
বর্ষন মোহাম্মদ:
মাছ বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রজাতিগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে বাংলার মৎস সম্পদ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় ছিল অনন্য। বৈচিত্র্যময় জলজ পরিবেশ আর জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একসময় জলাশয়গুলো ছিল প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা অসংখ্য দেশীয় প্রজাতির মাছের ভান্ডার। সারা বছর ধরে ক্ষেত-খামারে, খালে-বিলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। জাল পাতলেই কই, টেংরা, পুটি, বইচা, চান্দা, চিতল, বাইং, কাইক্কা, লাটি, শইল, মাগুর, শিংসহ নানা প্রজাতির মাছে জাল ভরে উঠত। অন্যদিকে নদীতে বিষ (ট্যাবলেট), ভেসাল জাল, ঘের (জাগ) ও ফরত (কঞ্চির বেড়াবিশেষ) দিয়ে অবৈধভাবে মাছ ধরা হচ্ছে। বিষ প্রয়োগের কারণে মাছের অবাধ বিচরণ বন্ধ রয়েছে আর হুমকির মুখে পড়েছে মাছের প্রজননব্যবস্থা। আবার এসব ঘের আর ভেসাল জালের কারণে নৌযান চলাচলে তৈরি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা। পরিবেশ ও মৎস বিজ্ঞানীদের মতে, মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে কয়েক দশক পুর্বেও এ অঞ্চলে আড়াইশত প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ছিল। কিন্তু মনুষ্য সৃষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এসব মাছের অনেক প্রজাতি এখন চোখে পড়ে না। তাছাড়া বর্ষা মৌসুমের সময় নদী-খাল-বিল থেকে কারেন্ট জালের মাধ্যমে ব্যাপকহারে ডিমওয়ালা মাছ ধরার কারণে দেশীয় মিঠা পানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কালের গর্ভে মাছে-ভাতে বাঙ্গালীর ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে হুমকির মুখে দেশীয় প্রজাতির মাছ। ২৬০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এসব মাছ হারিয়ে যাবে বলে জানান গবেষকরা। তবে দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়ে মৎস অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, বিলুপ্ত হতে যাওয়া ২৩ প্রজাতির মাছ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রধান নদী ধলেশ্বরী থেকে দিন দিন মাছ কমে যাচ্ছে। জেলেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলেও তেমন মাছ পায় না। এ জন্য অব্যাহত নদী দূষণ এবং নাব্যতা সংকটকেই প্রধান কারণ মনে করছে মৎস্য খাত সংশ্লিষ্টরা।
একটা সময় ছিল যখন নদী পাড়ের বাসিন্দারা একটি জাল নিয়ে নামলেই তার দৈনন্দিন চাহিদার মাছ পেয়ে যেত। কিন্তু তা এখন কেবলই স্মৃতি। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী গত কয়েক দশকে যেমন তার যৌবন হারিয়েছে, তেমনি বিলীন হয়েছে মাছের অস্তিত্বও। এ দুটি নদী এখন মাছ শূন্য। তাইতো নদীতে এখন আর তেমন জেলেদেরও দেখা মেলে না। মাঝে মধ্যে কিছু জেলে নৌকা আর জাল নিয়ে এই নদীতে আসলেও তাদের অধিকাংশ সময় খালি হাতেই ফিরতে হয়। আগে নদীতে গেলেই মাছ পাইতাম। বেলা উঠার আগেই পাড়ার জেলেদের নিয়ে নদীতে যাইতাম। কতো সময় পালানে (পরিত্যাক্ত জমি) জাল বাইতাম। ঘণ্টাখানেক জাল বেয়ে দশটার আগেই বাজারে মাছ উঠাইতাম। কাওরে ভাগ ভাটওয়ারাও দিতে অইতো না। যা কামাইতাম ওতেই সংসার চইলা যাইত। অহন মাছ সব পালা। খোলা পানিতে চাইলেই মাছ পাই না। অহন পালা মাছ মাইরা দিতে অয়। একদিন একজনের পুকুরে পালা মাছ মাইরা দিলে পরের দিন বেকার বইয়া থাকি।’ এভাবে কথাগুলো বললেন টঙ্গীবাড়ী উপজেলার হাসাইল বানারী ইউনিয়নের সীমানাধীন জেলেপাড়ার বাসিন্দা ননী গোপাল । ননী গোপালে মতো জেলে সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড় এলাকার জেলেরা বলেন, এক সময় মাছ ধরতে গেলে মাছে নৌকা বোঝায় হয়ে যেত। কিন্তু এখন আগের তুলনায় পাঁচ ভাগের এক ভাগও মাছ ধরা যায় না। খাল-বিলে মাছ কমে যাওয়ায় অনেক জেলে বাব-দাদার পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। আগে খোলা নদী-নালা থেকে স্বাধীনভাবে মাছে ধরে সংসার ভালোভাবেই চলে যেত। এখন মুক্ত নদ-নদীতে আগের মতো মাছ না থাকায় চাষ করা পুকুরে দিনমুজুর হিসেবে মাছ ধরে দিতে হয়। এতে সপ্তাহে দু-একদিন এধরনের পুকুরে মাছ ধরার সুযোগ পেলেও বেশিরভাগ দিন কাটে অবসরে।
ভেসাল জালের অবৈধ ব্যবহারের মাধ্যমে অবাধে মাছ শিকার করছেন। শ্রীনগর উপজেলার বিভিন্ন খালে শতাধিকেরও বেশি স্থানে জাল ও প্রতিটি খালের আশেপাশে অবৈধ কারেন্ট জাল ব্যবহার করে প্রকাশ্যে মাছ শিকার করছেন তারা। সাধারণত এই ধরনের জালে দেশীয় প্রজাতীর মাছ শিকার হয়ে থাকে। সরকার এক দিকে বিশাল আয়োজনে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উদযাপন করছেন আর অন্যদিকে স্থানীয় প্রভাবশালীরা খালের উপরে ভেসাল (বেগ) ও কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার করে অবাধে মাছ শিকার করছেন। এতে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ও উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সেই সঙ্গে ঐসব খালের পানির স্রোতে ও পানি নিস্কাশনে বাধাগ্রস্তসহ খালের আশে-পাশে কৃষিজমি জলাবদ্ধতা হয়ে থাকছে এবং ডিমওয়ালা ও ছোট পোনা মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী অকালে মারা যাওয়ায় জীববৈচিত্য হুমকির মুখে পড়ছে।
সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের খাল বিল পরিদর্শন করে দেখা যায়, উপজেলার এমন কোন খাল, বিল নেই, যেখানে ভেসাল জাল নেই এবং এমন কোন খাল নেই তার আশেপাশে কারেন্ট জালের ব্যবহার নেই। শুধু উপজেলার সিদ্ধেশ্বরী বাজারের উত্তর পাশে রাস্তার পাশের খালের মধ্যে রয়েছে ৫টি ভেসাল। এছাড়া কামারখাড়া এলাকায় একাধিক ভেসাল লক্ষ করা যায়।
প্রান্তিক জেলেদের ভেসাল কিনার মতো টাকা না থাকায় অনেক প্রভাবশালী টাকা বিনিয়োগ করে প্রান্তিক জেলেদের দিন মজুর হিসাবে অথবা কমিশনে মাছ শিকার করাচ্ছেন । এ সমস্ত জালে কখনো মাছের পোনা কখনো ডিমওয়ালা মাছ নির্বিচারে শিকার করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, ভেসাল জাল অনেক আগে থেকেই মাছ ধরা চলছে। দুই যুগেরও অধিক সময় আগ থেকে যুক্ত হয়েছে কারেন্ট জাল। আর বর্তমানে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে চায়না চাই। এ সমস্ত জাল ও চাই দিয়ে সহজে বেশি মাছ পাওয়া যাওয়ায় জেলেরা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এগুলো দিয়ে মাছ ধরতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছেন জেলেরা। এসমস্ত জাল বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রশ্নের জবাবে তারা আরও জানান, কেউ প্রকাশ্যে আবার কেউ গোপনে জাল বিক্রি করছে। শুধু বড় বাজারগুলোতে নয়, উপজেলার অনেক হাট-বাজারেই কারেন্ট জাল পাওয়া যায়।