
ভয়াবহ প্লাস্টিক দূষণে প্রকৃতিক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব
বর্ষন মোহাম্মদ:
পরিবেশ দূষণ বর্তমান একটি ভয়াবহ সমস্যা। নিয়মিত প্লাস্টিক পদার্থের ব্যবহার এবং প্লাস্টিক দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীলতা প্লাস্টিক দূষণের মাত্রাকে বহুগুণে ত্বরান্বিত করছে।
দৈনন্দিন জীবনে আমরা ব্যাপকহারে পলিথিনের ব্যবহার করছি। স্বল্প খরচ ও ব্যবহারের সুবিধা পলিথিনের জনপ্রিয়তা করেছে আকাশচুম্বী; সেই সঙ্গে কিছুটা হলেও আমাদের জীবনকে করেছে সহজ। কিন্তু এই পলিথিনের ক্ষতির দিকটি বিবেচনা না করেই আমরা প্রতিনিয়ত নানান কাজে তার ব্যবহার করছি যথেচ্ছা এবং ব্যবহারের পর নিয়ম না মেনেই ফেলছি যত্রতত্র। যার দরুণ ভয়ংকর সব ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে আমাদের চারপাশের পরিবেশ। পরিবেশ দূষণে মানবসৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে পলিথিনের ভূমিকা এখন ভয়াবহ পর্যায়ে অবস্থান করছে। নীরব ঘাতক এই পলিথিন শুধু মাটি নয়, আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। বিপন্ন করে তুলেছে জীববৈচিত্র্যকে। ইতোমধ্যে অকেজো করে দিয়েছে বড় বড় শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাকেও। নদী-নালা, খাল-বিল, নর্দমা, পুকুর, খেলার মাঠ, বসতবাড়ির আনাচ-কানাচ থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গা আজ ব্যবহৃত পলিথিনের দখলে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাজারগুলোতে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে প্লাস্টিকের বস্তা ও পলিথিন।
মুন্সিগঞ্জের হাট-বাজারসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন। পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও আইনের প্রয়োগ না থাকায় ব্যবহার বাড়ছে দিনদিন। ব্যবসায়ীরা চোরাইপথে আমদানি করেন এসব নিষিদ্ধ পলিথিন। স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে চোরাইপথে আমদানি। অন্যদিকে যত্রতত্র পলিথিন ব্যবহারে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ। এতে নজরদারি নেই প্রশাসনের। তবে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বলছে, নিষিদ্ধ পলিথিনের বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে তাদের। পলিথিনের ব্যবহার দেখলেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বর্তমানে মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই প্লাস্টিক। এখন কাঠ, লোহা, সিরামিক, কাঁচ ইত্যাদি পণ্যের পরিবর্তে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার হচ্ছে।
এদিকে সামাজিক অনুষ্ঠান, বনভোজন এবং দোকানে খাবার ও পানীয় পরিবেশন করতে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে থার্মোকলের ‘ওয়ান টাইম’ বাসনকোসন। বিভিন্ন মার্কেটের ক্রোকারিজ দোকানে মিলছে এসব গ্লাস, প্লেট, চামচ ও বক্স। রসায়নবিদরা বলছেন, থার্মোকলে থাকে থার্মোপ্লাস্টিক যৌগ পলিস্টাইরিন। স্টাইরিন ও ফেনিলিথিন পলিমারাইজেশনে পলিস্টাইরিন যৌগ তৈরি হয়। এটি বিষ। পাশাপাশি ‘ওয়ান টাইম’ পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ‘বিসফেনল এ’ ও নানা রাসায়নিক। আর এসব রাসায়নিক খাবারের সঙ্গে প্রবেশ করে শরীরের ভারসাম্য নষ্টের পাশাপাশি কারণ হতে পারে ক্যান্সারেরও। পরিবেশবিজ্ঞানীরাও বলছেন, থার্মোকলের ব্যবহার বন্ধ হওয়া দরকার। এটি মাটির সঙ্গে মেশে না। গাছের পানি শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। থার্মোকল পোড়ালে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া পরিবেশ দূষণ করে। মাটি, পানি এমনকি বাতাসেও ছড়িয়ে পড়ছে প্লাস্টিককণা। সব জায়গায় ক্ষতিকর প্লাস্টিকের উপস্থিতির ব্যাপারে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা হরদম মানুষকে সতর্ক করে যাচ্ছেন; কিন্তু এ প্লাস্টিকের ক্ষতির মাত্রা যে কত দূর যেতে পারে, সেটা তাঁরা এখনো নির্ণয় করে উঠতে পারেননি। এছাড়াও মৎস্য ও ফসল উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপদ পানিপ্রাপ্তিতে বিঘ্ন সৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা তৈরি করছে, সর্বোপরি পৃথিবীর জলবায়ুকেই পরিবর্তন করে ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাকৃতিক কারণের সঙ্গে মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলোই এখন মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে। আর প্লাস্টিক বর্জ্য এর মাত্রাকে শুধু বাড়িয়েই চলেছে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তাকে বলেন বলেন, পলিথিনের যুতসই বিকল্প যতদিন আবিষ্কৃত না হবে, ততদিন হয়তো আমাদের পলিথিন-প্লাস্টিক নির্ভরতায় থাকতে হবে। কিন্তু তাই বলে তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। পলিথিন বর্জ্য যেন অন্তত ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ না হয়, সেজন্য সতর্কতা অবলম্বন করতেই হবে। যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা থেকে আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। অন্যথায় খুব শিগগিরই এদেশ মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।
একটি সূত্র বলছে, একটি পরিবার প্রতিদিন চারটি করে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করছে। সেই হিসাবে শুধু শুধু তাই নয়, বল্গাহীনভাবে শপিং ব্যাগের পাশাপাশি নানা ধরনের আসবাবপত্র, গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহার যোগ হয়েছে। খাবারের মোড়ক হিসেবে প্লাস্টিকের এখন একচ্ছত্র আধিপত্য।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি নিত্যপণ্যের বাজারে পণ্য বিক্রিতে প্রায় শতভাগ ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর পলিথিন। চাল, ডাল, তেল, সবজি বিক্রিতে ব্যবহার হচ্ছে পলিব্যাগের। এমনকি পলিথিন ব্যাগে করে খাবার আনা-নেওয়া, হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে গরম খাবার বহন করা, ফ্রিজে পণ্য রাখতেও ব্যাপকভাবে পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ফলে পলিথিনের ব্যবহার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বহুদিন আগেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পলিথিন বা প্লাস্টিকের ব্যবহারের ফলের হরমন বাধাগ্রস্ত হয়। এল ফলে দেখা দিতে পারে বন্ধ্যাত্ব, নষ্ট হতে পারে গর্ভবতী মায়ের ভ্রণ, বিকল হতে পারে লিভার ও কিডনি।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. জনয়নাল আবেদিন সরকার গণমাধ্যমকে জানান, পলিথিনের ব্যবহার ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ। পলিথিন বা প্লাস্টিকের ব্যবহার করা মানে বিপদ ডেকে আনা। প্লাস্টিক শরীরে ক্যান্সার তৈরি করার প্রথম ১০টি কারণের মধ্যে একটি। মনে রাখতে হবে, সব প্লাস্টিকই ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করে।