চাপ কমবে
আবু নাসের লিমন।।
মুন্সিগঞ্জের যোগাযোগ ব্যাবস্হায় আধুনিকায়ন হতে যাচ্ছে ১ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে মুন্সিগঞ্জ-শ্রীনগর সড়ক। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রাজধানী ঢাকার প্রবেশমুখে যানবাহনের চাপ অনেকটা কমে যাবে বলে ধারনা করছেন সড়ক যোগাযোগ বিশ্লেষকগন।
সমপ্রতি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে মুন্সিগঞ্জের বহুল প্রতীক্ষিত ও অতিগুরুত্বপূর্ণ মুন্সিগঞ্জ–শ্রীনগর সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প।
গত রোববার একনেকের চলতি অর্থবছরের ৮ম সভায় প্রকল্প তালিকার ২ নম্বরে স্থান পায়- ‘মুন্সীগঞ্জ সড়ক বিভাগের আওতাধীন ৩টি আঞ্চলিক মহাসড়ক ও ১টি জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্প’।
এই একটিমাত্র সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে পুরো মুন্সিগঞ্জ জেলার যোগাযোগ ও অবকাঠামোর দৃশ্যপট।
প্রকল্পটির মাধ্যমে সরাসরি সুফল পাবেন মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং, শ্রীনগর, সিরাজদিখান, টংগিবাড়ী ও মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার জনগন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মুন্সিগঞ্জের অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্কে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটি অনুমোদনের পর আগামী তিন মাসের মধ্যেই টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি রয়েছে। চলতি বছরের জুন মাস থেকেই নির্মাণ কাজ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে সাড়ে তিন বছর, ফলে ২০২৯ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩৫৯ কোটি ২৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
মুন্সিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ মাহমুদ সুমন বলেন, এই প্রকল্প মুন্সিগঞ্জের সড়ক নেটওয়ার্কে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। তাঁর ভাষায়, “এই সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে পুরো জনপদের চিত্রই বদলে যাবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পটি অনুমোদনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা, মুন্সিগঞ্জের কৃতি সন্তান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। পাশাপাশি শিল্প, গণপূর্ত ও এলজিআরডি উপদেষ্টা এবং মুন্সিগঞ্জের আরেক কৃতি সন্তান আদিলুর রহমান খানেরও রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান।
জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে এই প্রকল্পটি প্রথম গ্রহণ করা হয়। দফায় দফায় যাচাই-বাছাই শেষে এটি পরিকল্পনা কমিশনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একনেকে উত্থাপিত অন্যান্য প্রকল্পের মতো এই সড়ক প্রকল্পটিও পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে পুনরায় প্রস্তাব পাঠানো হলে অবশেষে একনেকের অনুমোদন মেলে। প্রকল্পের আওতায় ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ মুন্সিগঞ্জ–শ্রীনগর সড়ক উন্নয়ন করা হবে। এর মধ্যে হাতিমারা থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত ২০ দশমিক ৪০ কিলোমিটার অংশ ৩৫ ফুট প্রশস্ত করা হবে। মুক্তারপুর থেকে হাতিমারা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীত হবে। এছাড়া মুক্তারপুর থেকে শহরের পুরনো বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার অংশ ২৪ ফুট প্রশস্ত করা হবে।
মুন্সিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজমুস হোসেন সাকিব জানান, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে- মুন্সিগঞ্জের পুরনো বাসস্ট্যান্ড থেকে শ্রীনগর উপজেলার ছনবাড়ি পর্যন্ত সড়কটি আধুনিক মান ও প্রয়োজনীয় প্রশস্ততায় উন্নীত করা।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ধলেশ্বরী নদীর ওপর অবস্থিত মুক্তারপুর সেতু থেকে ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের শ্রীনগর অংশ পর্যন্ত যান চলাচলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে। এর ফলে আঞ্চলিকভাবে মুন্সিগঞ্জ এবং সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা বিপুল সংখ্যক যানবাহনের কারণে রাজধানী ঢাকার প্রবেশমুখে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রস্তাবিত সড়কটি নির্মিত হলে ঢাকা আউটার রিং রোডের মদনপুর–মদনগঞ্জ–সৈয়দপুর অংশ এবং জাতীয় মহাসড়ক এন-১ ব্যবহার করে রাজধানীতে প্রবেশ না করেই দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। এতে কৃষিজ ও শিল্পজাত পণ্য পরিবহন আরও সহজ হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
এছাড়া মুন্সিগঞ্জবাসীর জন্য পদ্মা সেতু ব্যবহার করে দেশের দক্ষিণাঞ্চল, ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত আরও স্বাচ্ছন্দ্য হবে। একই সঙ্গে মুন্সিগঞ্জে উৎপাদিত কৃষিপণ্য দেশব্যাপী বিপণন ও সরবরাহে এই সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পে যানজট নিরসনে বড় ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সড়কটিতে নির্মাণ করা হবে ৪টি ওভারপাস ও ৬টি আন্ডারপাস। ওভারপাসগুলো হবে মুক্তারপুর, সিপাহিপাড়া, বেতকা চৌরাস্তা ও ইছাপুরায়। এসব ওভারপাসের ওপর ও নিচ দিয়ে নির্বিঘ্নে যান চলাচলের ব্যবস্থা থাকবে।
অন্যদিকে ৬টি আন্ডারপাস নির্মিত হবে— হাতিমারা, আব্দুল্লাহপুর চৌরাস্তা, মালখানগর চৌরাস্তা, কুন্ডেরবাজার, ইছাপুরার নিকটবর্তী সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে এবং কুসুমপুর এলাকায়।
সব মিলিয়ে, একনেক অনুমোদিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মুন্সিগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন আধুনিক হবে, তেমনি অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জনজীবনেও আসবে বড় পরিবর্তন।