
আশরাফ ইকবাল :
আধুনিক সভ্যতার যাতাকলে সিরাজদিখানের বেদে সম্প্রদায় এখন অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছে। কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে শাপের খেলা, ভেলকি বাজি, শিঙ্গা লাগালো প্রভৃতি। এই বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে উলেখযোগ্য হচ্ছে সওদাগর, সান্দার ও সাপুরিয়া।
এখানে গাঁয়ের পথে ঝুড়ি মাথায় কিংবা কাঁধে লম্বা ব্যাগ ঝোলানো বেদে পরিবারের সদস্যদের আগের মতো চুড়ি ও ফিতা বিক্রি করতে দেখা যায় না। সভ্যতার উন্নতিতে ব্যস্ত এ সময়ে মানুষ আর আগের মতো জড়ো হয়ে সাপের খেলা, শিঙ্গা লাগানো, ভেলকিবাজী দেখার ফুরসৎ নেই। তাছাড়া ডিশ অ্যান্টেনা আর ইন্টানেটের এই যুগে মিডিয়াগুলো অহরহ সাপ নিয়ে মেগা সিরিয়াল তৈরি করায় সাপের খেলা দেখার আগ্রহও মানুষ ক্রমান্বয়ে হারিয়ে ফেলেছে। তাছাড়া আধুনিকতার ফলে সিরাজদিখানের নদী, খাল ও ডোবা দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। এতে পাখিদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক পাখি। এর ফলে বেদেদের আদি পেশা পাখি শিকারও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিপাকে পড়েছে সিরাজদিখান উপজেলার বেদে পরিবারগুলো।
এ উপজেলার ৬টি বেদে পল্লীতে প্রায় ৫০০ পরিবারে ভিন্ন ধারার পরিবেশ বিরাজ করছে। কিছু পল্লী আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে এগিয়ে চললেও অন্যগুলি এখনও পশ্চাদমুখীই রয়ে গেছে।
উপজেলার সদর থেকে ৮ কিলোমিটার পূর্বে মালখানগর ইউনিয়নের তালতালা বাজারের পেছনে ইছামতি নদীতে ভাসমানভাবে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে শতাধিক বেদে পরিবার। বংশ পরম্পরায় এ নদীতে বসবাস করে আসছে ওই বেদে পরিবারগুলো। ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকান রাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে বেদেরা প্রথম মুন্সিগঞ্জ জেলার এই সিরাজদিখান উপজেলায় আসে। তখন এ নদীর পুরো যৌবন ছিল। নদীটিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এই নদীকে ঘিরে চারপাশে সুবিশাল গাছ ছিল। এই গাছ ও নদীতে প্রচুর পাখি পাওয়া যেত, যা শিকার করে বেদেরা একদিকে অর্থ উপার্জন করত, অন্যদিকে নিজেদের চাহিদা পূরণ করত। কিন্তু কালের আবর্তে এ নদীটি এখন চর পড়ে নিশ্চিহ্ন প্রায়।
শেখেরনগর ইউনিয়নের ঘনশামপুর গ্রামের ইছামতি নদীতে কয়েকটি পরিবার বসবাস করছে। আর নদীর পাশে গ্রামের ভূখণ্ডে ঘর তুলে বসবাস করছে আরও ২৫টি পরিবার। ভূখণ্ডে বসবাসকারী ২৫টি পরিবার এখন আর তাদের আদি পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদসহ তাদেও ছেলেমেয়েদের বিদেশ পাঠিয়ে ভালো উপার্জন করছেন। গ্রামের অন্য পরিবারের সদস্যদের মতো ছেলেমেয়েদের উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছেন। তবে ইছামতি নদীতে নৌকায় বসবাসকারী ৪০টি বেদে পরিবার এখনও মাছ ধরে, মেলায় মেলায় মাটির তৈরি খেলনা বিক্রি, ঝোলা হাতে গ্রামগঞ্জে ঘুরে বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি, তাবিজ-শিঙ্গা লাগিয়ে আদি পেশায় অর্থ উপার্জন করে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছে।
তবে আগের মতো মাথায় চুড়ির ঝুড়ি নিয়ে বেদে পরিবারগুলোর সদস্যদের বর্তমানে অহরহ বের হতে না দেখা গেলেও কাঁধের মধ্যে একটি ঝোলা নিয়ে প্রতিদিনই তাদের দেখা যায় উপজেলার ব্যস্ততম বাস, বেবিস্ট্যান্ড কিংবা বড় কোনো বাজার-হাটে। তাদের কাঁধে একটি ঝোলা থাকলেও তারা কিছু বিক্রি না করে পথযাত্রীদের হাতে ধরে কাপড় টেনে ‘এ ভাই ১০টা টাকা দে’ বলে ঘেরাও করছে। মাঝে মধ্যে ২-৩ জন মিলে পথচারীদের টাকার জন্য ঘিরে ধরছে। সিরাজদিখান বাজারে ঝোলা কাঁধে বের হওয়া বেদে পরিবারের সদস্য রিনা বেগম (৪০) বলেন, ‘আমাদের কাছ থেইক্কা মানুষ আগে চুড়ি-ফিতা কিনলেও এখন বাড়ির বউ-ঝিরা হাট-বাজারে গিয়া কিনে।
টেকের হাট এলাকায় বসবাসকারী বেদে পরিবারের সদস্যরা জানান, নারীদের আগের মতো গ্রামেগঞ্জে চুড়ি, ফিতা বিক্রি, শিঙ্গা লাগানো, তাবিজ বিক্রি কিংবা সাপের খেলা দেখানো পেশায় এখনও কোনো উপার্জন নেই বললেই চলে। তবে বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় ছোট ছোট দোকান বসিয়ে খেলনা থেকে শুরু করে মাটির বিভিন্নি সামগ্রী, চুড়ি, ফিতা ও নেলপলিশ বিক্রি করে এখনও কিছুটা উপার্জন হয় তাদের।
তালতলা বেদে পল্লীর সর্দার মিনহাজ উদ্দিন জানান, ভোটার হওয়া সত্ত্বেও সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। তাদের দাবি, দেশের সব নাগরিকের মতো তাদেরও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত।