
মুন্সিগঞ্জে তিনটি আসনেই জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচারণা
ত্বাইরান আবির
পদ্মা, মেঘনার তীরঘেঁষা ঐতিহ্যবাহী জেলা মুন্সিগঞ্জ। ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বরাবরই জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে এই জেলা। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মুন্সিগঞ্জ-১, মুন্সিগঞ্জ-২ ও মুন্সিগঞ্জ-৩ এই তিনটি আসনেই এখন নির্বাচনী হাওয়া বইছে পুরোদমে। আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণার পরপরই মাঠে নেমে পড়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। গ্রাম থেকে শহর, হাট-বাজার থেকে চায়ের দোকান সবখানেই এক আলোচনা- কে আসছেন, কে টিকছেন, আর শেষ হাসি কে হাসবেন?
মুন্সিগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনই রাজনৈতিক দিক থেকে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সম্ভাব্য উপস্থিতি এই জেলাকে করে তুলেছে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু।
ইতোমধ্যে ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার, উঠান বৈঠক, গণসংযোগ ও নীরব লবিং সবমিলিয়ে মাঠ গরম। যদিও আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার পর এসব প্রচার অনেকটাই বন্ধ ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে আগাম শক্ত অবস্থান জানান দিতেই প্রার্থীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
মুন্সিগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) আসনটি বরাবরই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের জন্য পরিচিত। এখানে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি নতুন মুখও আলোচনায় রয়েছেন। উন্নয়ন বনাম জনসম্পৃক্ততা এই দুইয়ের ভারসাম্য নিয়েই ভোটারদের ভাবনা।
স্থানীয় পর্যায়ে জানা গেছে, একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী ইতোমধ্যে সামাজিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আয়োজন ও স্থানীয় সমস্যা নিয়ে সরব ভূমিকা রাখছেন। কেউ উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কথা বলছেন, কেউ আবার দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বৈষম্যের অভিযোগ তুলে পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন।
লৌহজং-টংগীবাড়ী নিয়ে গঠিত মুন্সিগঞ্জ-২ আসনটি এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় মনোনয়ন ঘিরে বিভক্তি এই আসনের রাজনীতিকে করেছিল উত্তপ্ত।
এখানে বিএনপির শিবিরে রয়েছে একাধিক প্রভাবশালী নেতা। কে দলীয় টিকিট পাচ্ছেন, আর কে পাচ্ছেন না- এই অনিশ্চয়তা নিয়ে বহুদিন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে ছিল চাপা ক্ষোভ। তবে মনোয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর উঠান বৈঠক, ওয়ার্ড সভা, জনসভা ও গোপন সমঝোতার রাজনীতি এখানে সবচেয়ে দৃশ্যমান।
ভোটাররাও দ্বিধায়, দল দেখবেন, নাকি ব্যক্তি? উন্নয়ন দেখবেন নাকি আন্দোলনের ভূমিকা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই ব্যস্ত সাধারণ মানুষ।
মুন্সিগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনে এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে তরুণ ভোটাররা। শিল্পাঞ্চল, নদীভাঙন, কর্মসংস্থান ও নগর সুবিধা এই ইস্যুগুলো ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে প্রচারণা।
এখানে অভিজ্ঞ কিছু প্রার্থী মাঠে নেমে নিজেদের আলাদা করে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, আধুনিক ভাষা ও স্মার্ট উন্নয়নের ধারণা তরুণদের আকৃষ্ট করলেও এসব অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের সাংগঠনিক শক্তিও কম নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে ভোটের ফল নির্ভর করবে শেষ মুহূর্তের সমীকরণ ও ভোটার উপস্থিতির ওপর।
তিনটি আসনেই বড় দলের বাইরে ছোট রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তৎপরতা চোখে পড়ছে। যদিও প্রচারে তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে, তবে স্থানীয় প্রভাব, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিবাদী ভোটের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।
বিশেষ করে দলীয় কোন্দল ও মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বড় দল বিএনপির জন্য বাড়তি মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এই আসনে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে কিছু অভিন্ন দাবি- টেকসই উন্নয়ন, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা সমাধান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ইত্যাদি।
অনেক ভোটার বলছেন, শুধু নির্বাচনের সময় নয়, পাঁচ বছর যিনি পাশে থাকবেন, তাকেই চান প্রতিনিধি হিসেবে। তাই এখন বাকি শেষ মুহূর্তের লড়াইয়ের অপেক্ষা।
প্রচারণাকালে মুন্সিগঞ্জ ৩ আসনের কাস্তে মার্কার প্রার্থী শেখ মোঃ কামাল হোসেন দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা কে জানান,নির্বাচন এলেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে মুন্সিগঞ্জের চিরচেনা এক শব্দ—যানজট। প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীদের ইশতেহারে স্থান পায় এই সমস্যা, প্রতিশ্রুতি আসে সমাধানের। কিন্তু ভোট শেষ হলেই যেন সব প্রতিশ্রুতি আটকে পড়ে মুক্তারপুরুপঞ্চবটি সড়কের দীর্ঘ যানজটে।
মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকার দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার। অথচ এই সামান্য পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা। সকাল-সন্ধ্যা তো বটেই, দিনের যে কোনো সময়েই এই সড়কে যানজট যেন অবধারিত। অফিসগামী মানুষ, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী—সবাই কোনো না কোনোভাবে এই দুর্ভোগের শিকার।
এই সড়কটি ঢাকা থেকে সড়ক পথে মুন্সিগঞ্জে প্রবেশের প্রথম ও প্রধান রুট। একসময় মুক্তারপুর থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত এলাকায় তেমন জনবসতি ছিল না। কিন্তু পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে তিন জেলার সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংকীর্ণ রেখেই নির্মাণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠে ঘনবসতি, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
শাসনগাঁয়ে বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের পর এলাকায় গড়ে ওঠে কয়েক শ’ গার্মেন্ট ও নিটিং কারখানা। সৈয়দপুর থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত রয়েছে একাধিক সিমেন্ট কারখানা। পাশাপাশি সড়কের দু’ধারে ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে মানুষের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি কয়েকগুণ বেড়েছে যানবাহনের চাপ। কিন্তু সড়কের সক্ষমতা বাড়েনি।
এই বাস্তবতায় মুন্সিগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায় আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক। পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, শহরে প্রায় ৭ হাজার ৪০০ অটোরিকশা-মিশুক চলাচল করছে। সুপারমার্কেট মোড়, শিল্পকলা একাডেমী, লঞ্চঘাট সংলগ্ন সড়কগুলোতে এসব যানবাহনের এলোমেলো চলাচল যানজটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
নির্বাচনী মাঠে এবার আলোচনায় এসেছে মুক্তারপুরুপঞ্চবটি দ্বিতীয় তলার সড়ক বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। প্রায় ৩ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের কাজ শেষের পথে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি চালু হলে ঢাকাুমুন্সিগঞ্জ যাতায়াতে বড় ধরনের স্বস্তি আসবে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই একটি সড়কই কি যুগের পর যুগের যানজট ভাঙতে পারবে?
মুন্সিগঞ্জু৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শ. ম. কামাল মনে করেন, এই প্রকল্প একা সব সমস্যার সমাধান নয়, তবে এটি একটি বড় সূচনা। তিনি বলেন,
“মুক্তারপুরুপঞ্চবটি দ্বিতীয় তলার সড়ক চালু হলে দূরপাল্লার যানবাহনের একটি বড় অংশ এলিভেটেড রুটে চলে যাবে। এতে মূল সড়কে চাপ কমবে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না আনলে পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত হলে তার অগ্রাধিকার থাকবে তিনটি বিষয়ে—
১) অটোরিকশা ও ইজিবাইকের নিয়ন্ত্রিত চলাচল ও নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড,
২) দিনের বেলায় ভারী যানবাহন চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা,
৩) চাঁদাবাজি ও অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদে জিরো টলারেন্স।
নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও এবার খানিকটা ভিন্ন। তারা আর শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব সমাধান দেখতে চান। মুন্সিগঞ্জ শহরের এক বাসিন্দা বলেন,
“প্রতি নির্বাচনে যানজটের কথা শুনি। কিন্তু ভোটের পর আর কেউ খোঁজ নেয় না। এবার আমরা কাজের প্রতিশ্রুতি চাই।”
বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তারপুরুপঞ্চবটি দ্বিতীয় তলার সড়ক মুন্সিগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। তবে এটি কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
নির্বাচনের প্রাক্কালে তাই প্রশ্ন একটাই—
মুক্তারপুর পঞ্চবটি দ্বিতীয় তলার সড়ক কি শুধু নির্বাচনী স্লোগান হয়েই থাকবে, নাকি সত্যিই যুগের যানজট ভাঙার পথ দেখাবে?
সবমিলিয়ে বলা যায়, মুন্সিগঞ্জের তিনটি আসনেই নির্বাচনী প্রচারণা এখন চূড়ান্ত রূপ নিতে শুরু করেছে। আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হওয়ার এই সময়ে উত্তাপ আরও বাড়বে। পাল্টাপাল্টি সমাবেশ, কঠোর বক্তব্য, কৌশলী জোট ও নীরব সমঝোতা- সবকিছু মিলিয়ে মুন্সিগঞ্জ পরিণত হচ্ছে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে।
শেষ পর্যন্ত কারা জয় পান, কারা হেরে মাঠ ছাড়েন আর কারা ইতিহাস গড়েন- সেই অপেক্ষায় এখন পুরো জেলা।