আশরাফ ইকবাল
সমাজ কর্ম ও সমাজকল্যাণ আলাদা বিষয়। মহামারি, দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ প্রভৃতি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্ভব।
স্বেচ্ছাসেবিতা (Voluntarism), স্বেচ্ছাসেবী (Volunteer) ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত (Voluntary) প্রভৃতি বিষয়ে আমাদের ধারণা সুস্পষ্ট নয়। স্বেচ্ছাসেবিতা বা Voluntarism হলো স্বেচ্ছামূলক কাজ। সময়ের প্রয়োজনে পারস্পরিক সহানুভূতি, মানবিকতাবোধ, সহমর্মিতা, ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও মানবপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে স্বেচ্ছামূলক কাজে ঝুঁকে পড়ে। ইংরেজি Voluntarism শব্দটি এসেছে লাতিন Voluntas (ইচ্ছা) থেকে। লাতিন শব্দ থেকে স্বেচ্ছাসেবী (Volunteer) এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত (Voluntary) প্রভৃতি শব্দ এসেছে। মূলত স্বেচ্ছামূলক কাজ মুনফাহীন এবং অরাজনৈতিক চর্চা। এই কর্মের মূল দর্শন হলো মানবতাবাদ। যখন কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় কল্যাণধর্মী পরিচালিত সংগঠন হলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি হলো স্বেচ্ছাসেবক।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যাত্রা কখন? এ প্রশ্নের উত্তর অনেকেরই অজানা। ‘হিলফুল ফুজুল’ বা শান্তি সংঘ নামে বিশ্বে প্রথম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর নবুয়ত প্রাপ্তির ১৫ বছর আগে অর্থাৎ ২৫ বছর বয়সে ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে কিছুসংখ্যক আরব যুবকের সমন্বয়ে এই সংঘ গড়ে ওঠে। এরপর ভিনসেন্ট ডি পল ১৬১৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘Ladies of Charity’ এবং ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে Daughter of Charity নামে ২ টি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

আজ আমরা জনপ্রিয় বিভিন্ন সংগঠকের কাছ থেকে জানবো সমাজ সংস্কারে সংগঠনের ভূমিকা, সমাজকল্যাণে বাধা ও প্রতিকার এবং সংগঠকদের কাজের অভিজ্ঞতা।
সমাজ সংস্কারে সামাজিক সংগঠনের ভূমিকা:
সমাজ মূলত একটি সংগঠন। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটিকে কল্পনা করা যায় না। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভার তার ‘ Society: Its Structure & Change’ গ্রন্থে বলেন, সমাজের অর্থ হচ্ছে সহযোগিতা করা। সামাজিক সংগঠন যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে কাজ করার প্রেরণা পাওয়া যায়। সামাজিক সংগঠন মানুষকে কল্যাণমূলক কাজ করতে আমাদেরকে উৎসাহিত করে।আর অপর দিকে চিন্তা করলে দেখা যায়, কল্যানমূলক যে কাজ করা হয়ে থাকে তা প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ ভাবে এ-ই সমাজের জন্যই। সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য থাকে এই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, সমাজকে বিকশিত করার জন্য। এখন মানুষের যে অসহিংসতা, অস্থিরতা সামাজিক অবক্ষয় দেখা যায় এগুলো দূর করতে হলে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ প্রয়োজন। আর সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সুস্থতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কারন সামাজিক সংগঠনগুলোতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আমাদের মাঝে ইতিবাচক গুণাবলী তৈরি হয়। সংগঠনগুলোতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বাড়ে দায়িত্বশীলতা, সেই সাথে বাড়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা। একটি সমাজকে এবং ঐ সমাজের মানুষকে চৌকস মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে একজন উদার মনের মানুষ হতে হলে লেখাপড়ার পাশাপাশি একজন শির্ক্ষাথীকে সামাজিক দায়বদ্ধতায় কাজ করতে হবে। আর সেজন্য সংগঠনের কোন বিকল্প নেই। পরীক্ষায় শুধু ভালো ফল করলে হবে না, একজন ভালো এবং বিচক্ষণ মানুষ হতে হবে। তাই তো বলা হয়, আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে কর্মী হওয়ার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে। ব্যক্তির সাথে সমাজের বন্ধন যখন দূর্বল হয়ে পড়ে ঠিক তখনই নানা ধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আর সমাজের সাথে এই বন্ধন মজবুত করার জন্য আর্দশ সংগঠনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষে মানুষে সম্পর্ক যত গভীর হবে সমাজ ততই ভালো থাকবে সেই সঙ্গে কমবে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। সামাজিক সংগঠন সেবা মূলক কাজ করতে মানুষকে উৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, কল্যান মূলক কাজে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অগ্রসর হও।
চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস এর একটি উক্তি হলো, He who wished to secure the good of others, he has already secured his own.
সংগঠন মানুষকে নেতিবাচক মনোভাব থেকে বেড়িয়ে আসতে সহযোগিতা করে, সেই সাথে হতাশা ও দুঃখবোধ থেকে বেড়িয়ে আসতেও মানুষকে সাহায্য করে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করার পরিস্থিতিও তৈরি করে দেয় সংগঠন।
মানুষ সামাজিক জীব। কোন মানুষই পৃথিবীতে একা বাস করতে পারে না। এই সমাজ শুধু একটি সমাজ নয়, এটি রাষ্ট্রের একটি অংশ। মানুষ যেমন একা চলতে পারে না, তেমনি সমাজও এমনি এমনি চলতে পারে না। সমাজকে সুন্দর করে পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজন হয় সামাজিক সংগঠনের, যাদের মাধ্যমে গড়ে উঠে একটি সচেতন, বিচক্ষণ ও মেধা সম্পন্ন মানুষ । আর এই মানুষ গুলোই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় বহুদূরে। একটি সমাজকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সংগঠনের গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না।
সামাজিক সংগঠন গুলো মূলত সমাজকে পরিবর্তনে লক্ষ্যে তথা সংস্কারের জন্য কাজ করে থাকে। সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলো যেমন সংস্কৃতির বিকাশে,সাহিত্য বিষয়ক সংগঠন যেমন সাহিত্য বিষয়ক প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করে, ঠিক অনুরুপভাবে সামাজিক সংগঠনগুলো সামাজিক সমস্যা নিরসনে তৃণমূল থেকে কাজ করে থাকে।
সমাজ এবং সংগঠন একটি আরেকটির পরিপূরক। বর্তমান সময়ে সমাজ পরিবর্তনে বা সংস্কারে সামাজিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সমাজকে এগিয়ে নিতে সংঘবদ্ধ হওয়ার দরকার ছিল বহু আগে থেকেই, আর এই সংঘবদ্ধ হওয়ার কাজটি করে যাচ্ছে সামাজিক সংগঠন গুলো।
– মাহমুদ হাসান
সংগঠক ও এডভোকেট, জেলা ও দায়রা জাজ আদালত, ঢাকা।
- সামাজিক সংগঠনের কাজে প্রতিবন্ধকতা:
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মূল প্রতিবন্ধকতা হলো অপরিবর্তিত সামাজিক চিন্তাভাবনা , দারিদ্রতা ও বস্তি সমস্যা, অপরাধ ও কিশোর অপরাধ, অজ্ঞতা ও কুসংস্কার, মূল্যবোধের অবক্ষয়, কর্মমুখী ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত ইত্যাদি।
তাছাড়া অন্যান্য বাধা গুলো নিম্নরূপ :
সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে, অর্থনৈতিক সমস্যাই সমাজের প্রধান সমস্যা। এতে নিশ্চয়ই সত্যতা আছে। তবে সামাজিক সমস্যা তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কয়েকজন দুর্বৃত্ত একটি জনপদকে অশান্ত করে তুলতে পারে। আজ কিছু সামাজিক সমস্যার কথা বলবো যা কিনা বাংলাদেশ ছাড়া অনেক দেশেই বিদ্যমান :
১. গিবত ও পরনিন্দা :
আমাদের দেশে ভয়াবহ একটি সামাজিক সমস্যা হলো গীবত, পরনিন্দা বা পর-চর্চা ,যা’ই বলুন না কেন- আপনার আশেপাশে তাকালেই দেখবেন কিছু প্রভাবশালী অথবা সাধারণ জনতা – সবাই একে অন্যের নিন্দায় ব্যতিব্যস্ত। আলোচনার মূলে থাকে অন্যের সমালোচনা আর বিদ্বেষমূলক উত্তপ্ত বাক্য যা সামাজিক কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২. আইন না মানা:
রাষ্ট্রীয় নিয়ম কানুন ও পথনির্দেশনা মানুষের জন্য, পশুপাখির জন্য নয়। আমরা সেটা যথাযথ ভাবে মানিনা।
৩. মাদকদ্রব্য:
মাদক-এর ব্যবহার ইসলামে হারাম। কুরআন সরাসরি এটি হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সমাজের এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে মদ, গাঁজা, চরস, মারিজুয়ানা ও ইয়াবাসহ নানা নামে মাদক বিক্রি ও ব্যবহার চলছে। এটা বন্ধ করতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. যৌতুক:
পুরুষদের স্ত্রীর পক্ষ থেকে যৌতুক গ্রহণ করা বৈধ নয়। ইসলামে স্ত্রীকে মোহরানা দেয়া এবং ভরণপোষণ দেয়া স্বামীর দায়িত্ব। অথচ আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে অনেক বেশি যৌতুক নানা অজুহাতে নেয়া হয়। যৌতুক সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যার সৃষ্টি করে।
৫. ইভটিজিং :
ইভটিজিং বা রাস্তাঘাটে নারীদের বিরক্ত করা একটি সামাজিক ব্যাধী। বিশেষ করে কিশোরী-তরুণীদের গায়ে হাত দেয়া ও অশ্লীল মন্তব্য করা একটি বড় সমস্যা। এখন এর ব্যাপকতা খুবই বেশি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা গড়ে তোলার ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি সর্বপ্রকার অশ্লীলতার প্রচারও
বন্ধ করা উচিত। প্রত্যেক এলাকায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উচিত এ জন্য শক্ত পদক্ষেপ নেয়া। এ ক্ষেত্রে দেশের আইনও সুষ্ঠুভাবে কার্যকর করা দরকার।
৬. অতিমাত্রায় স্মার্টফোনে আসক্তি :
অতিমাত্রায় স্মার্টফোন আসক্তি যুব সমাজকে অতি মাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক করে ফেলেছে ফলে তারা সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হতে চায় না।
৭. জড়তা ও সংকোচ :
জড়তা ও সংকোচবোধ সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। মানব কল্যাণে জড়তা ও সংকোচবোধকে অতিক্রম করে যার যার অবস্থানে থেকে কাজ করতে হবে।
৮. অসামাজিক আচরণ :
সমাজের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারি লোকজন সমাজকর্মীদের সাথে সর্বদা মানবিক আচরণ না করে নিজেদের ক্ষমতা পুরোপুরি বজায় রাখতে সমাজকর্মীদের সাথে অসামাজিক আচরণ করে থাকে।
৯. রাজনৈতিক দলের দৌরাত্ম:
রাজনৈতিক দলের দৌরাত্ম সামাজিক সংগঠন এর সাথে অনেক ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক হয়ে থাকে।
১০. হিংসা ও অহংকার :
আমরা অনেক ক্ষেত্রে ভালো কাজ,ভালো আচরণ, ভালো উদ্দেশ্য এবং ভালো উদ্যোগকে সাধুবাদ দিতে পারিনা বা ভালো কাজের জন্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত না করে বিপরীতে যারা ভালো কাজ করেন তাদেরকে প্রতিনিয়ত হেয় প্রতিপন্ন করতে ছাড়ি না। এধরণের চিন্তা ও চেতনা সামাজিক কাজে বাধার সৃষ্টি করে।
পরিশেষে বলা যায় সামাজ কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পন গ্রহণ করতে হবে।
সবলদের দ্বারা দুর্বলের ওপর অত্যাচার বন্ধ করা , অসহায় মানুষদের পাশে থাকা , নিরাশায় নিমজ্জিত ব্যক্তিদের আশাবাদী ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা পালন করা। চুরি ডাকাতি, নেশাগ্রস্ততা, খুন-ধর্ষণ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
দুর্ঘটনায় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য সহযোগীতার কাজে নিয়োজিত হওয়া। উক্ত কর্মকাণ্ডের সফল বাস্তবায়নই সামাজিক সংগঠনগুলোর সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
– বাহাউদ্দীন বাহার
সাধারণ সম্পাদক, ফ্রেন্ডস এসোসিয়েশন অব মালখানগর।
- কার্যলয় ভেঙ্গে দিয়েছে নেতারা:
বিশেষ করে সমাজের মাতাবর, জনপ্রতিনিধিসহ অনেকেই সমাজকল্যাণে বাধা দেয়। কারণ ভাল কাজ সমাজের কেউ করলে তাদের দৃষ্টিতে তারা খারাপ। এভাবে আমি অনেকের শত্রু হয়েছি। বিশেষ করে করোনার সময় জীবনের রিস্ক নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী করেছিলাম। ইউএনও স্যারের কাছ থেকে ত্রাণ এনে, নিজের সামর্থ্য অনুযারী পুরা ইউনিয়ন ও আশেপাশের ইউনিয়নের অনেকের পাশে দাড়িয়েছিলাম। এগুলা অনেকের ভাল লাগে না। কেন আমরা মানুষের পাশে দাড়াই, মানুষকে হেল্প করি। এগুলা দেখে ধন্যবাদ ও বাহাবা দেওয়া উচিত কিন্তু তারা এমন স্বেচ্ছাসেবীদের দেখতে পারেনা। আমার জীবনে এমন অনেক বাধা এসেছে। ছোট বেলা থেকে সামাজিক কাজ করতে পছন্দ করতাম। ২০০৭/৮ সালের দিকে একটা সংগঠন করে এলাকার যুবকদের নিয়ে কাজ করতেছিলাম কিন্তু অনেক বাধা -বিপত্তি এসেছে। সে সময় কার্যলয় করেছিলাম সেটা ভেংগে দিয়েছিল।
– আহমাদ শিহাব
প্রতিষ্ঠাতা, আলোর পথে সেবা সংঘ।
- যারা সমাজের ভালো চয়না, সমাজের অসমাজিক এবং অসংগতি পূর্ণ কাজের সাথে জড়িত মূলত তারাই সামাজিক কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে।
– মোহাম্মদ আলী হৃদয়
সাধারণ সম্পাদক, আলোর পথে মানবকল্যাণ সংগঠন
- সমাজকল্যাণের বাধা দূর করার উপায়:
বিভিন্নভাবে সামাজিক সংগঠনের কল্যাণমূলক কাজে বাধা আসে। এসব বাধা দূর করার কিছু উপায়।
১. সুসম্পর্ক তৈরি: যারাই বাধা দিবে তাদের চিহ্নিত করে সুসম্পর্ক তৈরি করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘ সময় তাদের পিছনে লেগে থাকতে হবে।
২. কর্মসূচিতে দাওয়াত দেওয়া: সমাজকল্যাণের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের দাওয়াত করা। এতে করে বাধা প্রদানকারীরা তাদের ভুল বোঝতে পারবে।
৩. সহযোগিতা করা: ওইসমস্ত লোকদের কারণে ওকারণে তাদের কাজে স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করা।
৪. সংবিধান ও কর্মসূচি প্রদর্শন: সংবিধান ও কর্মসূচি তাদের দেখিয়ে বোঝানো যে আমরা সমাজে নেতৃত্ব দিতে আসিনি। আপনাদের নেতৃত্ব ও কাজে সহায়তা করতে চাই তা বোঝানো।
– আশরাফ ইকবাল
প্রতিষ্ঠাতা, ঝিকুট ফাউন্ডেশন।
আপনারা জানেন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান বেশ ঐতিহ্যবাহী একটি অঞ্চল। সময়ে সময়ে এই উপজেলা পেয়েছে বহু সৃষ্টিশীল ও মানবদরদি ব্যক্তি, যারা নিজেদের কাজ দিয়ে হাসি ফুটিয়েছেন বহু মানুষের মুখে। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই একটি বিষয় আমাদের সামনে বারবার তুলে ধরা হয়েছে মহান রাব্বুল আলামিন কর্তৃক। আর তা হচ্ছে- মহান সৃষ্টিকর্তার ইবাদাত করা। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের ইবাদাতের ধরন মোটাদাগে দু’টি ভাগে বিভক্ত। এক, আল্লাহর হক। দুই, বান্দার হক। সালাতসহ বিবিধ ইবাদাত সরাসরি আল্লাহর প্রতি নিবেদন হলেও মানুষের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন কাজ করাটাও ইবাদাত হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে থাকলে আল্লাহ খুশি হন। বান্দার ওপর সন্তুষ্ট থাকেন। আর এই সন্তুষ্টির কথা চিন্তাভাবনা করেই সামর্থ্যবান সবার উচিত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
ব্যক্তিগতভাবে আমিও এই কাজে নিয়োজিত। আল্লাহ আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষকে অল্পবিস্তর সামর্থ্য দিয়েছেন মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য। তবে আমি চেষ্টা করছি শুধু ব্যক্তিপর্যায়ে নয়, সামষ্টিক সব মানবদরদি মানুষকে একত্র করে কাজ করার জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় তৈরি করেছি এইচ নূর ফাউন্ডেশন। এএমসিবি ফাউন্ডেশন আমেরিকা প্রবাসী জনাব আসাদ চৌধুরীর হাতে গড়াই এই প্রতিষ্ঠান। এই মানবিক প্রতিষ্ঠানের ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছি দীর্ঘদিন যাবত। শিক্ষার প্রসার, দারিদ্র্য বিমোচন, কুরআনিক আদর্শকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেবার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে ফাউন্ডেশন দু’টি। আমাদের উদ্দেশ্য আদর্শবান, দরিদ্রতা ও শোষণমুক্ত মানবসমাজ গড়ে তোলা। এছাড়াও তরুণদেরকে মাদক ও বিপথগামী হওয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।
এই মুহূর্তে এইচ নূর ও এএমসিবি ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্বে আমি থাকলেও ফাউন্ডেশনের সাথে জড়িয়ে আছেন মানবদরদি বেশকিছু মানুষ। সকলের নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টার ফলে সিরাজদিখান ইছাপুরা অঞ্চলের অগণিত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সক্ষম হয়েছি আমরা। গত রমজান মাসে বিভিন্ন মাদ্রাসায় সাহায্য প্রেরণ ছাড়াও রমজান জুড়ে ইছাপুরা ইউনিয়নের সকল শ্রমজীবী মানুষদেরকে ইফতার করানোর কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলাম আমরা, এইচ নূর ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে। শুধু ফাউন্ডেশনের আন্ডারে নয়, ইতোপূর্বে করোনাকালীন জটিল সময়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার কাজ, রোগীদেরকে আর্থিক সাহায্য করার মতো বহুবিধ সমাজকল্যাণমূলক কাজ করেছি। একক দায়িত্বে নয়, বরং নিজের টিমকে সাথে নিয়ে কাজ করেছি। বিস্তৃত পরিসরে কাজ নিশ্চিত করার জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে সকল সময়ে যারা আমার সাথে ছিলো, তাদের প্রতি ভালোবাসা সীমাহীন। যখনই ডেকেছি, সবাইকে সাথে পেয়েছি। এটা আমার জন্য সত্যিই আনন্দের। তাই মানবকল্যাণমূলক সকল কাজের ক্রেডিট টিমের সবার প্রাপ্য। সবাইকে অভিনন্দন জানাচ্ছি আমি, সকল আল্লাহর সৈনিককে।
দু’টি ফাউন্ডেশনের আন্ডারে আমাদের নিয়মিত চলতে থাকা মানবিক কাজের কার্যক্রমের সংখ্যাও বিস্তৃত। শুধুই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমি কাজ করি। ভবিষ্যতে সিরাজদিখান ইছাপুরা অঞ্চলের সার্বিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে কাজ করে যাবো। এটাই আমার স্বপ্ন এবং মূল লক্ষ্য। সিরাজদিখানের মাটিতে আমার জন্ম। এই মাটির প্রতি আমার ভালোবাসা। মানুষের জন্য ভালোবাসা। মানুষকে দেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে, করার আছে বহু কাজ।। নিজে তা করে যাবো আমৃত্যু। এমনকি সবাইকে আহ্বানও করছি একই কাজ করার জন্য।
এইচ নূর ও এএমসিবি ফাউন্ডেশন কেবল মানবকল্যাণেই নয়, পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও কাজ করছে। বিবিধ উদ্যোগ, আয়োজন, সৃষ্টিশীল প্রতিযোগিতা সম্পন্ন করতে পৃষ্ঠপোষকতার করি আমরা। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন টুর্নামেন্ট, ইভেন্ট আয়োজন করা হয় ফাউন্ডেশন কতৃক। এছাড়াও তরুণদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে তৈরি করা হয়েছে সামাজিক সংগঠন। সংগঠনের নানা কর্মকান্ডে পৃষ্ঠপোষকতা করি আমরা। কখনো ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে, কখনো আবার ব্যক্তি উদ্যোগেই পৃষ্ঠপোষকতার চেষ্টা অব্যাহত রাখি আমি। আমাদের আরেকটি যুব সংগঠন হচ্ছে লালবাড়ী যুব সংঘ। মাদক প্রতিরোধ, উজ্জীবিত তরুণ সমাজ তৈরি, তরুণদের স্পৃহা তৈরিতে সংগঠনের পক্ষে সকল কাজ চলমান রয়েছে, নেয়া হচ্ছে বিবিধ উদ্যোগ।
এভাবেই এইচ নূর ফাউন্ডেশন ও এএমসিবি ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে সিরাজদিখান ইছাপুরা অঞ্চলের অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য। একক ক্ষেত্রে নয়, বরং সার্বিক সবদিকে নজর দিয়ে কাজ করছি আমরা। কাজ করে যাচ্ছে অন্তরালে থাকা মানুষজন। ভবিষ্যতকেও আরো সুন্দর করার জন্য আমরা আশাবাদী। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমরা নিজেদের কার্যক্রমের উত্তরোত্তর উন্নতির চেষ্টা করছি, আরো বিস্তৃত পরিসরে কাজ করাই আমাদের স্বপ্ন। নিশ্চিত করেই বলতে পারি, এইচ নূর ফাউন্ডেশন এবং এএমসিবি ফাউন্ডেশনের হাত ধরে সময়ের পরিক্রমায় এগিয়ে যাবে সিরাজদিখান, এগিয়ে যাবে ইছাপুরা, গড়ে উঠবে সুষ্ঠু এক সমাজব্যবস্থা। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণে বদ্ধপরিকর আমি। যতদিন দেহে প্রাণ থাকবে, ততদিন কাজ করে যাবো সবার জন্য, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক সামর্থ্য ব্যবহার করার মাধ্যমে, ইনশাআল্লাহ।
সবাই ভালো থাকুন। মানুষের পাশে দাঁড়ান। হাত বাড়িয়ে দিন আরেকজন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। নিশ্চয়ই মানবকল্যাণেই রয়েছে মুক্তি।
শুভকামনা সবার জন্য। আল্লাহ সহায় হোক!
-এ এন এম হুমায়ূন কবির সাগর
সভাপতি
এইচ নূর ফাউন্ডেশন ও এএমসিবি ফাউন্ডেশন
ছাত্র জীবন থেকেই আমি চেস্টা করতাম সামাজিক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে। ৭ম শ্রেণি থেকে একাধিকবার ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম। চাঁদের হাট ও আন্ত স্কুল দেওয়ালিকা লিখনে একাধিক বার সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করেছি। ছাত্র অবস্থায় ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তিতে এবং উপবৃত্তি পেতে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছি। দীর্ঘ সময়ে আমি সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছি। বিশেষ করে ‘Covid 19’/করনা কালীন সময়ে জন জনসচেতনা মুলক প্রচার ও প্রচারণা কাজে। ঐ সময় প্রবাসী ভাইদের থেকে অর্থ কালেকশন ও যথাযথভাবে বিতরণ। সংগঠন এর মাধ্যমে দুস্থ ও অসহায় মানুষ কে আর্থিক ও খাদ্যে সামগ্রী দিয়ে সহায়তা করা। গ্রহিতাদের প্রাপ্তির আনন্দেই আমি আনন্দিত। সেচ্ছা শ্রম সার্থক। এই সংঠনের মাধ্যমে প্রায়ই মাদক দ্রব্য কেনা বেছা ও সেবনে নিরুৎসাহিত করা হয়।থানা পুলিশ কে সহায়তা, খেলাধুলার মাধ্যমে কিশোর ও যুবকদের কে ব্যস্ত রাখার জন্য ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও মেলার আয়োজন করে থাকে।ফ্রি মেডিকেল টিম,গাছ লাগানো, কবরস্থান পরিস্কার উন্নয়ন ও পরিচর্যা করাও এই সংগঠনের অন্যতম কাজ।
পরিশেষে সবার সু-স্বাস্থ ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।কর্মের মাধ্যমেই বেচে থাকতে চাই হাজার বছর। আল্লাহ হাফেজ
– মো. শরিফ দেওয়ান
সাবেক কোষাধ্যক্ষ, জাগরণী সংসদ।
- সমাজকল্যাণ করে মানুষের কষ্ট দুঃখ কাছে থেকে দেখতে পেরেছি।
মানুষ অসহায়ত্ত্বের শেষ পর্যায় আসলে মানুষের কাছে হাত বাড়ায়। মানুষের জন্য কাজ করে অনেক ভালোবাসা সম্মান পেয়েছি।
– মহিউদ্দিন আজাদ
প্রতিষ্ঠাতা, মহৎ কাজে আমরা সবাই।
পরিশেষে বলা যায় সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সবাই কামনা করে কিন্তু প্রকৃত কল্যাণ তখনই সম্ভব, যখন সেখানে সবাই হবে মুখ্য উদ্দেশ্য। সমাজের উন্নতির জন্য শ্রম, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। সামাজিক সংগঠনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রতিটি সংগঠকদের ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। দায়িত্বশীল ও দক্ষ নাগরিক হতে হবে। সমাজে আজও সেই বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, কিশোর অপরাধ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বৈষম্য, অশিক্ষিত লোকদের প্রাধান্য যেন বেড়েই চলছে। এসব সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে। তরুণদের হাত ধরে সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব। সকলকে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করছি।