
ক্রমেই বেড়ে চলেছে পরিবেশ দূষণের মাত্রা
বর্ষন মোহাম্মদ:
পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজন শান্তিময় সুস্থ্য পরিবেশ। বেঁচে থাকার জন্য যে পরিবেশের প্রয়োজন, সে পরিবেশ আজ নানা কারণে জটিল আঁকার ধারণ করেছে। মানুষ তার আবিষ্কারের প্রতিভা, পরিশ্রম আর দক্ষতা দিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা পদ্ধতি সংগ্রহ করেছে, বিজ্ঞান ক্রমবিকাশের ধারায় চরম উন্নতি লাভ করেছে। আর মানুষ সেই গৌরবে অন্ধ হয়ে পৃথিবীর সুন্দর পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে।
অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জে পরিবেশ দূষণ ক্রমেই বাড়ছে । প্রতিনিয়ত নানাভাবে দুষণ হচ্ছে পরিবেশ। বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, মারাত্মক শব্দ দূষণ, পুকুর জলাশয় দিঘী ভরাটে হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে জেলার পরিবেশ। প্রতিদিন ময়লা আবর্জনা দুষিত করছে পরিবেশ। জেলা শহরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও রাস্তার মোড়ে জমে থাকা ময়লার স্তুপ দূষিত করে তোলছে নগরীর পরিবেশ।
একসঙ্গে বায়ু, পানি ও মাটি দূষণ হচ্ছে। বিষাক্ত কেমিকেলযুক্ত ময়লা পানি ছড়িয়ে পড়ছে খাল বিল ও নদীতে। মরে যাচ্ছে জলজ প্রাণী। মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে মাটি। এছাড়া এই বর্জ্য থেকে বায়ু দূষণের মাধ্যমে আক্রান্ত হচ্ছে পশুপাখি এমনকি নানা রোগব্যাধি ছড়াচ্ছে মানুষের দেহেও। ’
এছাড়াও পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের পরই তাকে প্রকৃতি লালন করে আসছে। মাতৃদুগ্ধের প্রয়োজন ফুরাতেই তাকে প্রকৃতির উপর নির্ভর করতে হয়। আদিম মানুষ এক সময় গুহাবাসী ছিল, জীবন ছিল যাযাবরের। ধীরে ধীরে আগুন এবং তারও পরে কৃষির আবিস্কার তাকে যাযাবর জীবন থেকে অব্যাহতি দেয়। কৃষির আবিস্কারের ফলে মানুষের গৃহপালিত জন্তু ও স্থায়ী বসবাসের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
মানুষের প্রয়োজন ও অভাব ভাবনাই মানুষকে অনুসন্ধিৎসু করে আবিস্কারের পথে নামতে সহায়তা করে। এই আবিষ্কারই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনে জীবনযাপনে এবং আধুনিক করে তোলে কৃষিখাত। অধিক ফসল উৎপাদনে মনোযোগী হয়।
ব্যাটারি চালিত ইঞ্জিনের আবিস্কার মানব সমাজে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। শুরু হয় শিল্প বিপ্লব। কুটির শিল্পের জায়গায় এলো বৃহৎ ও ভারি শিল্প। পানি, স্থল ও আকাশপথে পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলে। মানব সমাজ প্রবেশ করে আধুনিক যুগে। চাহিদা ও সুযোগের জন্য চলল নিত্যনতুন প্রচেষ্টা- মানুষের আহরণ ও সঞ্চয় ইচ্ছা প্রভাব বিস্তর করে পানি, বায়ু, ভুমি ও প্রাণীকূলের উপর। মানব মনের এই অসীম অভিলাষ তাকে করে অসংযমী ও অহংকারী।
সাম্প্রতিককালে মানবসৃষ্ট দূষণের মাত্রা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন কারণের মধ্যে অন্যতম কারণগুলি হচ্ছে- বৃক্ষনিধন ও মরুকরণ, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার, যুদ্ধ ও সংঘর্ষ, কীটনাশক ব্যবহার, বায়ু দূষণ, মাটি দূষণ, পানি দূষণ, শব্দ দূষণ, নিষিদ্ধ পলিথিন জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার, গ্রিন হাউস এফেক্ট ও অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য। বাংলাদেশেও পরিবেশ দূষণে উল্লেখিত কারণগুলি বিদ্যমান। তবে বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণগুলি হচ্ছে- বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, ভুমি দূষণ ও শব্দ দূষণ, যা আমাদের জনস্বাস্থের জন্য মারাত্মক হুমকীস্বরূপ।
বায়ু দুষনঃ মানবজীবনে সুস্থ্য পরিবেশ সৃষ্টির অন্যতম উপাদান হচ্ছে বায়ু। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর জীবনধারণের জন্য নির্মল বায়ু অপরিহার্য, কিন্তু বিভিন্ন ভাবে সে বায়ু দূষিত হচ্ছে। ইট, কাঠ, কয়লা, ময়লা-আবর্জনা পোড়ানোর ফলে যেমন ধোঁয়া সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি কল-কারখানায় ব্যবহৃত পেট্রোল, ডিজেল থেকে ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। বায়ু দূষণের প্রধান পাঁচটি প্রাথমিক উপাদান যার ৭০ শতাংশ বায়ুমন্ডলকে দূষিত করে। সেগুলোর অন্যতম কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, সালফার অক্সাইড। যদিও প্রকৃতিতে একশ ভাগ অদূষিত বায়ুর উপস্থিতি অসম্ভব তথাপি বায়ু দূষণের ৯৫ শতাংশ কারণ মনুষ্যসৃষ্ট উদ্যোগ, যানবাহন, যথেচ্ছ বন ধ্বংস। ধলেশ্বরী নদী তীরবর্তী এলাকা ঘিরে গড়ে উঠেছে সিমেন্ট উৎপাদনকারী একাধিক কারখানা। এ সব কারখানা পরিবেশ দূষণ করছে। ফলে হুমকির মুখে রয়েছে মুন্সীগঞ্জের জনজীবন।
সিরাজদিখান উপজেলার বালুচরসহ বেশ কিছু এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক ইট ভাটা। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এসব ভাটার অধিকাংশই ফসলি জমি ও ঘনবসতিপূর্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে। এতে করে ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও বর্জ্যে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। ভাটার আশপাশের এলাকা, নদী, স্থানীয় গ্রাম ও গ্রামীণ জনপদের জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে। ইটভাটা সৃষ্ট দূষণে বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি গ্রস্থ্য হয়। গুলোর ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ বায়ুকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। যানবাহন থেকে বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস, যেমন- কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রোজেন-অক্সাইড, পার্টিকেল ম্যাটার ও লেড নির্গত হয়, যা বায়ুকে দূষিত করছে। ফলে এ্যাজমা, যক্ষ্মা, ফুসফুসে সমস্যা ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন বায়ুবাহি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে জনসাধারণ। এছাড়া বায়ু দূষণের কারণে স্বল্পমেয়াদে চোখ ও নাকে ব্যাথা হয়, ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক রোগও হতে পারে।
পানি দূষণঃ পানি পরিবেশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা জীবজগৎ ও উদ্ভিদ জগতের জীবনধারনের জন্য অত্যাবশ্যক। বিশুদ্ধ পানি যেমন জীবনধারণের অবলম্বন, তেমনি দূষিত পানি জীবননাশেরও অন্যতম কারণ। কিন্তু সে পানি দূষিত হচ্ছে বিভিন্নভাবে।
মুক্তারপুর সেতুর উত্তর-পশ্চিমপাশে গড়ে উঠা এশিয়ান টেক্সটাইল মিলের ডাইনিংয়ের বিষাক্ত কেমিক্যালের পাশাপাশি কাপড়ের জুটসহ অন্যান্য আর্বজনা ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরী নদীর বুঁকে। এতে করে নদী দূষণের সাথে ধীরে ধীরে দখল হচ্ছে ধলেশ্বরী।
ময়লা ফেলে ভরাটকৃত জায়গায় বসানো হয়েছে ভাঙাড়ির দোকানপাট। আর এসব আবর্জনা নদীতে পড়ে বিষাক্ত করে ফেলেছে নদীর পানি। পানির রং হয়েছে আলকাতরার মতো কালো। নদীর পাড়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করলে তাদের কেউ কেউ বলেন, বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা না থাকায় সবাই নদীতে ফেলে। আবার কেউ কেউ বলেন, প্রথমে ময়লা ফেলে ভরাট করা হয়। এরপর সেখানে বিভিন্ন দোকান বসিয়ে ভাড়া তোলেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। একসময় বড় বড় ভবন তোলা হয়। নিয়ম রীতের তোয়াক্কা না করে অবাদে গড়ে ওঠা রাইস মিলের মালিকরা দুই পদ্ধতিতে রাইস মিলের বর্জ্য ও ছাই সরাসরি নদীতে ফেলছেন।
এছাড়াও গোছলসহ গৃহস্থালির সকল কাজেই তারা ধলেশ্বরী নদীর পানি ব্যবহার করেন। বর্ষায় নদীর পানিতে তেমন দুর্গন্ধ মিলে না । তবে বর্ষার পর নদীতে গোসল করা যায় না, শরীরে চুলকায়। ধলেশ্বরী নদী দূষণের ফলে শিশুরা নানা ধরণের চুলকানি জাতীয় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
জলাশয়ের পানিতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা, জীবজন্তুর মৃতদেহ ও জবাইকৃত পশুর বর্জ্য ফেলানোর কারণে পানি দূষিত ফলে এসব বর্জ্য জলাশয় ও নদীতে পড়ছে আর এতে পানি দূষিত হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত বায়ু গ্রহনের ফলে যেমন মানুষ এ্যাজমা, যক্ষ্মা, ফুসফুসে ও হৃদরোগসহ বায়ুবাহি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তেমনি দূষিত পানি পান বা ব্যবহারের ফলে কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, আমাশয়, জন্ডিস ও বিভিন্ন চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে জনসাধারণ।
ভুমি দূষণঃ মাটির গুরুত্ব বায়ু, পানি, আদির ন্যায় অনস্বীকার্য। অথচ মানুষ স্ব-ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় এ মাটি বা ভুমমিকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে এর ক্ষতি করছে। দূষিত করছে এর স্বাভাবিকতা। খাদ্য শস্যের বাড়তি চাহিদা ও আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে কৃষিকার্য, খনিজ উত্তোলন, শিল্প উদ্যোগ জনবসতি স্থাপন ইত্যাদি বিভিন্নভাবে মাটিকে পরিবর্তিত করে তুলছে। কৃষিকাজে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা গৃহস্থালি বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলা, হাসপাতালের বর্জ্য সরাসরি মাটিতে ফেলা, কল-কারখানার বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মাটিতে নিষ্কাশন, অপচনশীল দ্রব্য পলিথিন মাটিতে ফেলার কারণে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে আর মাটি দূষিত হচ্ছে। দূষিত মাটিতে উৎপাদন কম হয়, ফলে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়না। এতে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়, খাদ্য ঘাটতি থেকে বিভিন্ন রোগ তৈরী হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। এছাড়া দূষিত মাটিতে উৎপাদিত ফসল ও শাক-সবজি খেলে মানুষের স্বাস্থের ক্ষতি হয়।
শব্দ দূষণঃ শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবল। শব্দ দূষণ স্বাস্থক্ষেত্রে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। শব্দ দূষণ ঘটছে মূলত যানবাহনে ব্যবহৃত হাইড্রোলিক ভেঁপু, শিল্পাঞ্চলে কল-কারখানার বিকট শব্দ, মাইকের উচ্চ আওয়াজ, বাদ্যযন্ত্র বা ক্যাসেট প্লেয়ার দ্ধারা। পরিবেশ অধিদফতরের গত বছরের জরিপে দেখা যায় দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে। যা স্বাভাবিক মাত্রার চাইতে আড়াই থেকে তিনগুন বেশি। সর্বত্র ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক, অটো মিশুকে ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চ মাত্রার হাইড্রেলিক হর্ন। তাছাড়া অতিরিক্ত ইজিবাইক এবং উচ্চ মাত্রার হাইড্রেলিক হর্ন শব্দ দূষন করেই যাচ্ছে ।
বাহ্যিকভাবে শব্দ দূষণ তেমন কোন ক্ষতিকারক মনে না হলেও এটি মানুষের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। উচ্চ শব্দ বা অতিরিক্ত শব্দ জনসাধারণের মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার অন্যতম কারণ। উচ্চ শব্দ বা অতিরিক্ত শব্দ উচ্চরক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, মাথাব্যথা, বদহজম ও পেপটিক আলসার এবং অনিদ্রা ঘটায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে । যে হারে আমাদের দ্বারা প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তাতে করে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের এই সুন্দর বাংলাদেশ আমাদের জন্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। পরিবেশ দূষণ সমস্যা নিয়ে আজ প্রায় সব দেশই চিন্তিত। সভ্যতার অস্তিত্বই আজ এক সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে যে কোনো মূল্যে পরিবেশ দূষণ রোধ করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে , বিশ্বে ২৫% মৃত্যুর জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট পরিবেশ দূষণ। কল-কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া, ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত পানি ও নাজুক পরিবেশের কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। দূষিত পরিবেশ ও জলবায়ু জনজীবনকে ঠেলে দিচ্ছে মহামারির দিকে। যার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।এর মধ্যে সবচেয়ে ওপরে আছে। এরপর পানিদূষণ ও সুপেয় পানির অভাবে ডায়রিয়া ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। একটা স্বাস্থ্যকর পৃথিবী গড়ে তুলতে পারলে এটা যে শুধু বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে তা নয়, এটা দরিদ্রতম দেশগুলোর জীবনমানেরও উন্নয়ন করবে, কারণ তারা পরিষ্কার বাতাস ও পানির ওপর নির্ভরশীল।’