
জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়েও স্বীকৃতি পায়নি ইউনুস হোসাইন
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আহত দুই সৈনিক কোন মার্যাদা পায়নি। এ পর্যন্ত তার খোঁজ কেউ নেয়নি। এমন একজন যুদ্ধাহত শিক্ষার্থীর নাম পাওয়া গেছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে, পায়ের হাড় ভেঙ্গেছে, কলেজ কর্তৃপক্ষ আহত হিসেবে সংবর্ধনা দিয়েছে কিন্তু তার নাম কোথাও নেই। তার দাবী সে প্রধান আন্দোলনকারী হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। যুদ্ধাহত ছেলেটি দু:খের সাথে লিখেছেন আমার বিষয়টি খুবই খারাপ লেগেছে আমি ছিলাম প্রধান আন্দোলনকারী। আর সুবিধা নিচ্ছে তথাকথিত কিছু আন্দোলনকারী। অপরজন হলেন সাংবাদিক হুমায়ুন কবির। হামলা ও একাধিক মামলার আসামী হয়েও কোন স্বীকৃতি পাননি তিনি।
যুদ্ধাহত ছেলেটির নাম ইউনুস হোসাইন, পিতা: শাহজালাল বেপারী, মাতা আমেনা বেগম, গ্রাম: পূর্ব বাগের চর, পোষ্ট অফিস মহেষপুর, বাংলাবাজার ইউনিয়ন, সদর, মুন্সীগঞ্জ। তিনি সরকারি হরগঙ্গা কলেজের ইংরেজী ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। যুদ্ধাহত হিসেবে কলেজের ডিপার্টমেন্ট তাকে যুদ্ধাহত হিসেবে সংবর্ধণাও দিয়েছেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তার নাম কোথাও নেই। ইউনুস হোসাইনের সাথে নয়াদিগন্ত প্রতিনিধির সাক্ষাত হয় একটি বইয়ের লাইব্রেরীতে।
ইউনুস হোসাইন ৪ আগষ্ট কিভাবে আন্দোলনে আসলেন কিভাবে আহত হলেন সে বিষয়ে তিনি জানান, আমি (ইউনুস হোসাইন) ৪ আগস্ট বাংলাবাজার থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ২শত লোকজন নিয়ে সুপার মার্কেট চত্বরে এসে ফ্যাসিষ্ট সরকারের সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করি। এ সময় আমাদের মধ্যে কয়েকজন শহীদ হন। আহত হয়েছেন অনেকে।
ইউনুস হোসাইন আরো জানান, ৪ আগষ্ট তারিখে আমি যখন আমার বোনের বাসা (মোহনপুর, মতলব উত্তর, চাঁদপুর) থেকে রওনা দিয়েছিলাম তখন আমার মা এবং বোন আমাকে বাঁধা দেওয়া চেষ্টা করে। আমি ওনাদের বাঁধা উপেক্ষা করে ষাটনল দিয়ে প্রথমে মুন্সীগঞ্জ আসি ট্রলার যোগে। সেখান থেকে প্রথমেই আমি মুন্সিরহাট আসি। মুন্সিহাট আসার পর আমাদের ব্যাচমেট রিয়াদ (০১৬৯২৫৫৮৯১৮), যে ইকোনমি ডিপার্টমেন্ট অধ্যয়নরত আছেন, ওর সাথে দেখা হওয়ার পর আমরা দুইজন ইসলামপুর দিয়ে কৃষি ব্যাংকের সামনের দিকে আমরা জমায়েত হই। আমি প্রায় ২/৩’শ মেয়ে শিক্ষার্থী ও নারীদের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। যখন ছাত্রলীগের কর্মীরা আমাদের দিকে গুলি আর ইট পাটকেল ছুড়তো তখন আমি সামনে থেকে মহিলাদের একটি বাড়ির গেটের ভিতরে নিয়ে গিয়ে গেট তালা বন্ধ করে দিতাম। আবার তালা খুলে তাদের আন্দোলনে শামিল করতাম।
তিনি আরো বলেন, আন্দোলনের এক মুহুর্তে একটি ছেলের বুকে গুলি লাগে আমার চোখের সামনেই। পরবর্তীতে ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আন্দোলনের এক মুহুর্তে বিকেল প্রায় ৪ টার দিকে হঠাৎ একটা বুলেট আমার পায়ে হালকা লেগে বের হয়ে যায়। এতে আমার হাড্ডি ভেঙে যায়।
আমি (ইউনুস হোসাইন) রাস্তায় প্যানিক এ্যাটাকে পড়ে যাই মাটিতে। আমি দেখতেছি ছাত্রলীগের কর্মীরা আমাদের দিকে দৌড়ে আসতেছে। আমি মৃত্যুকে কাছ থেকে অনুভব করেছিলাম ঐদিন। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে কোথা থেকে যেনো আমার ২ জন শুভাকাঙ্ক্ষী এসে আমাকে টেনে হিঁচড়ে একটা গেটের ভিতরে আমাকে রেখে গেট লাগিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে একটি বাড়িতে আমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছিলো (ঐ বাড়িতে এখনও মাঝেমধ্যে যাওয়া হয়)। একে তো পায়ে গুলি লেগে হাড্ডি ভেঙে যায় গিয়েছিলো একটু। তার ওপর পায়ে কাঁচ ঢুকে গিয়েছিলো সেখানে ৩/৪ টা সেলাই লেগেছিলো। সারা শরীর রক্তাক্ত অবস্থায় ছিলো। অনেকে বলেছিলো সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে কিন্তু ঐখানে ছাত্রলীগ থাকায় আর নিয়ে যায় নাই।
পরবর্তীতে আমি চলে যাই আমার বোনের বাসায় মোহনপুরে। সেখানে আমার দূরসম্পর্কের একজন মামা ডাক্তার ছিলেন, ওনার কাছে চিকিৎসা নেই।
পরবর্তীতে সুস্থ হওয়ার পর আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। তৎকালীন হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ সুভাসচন্দ্র হিরা স্যার, ইংরেজি বিভাগের সিরাজুল হক মুনির স্যারসহ সকল স্যার আমাকে বাহবা জানিয়েছিলেন। কিন্তু দু:খের বিষয় হলো আমার নাম কোন তালিকায়ই নাই। কিভাবে এই তালিকা হলো?
ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ও ম্যানেজার সিদ্ধার্থ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ওকে আমাদের কলেজ থেকে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে আহত হিসেবে সংবর্ধনা দেই। কিন্তু কিভাবে তার নাম ২৪ এর যুদ্ধাহত তালিকা থেকে বাদ পড়লো তা আমাদের বুঝে আসে না। এই ছাত্র আমাদের প্রিয় ছাত্র। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে আহত হয়েও কেন সাহায্য সহযোগিতা পেলো না সেটা দু:খের বিষয়।