
বিচারের বাণী কাঁদে নিভৃতে!
ধর্ষণে রক্তাক্ত বাংলাদেশ
ত্বাইরান আবির
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ভয়াবহ মাত্রা লাভ করেছে। বিশিষ্ট মানবাধিকার ও আইন-শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শুধু সংখ্যা নয়, বিশেষত শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের ঘটনার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, আর যথাযথ বিচার অনেকে পাচ্ছেন না।
২০২৬ সালে চলতি মাসের ২৭ ই ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদী উপজেলায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটি দায়ের করেন ভুক্তভোগীর মা, যেখানে মোট ৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। পুলিশের অভিযানে সাবেক ইউনিয়ন বিএনপি নেতাসহ খুন, ধর্ষণে সহায়তাকারী জামায়াত নেতাদের নাম উঠে এসেছে।
এই ঘটনায় দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ও নাগরিকের সোচ্চার অবস্থা দেখা গেছে। রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো শাস্তি দাবি করেছে এবং রাষ্ট্রকে দ্রুততম বিচার নিশ্চিত করতে বলেছে।
এর আগে মাগুরায় ৮ বছর বয়সী এক শিশু মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত দ্রুত বিচার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনালকে ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রায়াল শেষ করার নির্দেশ দেয়।
যৌক্তিক তদন্তের অংশ হিসেবে, অভিযুক্তদের থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বস্তুগত প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।
দুর্ভাগ্যবশত, এই শিশু পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান, যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির খবর নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে।
ফরিদপুর সদর উপজেলার একটি গ্রামে ৬ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয়েছে, লাখ লাখ মানুষের মধ্যে এই খবর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বান্দরবানে গর্ভবতী স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, অভিযুক্তদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
সাভারে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) শিক্ষার্থীর ধর্ষণ মামলায় একজন অভিযুক্ত রিমান্ডে রয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
যারা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র্যাব) এর অধীনে কাজ করছে, তারা নারায়ণগঞ্জের এক ছাত্রীর গ্যাং-রেপের ঘটনায় দুইজনকে আটক করেছে, যদিও মামলাটি দেরিতে রেকর্ড হওয়া ও পুলিশের অনিয়মিত প্রতিক্রিয়ার অভিযোগ উঠেছে।
একের পর এক রিপোর্ট বলে যাচ্ছে, ধর্ষণ শুধু মর্মান্তিক ঘটনা নয়, ঐ বর্ণনা অনুসারে এটি একটি সামাজিক মহামারি। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৪৮১ টি ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যেখানে দলবদ্ধ ধর্ষণের সংখ্যা ১০৬ টি ছিল। এর মধ্যে ১৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
পুলিশের তথ্যে আরও জানা যায়, গড়ে প্রতি ৯ ঘন্টায় অন্তত একজন নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, যা ভয়াবহ সমাজিক সংকটকে প্রতিফলিত করে।
এ বিষয়ে সরকার বিভিন্ন নীতিমালা ঘোষণা করেছে ধর্ষণ-বিরোধী জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে এবং দ্রুত তদন্ত ও বিচারের নির্দেশনা দিয়েছে।
এক্ষেত্রে একটি নতুন উদ্যোগ রেপ কমপ্লেইন্ট হটলাইন চালুর ঘোষণা, যা ২৪ ঘন্টা সক্রিয় থাকবে এবং নির্যাতন, ধর্ষণের অভিযোগ দ্রুত নিবন্ধন ও নজরদারি করবে।
তবে বাস্তবে অনেক মামলা দায়েরের আগে পুলিশের দেরি, প্রমাণ সংগ্রহ না হওয়া, গুজবের কারণে বিভ্রান্তি ইত্যাদি কারণে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ছে, যা বিচার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।
দেশজুড়ে ধর্ষণ-হত্যার ঘটনা সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়া, মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। অনেকেই নিরাপত্তাহীনতা, আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ইত্যাদি বিষয়কে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছে।
নারী, শিশু ও দুর্বল মানুষদের প্রতি সহিংসতা এমন এক স্তরে পৌঁছেছে, যা সমাজের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ করছে, এমন মন্তব্যও বিভিন্ন মানবাধিকার নেতাদের কাছে শোনা যায়।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। কিন্তু ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা শুধু অপরাধ নয়, এগুলো মানবিক বিপর্যয় ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রকাশ। প্রতিদিন শোকে ভরা সংবাদ শিরোনাম, বিচার ও তদন্তে ধীরগতি, পশ্চাতের মতো করে উঠা প্রতিক্রিয়া এসব মিলিয়ে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে- আমরা কি সেই সমাজে বাস করছি, যেখানে প্রতিটি সম্ভাব্য বিচার ভুক্তভোগীর চোখে বিস্ময়, কান্না ও হতাশায় শেষ হয়?