
শেখ রাসেল ফখরুদ্দীন :
বিক্রমপুরের কৃতি সন্তান নূর হোসেন বলাই। তিনি ১৯৫২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বিক্রমপুরের শ্রীনগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ জীবন আলী হাওলাদার। নূর হোসেন বলাই ১৯৬৭ সালে ঢাকার লালমাটিয়া স্কুলে ভর্তি হন এবং তখন থেকে চলচিত্রের সাথে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তিতে অংশিদার প্রযোজক ও সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রাঙ্গনে পা রাখেন তিনি। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘ছক্কা পাঞ্জা’, মুক্তিপায় ১৯৮০ সালে । নূর হোসেন বলাই পরিচালিত অন্যান্য ছবিসমূহ- সিকান্দার, ইন্সপেক্টর, বিষকন্যার প্রেম, দাগী, জীবনবাজী, নিষ্পত্তি, এই নিয়ে সংসার, মহৎ, ভয়ঙ্কর সাতদিন, শেষ খেলা, ওরা তিনজন, ঘায়েল, কলিজার টুকরা, শক্তের ভক্ত, কালো হাত। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে স্বনামধন্য একজন পরিচালক, নূর হোসেন বলাই। তাঁর পরিচালিত প্রায় প্রতিটি ছবিই হয়েছে ব্যবসাসফল, দর্শক প্রিয়। বাণিজ্যসফল গুণি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তিনি ছিলেন সুপরিচিত, প্রসংশিত । সুপারহিট ছবির পরিচালক হিসেবে ৮০-৯০ দশকে যারা শীর্ষে ছিলেন, তিনি ছিলেন তাদেরই অন্যতম একজন। প্রতিভাবান এই চলচ্চিত্র নির্মাতাকে, বলতে গেলে আমরা সময়ের আগেই হারিয়েছি। বিক্রমপুরের এই গুণী সন্তান ২০১০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৫৮ বছর। তাঁর ছবির স্টাইল অবজারভ করলে যা বোঝা যায় তিনি কমার্শিয়াল ছবির বৈশিষ্ট্য রেখে ফুল প্যাকেজ ছবি বানাতেন। যে যে গুণগুলো থাকলে একটা উপভোগ্য কমার্শিয়াল ছবি বানানো যায় তিনি তাই করতেন। ধরা যাক ‘শেষ খেলা’ ছবির কথা। এ ছবির কালজয়ী গান ‘সুন্দর সন্ধ্যায় এ গান দিলাম উপহার’-এ সেই সময়ের ক্রেজ জুটি মান্না-চম্পার সাথে লিজেন্ড রাজিবকে দিয়েও লিপ করিয়েছেন। রাজিবের জন্য গানটি বাড়তি মাত্রা পেয়েছে। ছবির গল্পে ফ্যামিলি ড্রামার সাথে রোমান্টিকও ছিল। চম্পা ছিল ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র। নব্বই দশকে নায়ককেন্দ্রিক আধিপত্য দারুণভাবে ছিল সেই সময়ে চম্পাকে দিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্র করানো ঝুঁকির কাজ ছিল কিন্তু তিনি সফল ছিলেন।‘মহৎ’ ছবিতে ত্রিভুজ প্রেমের গল্পে ওমর সানী, শাহনাজ, ইলিয়াস কাঞ্চনকে দিয়েও ‘প্রেম কখনো মধুর’ নামের কালজয়ী গানটি করেছেন। এ ছবিটিও গানে, অভিনয়ে, ড্রামায় জমজমাট ছিল। স্টুডেন্ট পলিটিক্সের গল্পে ওমর সানীর অন্যতম সেরা ছবি ‘ঘায়েল’ ছিল বলাইয়ের পরিচালনায়। অ্যাকশন ছবিতেও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ‘সিকান্দার’ নায়ক ফারুকের প্রথমদিকের উল্লেখযোগ্য অ্যাকশন ছবি। শক্তের ভক্ত, ঘায়েল, ওরা তিনজন এগুলো জমজমাট অ্যাকশন ছবি। থ্রিলারে ‘ভয়ঙ্কর সাতদিন’ খুবই উপভোগ্য ছবি ছিল। ইলিয়াস কাঞ্চন-দিতির মতো তখনকার জনপ্রিয় জুটি থাকা সত্ত্বেও এ ছবিতে সোনিয়া ও সঞ্জয় খানকে পরিচালক বলাই ছবির প্রধান আকর্ষণ বানিয়েছেন। অঞ্জু ঘোষের সঙ্গে নূর হোসেন বলাই তাঁর সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ছবি সম্ভবত ‘নিষ্পত্তি’। আহমেদ শরীফ ও রাজিব বাবা-ছেলের ভূমিকায় ছিলেন এবং দুজনই অঞ্জু ঘোষকে পছন্দ করে, অঞ্জু ভালোবাসে ইলিয়াস কাঞ্চনকে। উপভোগ্য ছিল হচ্ছে আহমেদ শরীফ ও রাজিবের অভিনয়, তাঁদের মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার দাঁড়িয়ে যায় এবং সেটি গল্পের প্রয়োজনে। নূর হোসেন বলাই অল্প ছবি বানিয়েছেন কিন্তু নিজের স্বকীয়তা দেখিয়েছেন দারুণভাবে। কমার্শিয়াল ছবিকে উপভোগ্য করে তুলেছিলেন। তাঁর পছন্দের দুই নায়ক ছিল ইলিয়াস কাঞ্চন ও ওমর সানী। তাদের সাথে ছবি তুলনামূলক বেশি।নূর হোসেন বলাইকে কতজন মনে রেখেছে বা রাখবে সেটা দর্শকের উপর নির্ভর করে। কিন্তু চলচ্চিত্র বিষয়ক আলোচনায় সস্তা লাইক/কমেন্ট জাতীয় লেখার বাইরেও যে অনেককে চেনার আছে, জানার আছে বলাই তাঁদেরই একজন। তাই জানুন, দেখুন, বুঝুন কারা আমাদের চলচ্চিত্রকে দাঁড় করাতে অবদান রেখেছেন। এ প্রজন্ম বলাইকে জানুক।