
আরিফুর রহমানঃ
মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বয়রাগাদি ইউনিয়নের গোবরদি মৌজায় সরকারি ভিপি (অর্পিত) সম্পত্তিসহ কৃষিজমি বালু দিয়ে ভরাট করে শ্রেণি পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এর মধ্যে গোবরদি মৌজার ২০৮/৭৩ নম্বর ভিপি (অর্পিত) কেসের প্রায় ৩২ শতাংশ কৃষিজমি বালু দিয়ে ভরাট করা হয়। একই এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন আরও বেশ কিছু কৃষিজমি বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সরকারি ভিপি (অর্পিত) সম্পত্তি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর থাকলেও জমি ভরাট করা হচ্ছে এ বিষয়টি কীভাবে দীর্ঘদিন নজরদারির বাইরে রইল” এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
“স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে” গোবরদি মৌজার ভিপি (অর্পিত) কেস নং-২০৮/৭৩, এসএ দাগ নং-১৩৭৫ ও ১৩৭৬-এর প্রায় ৩২ শতাংশ ভিপি লিজভুক্ত কৃষিজমি ইতোমধ্যে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের উদ্দেশ্যেই এ ভরাট করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, গত বছরও একই মৌজায় প্রায় এক একর কৃষি ভিপি (অর্পিত) সম্পত্তি বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এভাবে কৃষিজমি ভরাটের ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি লিজভুক্ত সম্পত্তি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে মালখানগর ইউনিয়নের তালতলা বাজার থেকে নাটেশ্বর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে প্রায় পাঁচ থেকে ছয়টি আনলোড ড্রেজার বসিয়ে পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রামের কৃষিজমি ভরাট করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকার পরও কীভাবে অনুমতি ছাড়া সরকারি ভিপি (অর্পিত) কৃষিজমি বালু দিয়ে ভরাট করে শ্রেণি পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বয়রাগাদি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বালু ভরাটের বিষয়টি আমি জানি না। আপনার কাছ থেকেই এইমাত্র জানতে পারলাম। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ইউএনও স্যারকে জানাব।”
মালখানগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব বলেন, “মালখানগর এলাকায় যেসব কৃষিজমি, খাল-বিল ভরাটের প্রস্তুতি চলছে এবং যেসব আনলোড ড্রেজারের পাইপলাইন বসানো হয়েছে, সেগুলোর ছবি তুলে এসিল্যান্ড ও ইউএনও স্যারকে পঠিয়েছি।”
এ বিষয়ে সিরাজদিখান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শিব্বির আহমেদ বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি গতকাল অবগত হয়েছি। সংশ্লিষ্ট নায়েবকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুম্পা ঘোষ বলেন, “সরকারি ভিপি (অর্পিত) কৃষিজমি ভরাটের বিষয়টি আমি জানতাম না। আপনার কাছ থেকেই জানতে পারলাম। ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লিজের শর্ত ভঙ্গ হয়ে থাকলে লিজ বাতিল করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “পুরো উপজেলায় অবৈধভাবে কৃষিজমি ভরাটের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এ সময় বালু ভরাটে ব্যবহৃত পাইপ ও আনলোড ড্রেজার ধ্বংস করা হচ্ছে।”
সরকারি ভিপি (অর্পিত) সম্পত্তি অবৈধভাবে ভরাট করে জমির শ্রেণি বা প্রকৃতি পরিবর্তন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ১২ ধারায় সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বার্থযুক্ত বা জনসাধারণের ব্যবহার্য ভূমি অবৈধভাবে ভরাট করে এর শ্রেণি বা প্রকৃতি পরিবর্তন করলে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া একই আইনের ১৩ ধারায় জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবাদযোগ্য বা কর্ষণীয় জমির উপরিভাগ কর্তন কিংবা রেকর্ডীয় মালিকের অনুমতি ছাড়া বালু বা মাটি দিয়ে জমি ভরাট করাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে অবৈধভাবে ভরাট করা মাটি বা বালু অপসারণ করে জমিকে আগের শ্রেণি বা প্রকৃতিতে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এ ছাড়া ভিপি (অর্পিত) সম্পত্তির লিজের শর্ত ভঙ্গ করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা অবৈধভাবে ভরাট করা হলে সংশ্লিষ্ট লিজ বাতিল করে জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
ফলে গোবরদি মৌজার সরকারি ভিপি (অর্পিত) সম্পত্তি ভরাট ও শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় সরকারি ভিপি (অর্পিত) সম্পত্তি ভরাটের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভরাট করা জমি পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।