
নুরানী, মহিউদ্দিন, বিএনপি- কে হাসবে শেষ হাসি?
ত্বাইরান আবির
মুন্সিগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনের নির্বাচনী মাঠে শেষ মুহূর্তে নাটকীয় মোড় নিয়েছে রাজনীতি। আপিলের মাধ্যমে প্রার্থীতা ফিরে পেয়ে ১০ দলীয় জোটের নেতা মুফতি নুর হোসাইন নুরানী নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় ফেরায় এই আসনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক ত্রিমুখী লড়াই। একদিকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী কামরুজ্জামান রতন, অন্যদিকে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলার সদস্য সচিব মোঃ মহিউদ্দিন, আর তৃতীয় শক্তি হিসেবে মাঠে রয়েছেন ইসলামী অঙ্গনের জনপ্রিয় আলেম ও ১০ দলীয় জোটের নেতা নুর হোসাইন নুরানী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনজনই নিজ নিজ অবস্থানে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হওয়ায় মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে কে শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেন তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও এটা বিএনপির ঘাঁটি, তবুও বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে বিএনপির দলীয় প্রার্থীকে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে প্রার্থীতা ফিরে পাওয়া নুর হোসাইন নুরানী এই আসনের নির্বাচনী সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী অঙ্গনের আলেম হিসেবে পরিচিত নুর হোসাইন নুরানী মুন্সিগঞ্জে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির একটি বড় অংশের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
১০ দলীয় জোটের নেতা হিসেবে তিনি শুধু একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন না, বরং ইসলামপন্থী ও সরকারবিরোধী বড় ভোট ব্যাংক একত্রিত করার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে মাদরাসাভিত্তিক ভোটার, ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ এবং সংগঠিত ইসলামী বলয়ের কাছে তিনি একজন গ্রহণযোগ্য মুখ।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, নুর হোসাইন নুরানীর মাঠে ফেরায় বিএনপি ও স্বতন্ত্র উভয় শিবিরই একটু চাপে পড়েছে।
মুন্সিগঞ্জ-৩ আসন ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সাংগঠনিক শক্তি, কর্মীসমর্থক এবং ভোটার সংখ্যার বিচারে বিএনপি এখানকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে এই শক্তির বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় ঐক্যের অভাব।
বিএনপির দলীয় প্রার্থী কামরুজ্জামান রতনের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন দলেরই জেলা সদস্য সচিব মোঃ মহিউদ্দিন। তিনি শুধু একজন বিদ্রোহী নন, বরং দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা, সংগঠক এবং জনসম্পৃক্ত রাজনীতিবিদ হিসেবে তার রয়েছে নিজস্ব শক্ত অবস্থান।
বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জ সদর ও গজারিয়া উপজেলায় তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীসমর্থন ব্যাপক। স্থানীয় অনেক বিএনপি নেতা-কর্মী প্রকাশ্যে কিংবা নীরবে তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
এর ফলে বিএনপির মূল ভোট ব্যাংক যে ভাগ হয়ে যাবে তা প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মোঃ মহিউদ্দিন শুধু একটি নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে লড়ছেন না, তিনি লড়ছেন দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক, ত্যাগ ও সাংগঠনিক প্রভাব নিয়ে। জেলার সদস্য সচিব হিসেবে দলের দুঃসময়ে মাঠে সক্রিয় থাকা এই নেতা সদর ও গজারিয়ায় ব্যাপক পরিচিত মুখ।
তার প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে, বিএনপির অনেক পুরোনো কর্মী ও সমর্থক দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তাকে সমর্থন করছেন। এতে বিএনপির দলীয় প্রার্থী বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি বিএনপির বিদ্রোহী ভোট উল্লেখযোগ্য হারে মোঃ মহিউদ্দিনের দিকে যায়, তাহলে দলীয় প্রার্থীর বিজয় কঠিন হয়ে উঠবে।
বর্তমান চিত্র অনুযায়ী মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে তিনটি শক্ত ভোট ব্যাংক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে- বিএনপির দলীয় ভোট, বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র ভোট, ইসলামী ও ১০ দলীয় জোটের ভোট। বিএনপির মূল ভোট যদি এক থাকতো, তাহলে এই আসনে তাদের জয় একেবারে নিশ্চিত বলা যেতো। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সেই ভোট ভাগ হচ্ছে অন্তত দুই ভাগে। এই বিভাজনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠতে পারেন নুর হোসাইন নুরানী। কারণ বিএনপির ভোট বিভক্ত হলে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীর তুলনামূলক কম ভোট পেয়েও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ব্যক্তি ইমেজ, এলাকার উন্নয়ন, গ্রহণযোগ্যতা ও সততার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে চান। ভোটাররা মন্তব্য করছেন-
‘বিএনপি আমাদের দল, কিন্তু বিদ্রোহী নেতা থাকলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।’
‘নুরানী হুজুর আলেম মানুষ, তার গ্রহণযোগ্যতা আছে।’
‘মহিউদ্দিন ভাই দীর্ঘদিন মাঠে ছিলেন, মানুষ তাকে চেনে।’
এ থেকেই বোঝা যায়, ভোটাররা এবার দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তির ভাবমূর্তিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখনো সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে বড় শক্তি, তবে ভোট বিভাজন তাদের বড় ঝুঁকি। স্বতন্ত্র বিদ্রোহী প্রার্থী মোঃ মহিউদ্দিন যদি বিএনপির উল্লেখযোগ্য ভোট নিজের দিকে টানতে পারেন, তাহলে তিনিও জয়ী হওয়ার সম্ভাবনায় থাকবেন। আবার ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী নুর হোসাইন নুরানী বিএনপির বিভক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে চমক দেখাতে পারেন।
সবমিলিয়ে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় লড়াই নয়, বরং ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা, সংগঠন ও ভোট ভাগাভাগির এক জটিল সমীকরণ। শেষ পর্যন্ত কে হাসবেন বিজয়ের হাসি- বিএনপি, বিদ্রোহী স্বতন্ত্র নাকি ১০ দলীয় জোট? এর উত্তর মিলবে ভোটের দিন। তবে এটুকু নিশ্চিত, মুন্সিগঞ্জ-৩ আসন এবারের নির্বাচনে দেশের অন্যতম আলোচিত ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।