
বহিষ্কার, বিদ্রোহ আর ভাঙনের রাজনীতি
আব্দুস সালাম
মুন্সিগঞ্জ নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির রাজনীতি ততই জটিল হয়ে উঠছে। বহিষ্কার, পাল্টা বিদ্রোহ এবং গণপদত্যাগের নাটকীয় ঘোষণায় সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত দলটি এখন বড় এক প্রশ্নের মুখে—১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ কি আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সময়ে জেলা আহ্বায়ক সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। ফলে নির্বাচনের ঠিক আগে জেলা বিএনপি কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় পড়েছে। এই নেতৃত্বশূন্যতার মধ্যেই শুরু হয় ভাঙনের রাজনীতি। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে একের পর এক সংবাদ সম্মেলনে গজারিয়া ও সদর উপজেলায় মোট ৮৪ জন নেতাকর্মী দলত্যাগের ঘোষণা দেন। পদত্যাগকারীরা দাবি করেন, তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে জনপ্রিয় নেতাদের বহিষ্কার করায় তারা দল ছাড়ছেন। তবে জেলা ও উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতা এই পদত্যাগকে ‘সাংগঠনিকভাবে অকার্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন। তাদের বক্তব্য, যারা পদত্যাগ করছেন তারা মূলত বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর ঘনিষ্ঠ বলয়ের লোকজন এবং বহিষ্কারের আশঙ্কায় আগেভাগেই অবস্থান বদলাচ্ছেন। গত কয়েকদিনে জেলা বিএনপি, যুবদল, মহিলা দল, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে একাধিক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কয়েকটি ইউনিয়ন কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে কেন্দ্রীয় নির্দেশে। এতে দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ, বিভ্রান্তি ও দ্বিধা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নির্বাচনী প্রচারণায়। মাঠে ধানের শীষের প্রচার কার্যক্রম অনেক এলাকায় স্থবির। কোথাও পোস্টার নেই, কোথাও কর্মী নেই, আবার কোথাও কর্মীরা প্রকাশ্যে দ্বিধান্বিত। অনেক তৃণমূল নেতাকর্মী প্রকাশ্যে কিছু না বললেও আড়ালে বলছেন, “কে কাকে নিয়ে মাঠে নামবে, সেটাই পরিষ্কার না।” এর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে মাঠে দেখা যাচ্ছে সংগঠিত উপস্থিতি, নিয়মিত সভা ও কর্মী তৎপরতা। এতে ভোটের সমীকরণে ধানের শীষ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সমাজকল্যাণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান রতন অবশ্য কঠোর অবস্থানে। তার ভাষায়, “দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছিলেন, তারা দল ছেড়েছেন। এতে দল শুদ্ধ হয়েছে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শুদ্ধিকরণ নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে এসে আদৌ ভোটের মাঠে কাজে লাগবে কি না। মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব দীর্ঘদিনের। সেই বাস্তবতায় হঠাৎ করে বহিষ্কার আর দলছুট নেতাকর্মীদের বাইরে রেখে নির্বাচনে নামা ধানের শীষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু একটি ভোটের দিন নয়, এটি মুন্সীগঞ্জ বিএনপির সাংগঠনিক শক্তির বাস্তব পরীক্ষা। ভাঙনের এই ধাক্কা সামলে দল ঘুরে দাঁড়াতে পারে, নাকি ধানের শীষের ভরাডুবিই লিখে যাবে এই অধ্যায়—সে উত্তর দেবে ব্যালট বাক্স।