
উপ সম্পাদকীয়
গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল :
বাংলা অঞ্চলে ক্ষমতাধর রাজা ও সরকার প্রধান পালিয়েছেন এমন ঘটনা দু’টি। আমাদের হাতে থাকা তথ্যানুসারে শক্তিধর মহারাজাধিরাজ লক্ষ্মণসেন প্রথম পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছিলেন। মহারাজ লক্ষণ সেন মহারাজাধিরাজ বল্লাল সেনের পুত্র। রাজা লক্ষ্মনসেন ১২০৪ মতান্তরে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম সেনানায়ক ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর আক্রমণে নদীয়া ছেড়ে পেছনের দরজা দিয়ে বিক্রমপুর বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলায় পালিয়ে আসেন। দ্বিতীয় ঘটনাটি ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট দুপুরের পর। অর্থাৎ দুপুর ২টা ৩০ ঘটিকা থেকে ৩ টার মধ্যে সংঘটিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশে। এদিন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার ভয়ে গণভবন থেকে পালিয়ে যান পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় কন্যা।
লক্ষ্মনসেন মুসলিম বিজেতা ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজীর আক্রমণে সৈন্য, সামন্ত, উজির, অধিকারী পাইক, পেয়াদা সব রেখে নৌকায় করে নদী পথে পালিয়ে যান। সতেরো জন মুসলিম সৈন্যের ভয়ে একজন ক্ষমতাধর রাজার পলায়ন কলঙ্ক এখনো ইতিহাসে নিয়মিত চর্চা হয়ে আসছে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন রাজা সামন্ত রাজা, উজির ও মন্ত্রীদের উপর নির্ভর হয়ে জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ছিলেন রাজা লক্ষ্মনসেন। যার ফলে রাজা লক্ষ্মনসেন প্রজাদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। অন্য দিকে মন্ত্রীরা ও সামন্ত রাজারা প্রজা সাধারণের সাথে অত্যাচার ও অসদাচরণ করে। ফলে রাজার প্রতি প্রজাদের ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে। লক্ষ্মনসেনের সৈন্য বাহিনী ও বিদেশী শক্তির মোকাবেলায় যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল বলে মনে হয়না। গ্রাম, নগর, সৈন্য পুরোহিত সবাই লক্ষ্মনসেনের প্রতি সন্তুষ্ট ছিল না। অন্য ধর্মের লোকদের বিশেষ করে মুসলমান ও বৌদ্ধদের প্রতি চলছিল নির্যাতন। ফলে রাজার প্রতি রাজ্যের নাগরিকরা মনে মনে অনাস্থা দিয়ে রাখে। সেই সাথে বাংলার প্রজারা লক্ষ্মনসেনের শাসন থেকে মুক্তি চাইছিলো। লক্ষ্মণসেনের উদাসীনতার সুযোগে সামন্ত রাজা ও জমিদাররা সাধারণ প্রজাদের উপর চালায় অমানবিক নির্যাতন। তাই সাধারণ প্রজারা নতুন রাজা বা শাসক চাইছিল। সেই সুযোগেই ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন। রাজা ভীত সন্তস্ত্র হয়ে বঙ্গের প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুর অর্থাৎ আজকের মুন্সীগঞ্জ জেলায় পালিয়ে চলে আসেন। মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুর ছিল সেন রাজাদের প্রধান রাজধানী লক্ষ্মনসেনই বাংলার প্রথম রাজা বর্হিশত্রুর আক্রমণের ভয়ে পালিয়ে ছিলেন। তার পলায়ন কলঙ্ক নিয়ে শত শত বছর আগে কবিতা লেখা হয়েছিল। কবিতার কয়েকটি চরণ এখানে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো- “ যে কালে লক্ষ্মনসেন নীলাচল চলে/হিন্দু রাজ্য শেষ হইল যবনের বলে” (মেলমালা)// আরো একটি দীর্ঘ কবিতা আছে লক্ষ্মসেনের পালানো নিয়ে। যা এখানে তুলে ধরা হলো। কবিতাটি শ্রীরাম চন্দ্র চক্রবর্তী প্রণীত, প্রিয় পাঠ। এই কবিতাটি ১৮৮৯ সালে কোলকাতা সেন্ট্রাল টেকস্ট বুক কমিটি অনুমোদিত এ কবিতাটি। “তুমি কেহে নবদ্বীপ অন্তঃপুর দ্বারে, রমনী অঞ্চল ধুরি কম্প থরে থরে। কালামুখ ভীরু বৃদ্ধরাজ কুলাঙ্গার/চঞ্চল হৃদয় বাকশক্তিহীন/গাঢ় অমা অন্ধকারে বদন মলিন/ নিশ্বাসে প্রবল বায়ু নয়নে অসার তুমি গঙ্গার এই গভীর উরসে/তরি যোগে পালাইছ ঘন ঊর্ধ্বশ্বাসে/চাহিয়া পশ্চাৎ পানে তিলে শতবার/একি ঘোর কোলাহল তোরণ দুয়ারে/গরজে কি কাল মেঘ প্রলয় সহকারে//” এটি একটি অনেক বড় কবিতা। এই কবিতাটি সম্পূর্ণ পাঠে জানা যায়, লক্ষ্মনসেনের মন্ত্রী, বুদ্ধিদাতা কবি হলায়ুধ উজির, নাজির সবাই রাজধানী ছেড়ে মুসলমানদের আক্রমণের ভয়ে আগেই পালিয়ে ছিলেন। কিন্তু মহারাজাধিরাজ লক্ষ্মনসেন আক্রমণের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। যখন মোহাম্মদ বিন ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজী নদিয়া আক্রমণ করলেন তখন পালিয়ে বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলায় চলে আসেন। তখন নদীয়া “শূণ্য”। এর ঠিক সোয়া আটশত বছর পর বাংলাদেশ থেকে পালালেন দুর্নীতিবাজ, ফেসিষ্ট, হাজার খানে ছাত্র হত্যাকারী, গুম খুনের প্রধান হোতা, আওয়ামীলীগ সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা ছিলেন বিনা ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। তার ১৫ বছর শাসনামলে কোন ভোটার ভোট দিতে পারেনি। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী দলও মতকে দমন করা হতো। এ দমন পীড়নে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করা হতো। শেখ হাসিনা আওয়ামীলীগের তৃণমূল নেতা কর্মীদের মূল্যায়ন করেনি। সরকারে টিকে থাকতে সুযোগ সুবিধা দিয়েছে জেলা প্রশাসন, আমলা ও পুলিশ প্রশাসনকে। এরই ফলে আওয়ামীলীগের ভিতরে গভীর ক্ষোভ ও ফাঁটল দেখা দেয়। সিনিয়র নেতাদের অবমূল্যায়ন ও আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের অন্যতম সহায়ক। তোফায়েল আহমদ, আমির হোসেন আমু, মোঃ নাসিমদের মতো সিনিয়র নেতা বাদ দিয়ে শেখ হাসিনার মন্ত্রী পরিষদ দেশের মানুষ বিশেষ করে আওয়ামীলীগের একাংশ মেনে নিতে পারেনি। দেশের মানুষ তো পরের কথা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার কার্যকলাপে মুখ খুলতে পারেনি। আর ভোট দিতে না পারায় দেশে সাধারণ জনগণ শেখ হাসিনার প্রতি চরম ক্ষোভ পোষন করতো। শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের জুলুম নির্যাতন দেশের ১৮ কোটি জনগণ মুক্তির পথ খুঁজছিল। সত্য কথা লিখতে যেয়ে দেশের অত্যন্ত পাঠক প্রিয় পত্রিকা দৈনিক ইনকিলাব বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে জাতীয়তাবাদী বিএনপি সমর্থিত দৈনিক আমার দেশ ও দৈনিক দিনকাল পত্রিকা। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, গায়ক, নায়ক সহ সকল শ্রেণির লোক। দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনীর চাতুরতা ও বুদ্ধিমত্তায় শেখ হাসিনার দুঃশাসন থেকে দেশ দ্বিতীয় দফা স্বাধীন হয়। হাজার খানেক ছাত্র জনতার রক্তের বিনিময়ে আমাদের এ নতুন স্বাধীনতা। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দের লক্ষ্মনসেনের পলায়নের পর বাঙালিরা কী শ্লোগান দিয়ে ছিল তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু ৫ আগষ্ট ২০২৪ আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতার শ্লোগান ছিল “পালাইছে রে পালাইছে//শেখ হাসিনা পালাইছে//” আবু সাঈদ মুগ্ধ/ থামেনি তো যুদ্ধ//” পালাইছে রে পালাইছে/স্বৈরাচার পালাইছে” ৩ ও ৪ আগষ্ট অবসর প্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের দিক নির্দেশনা স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রবল প্রতিরোধে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের গণভবন ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পালিয়ে যান। লক্ষ্মনসেনের সময় সকল উজির, নাজির, মন্ত্রী, পন্ডিত সভাসদ পলায়ন করে। ঠিক তেমনি ৫ আগষ্ট ২০২৪ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী, ৩৫০ জন সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা, কর্মীরাও পালালেন। শেখ হাসিনার দেশ ও জনগণ নিয়ে হঠকারীতার জন্যই পতন ও দেশ ত্যাগ। ইতিহাস পাঠে জানা যায় বাংলায় এই পলায়ন ঘটনা দুইবার লক্ষ্মনসেন ও শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার পলায়ন কলঙ্ক তার নিজের ও তার দল আওয়ামীলীগের দীর্ঘযুগ ললাটে বহন করতে হবে।
লেখক : ইতিহাস ও প্রত্ন গবেষক।