
মুন্সিগঞ্জে আলুচাষিরা ক্ষতিগ্রস্থ
তিন মাসেও মেলেনি প্রনোদনা
এ.জেড.এ মুকুল
দেশের যে কয়টি জেলায় অধিক আলু চাষ হয় তার মধ্যে অন্যতম মুন্সিগঞ্জ। মুন্সীগঞ্জের মানুষের কাছে আলুচাষ হচ্ছে একটি পেশা বা পারিবারিক ঐতিহ্য। কিছু কিছু কৃষকের কাছে এটা পেশা। আর কিছু কৃষকের কাছে তা পারিবারিক ঐতিহ্য। যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এলাকার মানুষ সামাজিকতা বা পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে বর্তমানে আলু চাষ করছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এ জেলাকে অনেকেই ‘আলুর স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে অভিহিত করেন। এখান থেকে ফরিদপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ভোলা, বরিশাল, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা খুচরা বাজারে বিক্রির জন্য আলু কিনে নিয়ে যান। গত কয়েক বছর যাবত আলুচাষে তেমন লাভ হচ্ছে না বরং লোকসান গুণতে হচ্ছে কৃষকদেরকে।
মুন্সিগঞ্জের আলুচাষিরা ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে দাম কম থাকায় চরম লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ১৮ টাকা পড়লেও বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২-১৩ টাকায় ৷ হিমাগারে ধারণক্ষমতার অভাবসিন্ডিকেট এবং স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণের সমস্যার কারণে বাম্পার ফলন হলেও কৃষকরা ২য় বছরেও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে আলুর উচ্চ ফলন হয়েছে। তবুও চিন্তার ভাঁজ কৃষকের কপালে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তবে সে তুলনায় বাজারে দাম কম। হিমাগারেও ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। বাজার দাম না বাড়লে লোকসানের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সিরাজদিখান উপজেলার মালখানগর এলাকার আলুচাষী খালেক মিয়া জানান, ব্যবসায়ীরা ৫০ কেজির এক বস্তা আলুর দাম দিচ্ছে ৮০০ টাকা। ১০০ বস্তা আলুর দাম বলছে ৯২ হাজার টাকা। অথচ ১০০ বস্তা আলু উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। প্রতি কেজি আলুতে পাঁচ থেকে সাত টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। এ বছর ডায়ামন্ড জাতের বীজ আলুর বাক্স (৫০ কেজি) ব্যবসায়ীরা ৬ হাজার টাকা, ক্ষেত্র বিশেষ ৩৩ হাজার টাকায় কিনতে বাধ্য করেছেন। বীজ আলু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
এছাড়া জেলায় নভেম্বরের শুরুতেই সদর, সিরাজদিখান, লৌহজং, টংগিবাড়ী, গজারিয়া ও শ্রীনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আলু আবাদ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলু আবাদ হয়েছে জেলা সদরে। গেল দুই বছর আলুর বাজারমূল্য ভালো থাকায় চলতি মৌসুমি আলু আবাদে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকের,
গতবারের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার জেলায় আলুর লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমিয়েছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়,
গত বছর ৩৫ হাজার ৭৯৬ হেক্টরের বিপরীতে এবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৬৫৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্য রাখা হয়েছে ১০ লাখ ৯৭ হাজার টন। আলুর দামে ধস নামার পর গত বছর লোকসান গোনেন অনেক চাষি। অনেকেই পড়েন ঋণের চাপে, কেউ কেউ জমি বন্ধক রেখে চাষের খরচ জোগান। তখন শঙ্কা তৈরি হয়, এবার হয়তো কমে যাবে আলুর আবাদ। সেই পটভূমিতে কৃষি মন্ত্রণালয় গত নভেম্বরে ক্ষতিগ্রস্ত চাষির জন্য প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেয়। সেই সময়ের কৃষি উপদেষ্টাও একাধিকবার গণমাধ্যমে এ প্রণোদনার কথা জানান। তবে এক মৌসুম শেষ হয়ে আরেক মৌসুম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কৃষকের হাতে প্রণোদনা পৌঁছেনি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে পাঠালেও ভর্তুকি যায়নি। ফলে লোকসানের ক্ষত না শুকাতেই আবার নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন আলুচাষিরা। এদিকে দাম পড়ে যাওয়ার সংকট মোকাবিলায় গত বছরের আগস্টে সরকার ৫০ হাজার টন আলু সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার ঘোষণা দেয়। লক্ষ্য ছিল, বাজারে দাম স্থিতিশীল রেখে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। তবে সেই সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন হয়নি। পরে আলু কেনার সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে সরকার। তবে কৃষি বিভাগের উত্তম কৃষি চর্চা নীতি অনুসরন করল, মুন্সীগঞ্জের আলু বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। বর্তমানে দেশের চাহিদা মেটাতে আলুর প্রয়োজন হয় ৭০ থেকে ৮০ মেট্রিক টন, সেখানে দেশে উৎপাদন হয় এক কোটি মেট্রিক টনের উপরে। দেশের এই বাড়তি আলু আরও ব্যাপকহারে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে পারলে আগামী দিনে পোশাকের মতো আলুও হতে পারে দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য।