
বাংলাদেশের কিশোর সাহিত্য জগতে রকিব হাসান এক অবিস্মরণীয় নাম। তার সৃষ্ট ‘তিন গোয়েন্দা’র চরিত্র কিশোর পাশা, মুসা আমান ও রবিন মিলফোর্ড এ দেশের অসংখ্য পাঠকের কৈশোরকে রোমাঞ্চ, কৌতূহল ও সাহসিকতার মন্ত্রে রাঙিয়ে তুলেছে। প্রচারবিমুখ এই লেখক আমৃত্যু তার সৃষ্টির মাঝেই বেঁচে থাকার পথ বেছে নিয়েছিলেন। গতকাল তার জীবনাবসান ঘটলো, অবশেষে নক্ষত্রের মৃত্যু হলো।
লেখক জীবনের উত্থান
রকিব হাসান ১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর কুমিল্লার এক সাহিত্যপ্রেমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ও কৈশোর কাটে ফেনীতে বাবার চাকরির সুবাদে। ছোটবেলা থেকেই ছিল তার বই পড়ার প্রবল নেশা। স্কুলের সমৃদ্ধ পাঠাগার ও পুরোনো বইয়ের দোকানে তিনি মগ্ন থাকতেন শরৎচন্দ্র, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, স্বপনকুমার এর মতো বাংলা লেখকদের পাশাপাশি জিম করবেট, কেনেথ অ্যান্ডারসন, আর্থার কোনান ডয়েল, এডগার রাইস বারোজের মতো পশ্চিমা লেখকদের অনুবাদ ও মূল রচনায়। এই বিচিত্র পাঠাভ্যাসই তাকে ভবিষ্যতের লেখক হিসেবে তৈরি করেছিল। পড়াশোনা শেষ করে প্রথাগত কিছু চাকরি করলেও বাঁধাধরা অফিস-শৃঙ্খলে মন টেকেনি তার। তাই ১৯৭০ এর দশকের শেষভাগে লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং সেবা প্রকাশনীতে যুক্ত হন। এখানেই তার লেখক জীবনের সূচনা।
সাহিত্যকর্ম
রকিব হাসানের সাহিত্যিক জীবন ছিল বহুমুখী। তার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে, ছদ্মনামে। তবে স্বনামে প্রথম প্রকাশিত বই ছিল অনুবাদগ্রন্থ- ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’। তার সামগ্রিক সাহিত্যিক কর্মকে কয়েকটি ধারায় ভাগ করা যায়-
*তিন গোয়েন্দা সিরিজ- এটিই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। ১৯৮৫ সালে রবার্ট আর্থার এর ‘থ্রি ইনভেস্টিগেটরস’ সিরিজ অবলম্বনে কাজী আনোয়ার হোসেনের উদ্যোগে সেবা প্রকাশনী থেকে ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজের যাত্রা শুরু হয়। এই সিরিজের মূল লেখক হিসেবে রকিব হাসানই দীর্ঘ সময় ধরে (২০০৩ সাল পর্যন্ত) লিখে গেছেন, যার সংখ্যা ছিল দেড় শতাধিক। কিশোর, মুসা ও রবিনের দুঃসাহসিক অভিযান, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং বন্ধুত্বের বাঁধন এই সিরিজকে বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঠযোগ্য সিরিজে পরিণত করে।
*অনুবাদ সাহিত্য- তিনি বিশ্বসেরা ক্লাসিক বই অনুবাদে বিশেষ অবদান রেখেছেন। ‘টারজান’ সিরিজ ও মহাক্লাসিক ‘আরব্য রজনী’র চমৎকার অনুবাদ করেছেন। এছাড়া জুল ভার্ন, এরিক ফন দানিকেন, ফার্লে মোয়াট, জেরাল্ড ডুরেল এর মতো বিখ্যাত লেখকদের বইও অনুবাদ করেন। তিনি ‘শামসুদ্দীন নওয়াব’ ছদ্মনামেও কিছু অনুবাদের কাজ করেছেন।
*অন্যান্য জনপ্রিয় সিরিজ ও রচনা- তিন গোয়েন্দা ছাড়াও তিনি ‘গোয়েন্দা রাজু’, ‘রেজা-সুজা’ সিরিজ, ‘তিন বন্ধু’ সিরিজসহ চার শতাধিক জনপ্রিয় বই লিখেছেন।
*ছদ্মনামের ব্যবহার- মূল নামে লেখার পাশাপাশি তিনি ‘জাফর চৌধুরী’ ছদ্মনামে সেবা প্রকাশনীর রোমহর্ষক সিরিজ এবং ‘আবু সাঈদ’ ছদ্মনামে ‘গোয়েন্দা রাজু’ সিরিজ লিখেছেন।
স্বীকৃতি ও অর্জন
রকিব হাসান ছিলেন একজন নিভৃতচারী লেখক, যিনি পাঠকের ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রতি খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো-
১। পাঠকপ্রিয়তা
তিনি কয়েক প্রজন্মের পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়েছেন। তার লেখা ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজটি প্রথম আলো পত্রিকার জরিপে বাংলাদেশের কিশোরদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঠযোগ্য সিরিজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এটি একজন লেখকের কাছে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
২। কৈশোরের সঙ্গী
তিনি এমন এক জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে বই মানেই ছিল রহস্যের গন্ধ, অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি। তার হাত ধরে অগণিত কিশোর-কিশোরী বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছে এবং বাংলা সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।
মৃত্যু
জীবনের শেষভাগে এসে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর, বুধবার, ৭৫ বছর বয়সে ডায়ালাইসিস চলাকালীন সময়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি পরলোকগমন করেন।
রকিব হাসান হয়তো আর এই পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তার সৃষ্ট কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ড বেঁচে থাকবে কোটি পাঠকের মনে। তার লেখা প্রতিটি লাইন, প্রতিটি অ্যাডভেঞ্চার এ দেশের কৈশোরের স্মৃতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলো ছড়াবে।
তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
লেখক- ত্বাইরান আবির
লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক