
মুক্তিযোদ্ধা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট জামাল উদ্দিন চৌধুরী
আশরাফ ইকবাল
শৈশব ও কৈশোর
জামাল উদ্দিন চৌধুরী ১৯৩২ সনের ১১ই অক্টোবর বিক্রমপুর এলাকার মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানের কাজীর বাগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারটি ছিল সম্ভ্রান্ত এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবার। তাঁর পিতার নাম- কাজিম উদ্দিন চৌধুরী, মাতার নাম- আমিরন নেছা। বাবার চাকুরীসূত্রে তিনি এ সময়ে পরিবারের সঙ্গে ঢাকা বসবাস করতেন। চার বৎসর বয়সে স্থানীয় সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়।
মাত্র তেরো বৎসর বয়সে তিনি পিতৃহীন হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে সকলকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বাড়ীতে চলে আসেন। মায়ের সহযোগিতা এবং পরামর্শ অনুসারে অতি বিচক্ষণতার সঙ্গে সংসার পরিচালনা করতে থাকেন তিনি। এ সকল দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি তিনি মালখানগর উচ্চ বিদ্যালয় হতে ম্যাট্রিক এবং হরগঙ্গা কলেজ হতে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।
চাকুরী জীবন
১৯৫২ সনে তিনি তদানিন্তন বিমান বাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। বাঙালিরা পাকিস্তানীদের বৈষম্যের শিকার ছিল বিধায় তাঁকে সময়ে অসময়ে বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতে হয়েছে। এরপর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
পারিবারিক অবস্থা
তিনি ১৯৫৫ সনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিন কন্যা এবং দুই পূত্রের জনক ছিলেন তিনি। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তাঁর অবস্থান ছিল ১ম।
রাজনৈতিক জীবন
সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে এলাকায় তাঁদের পূর্ব পরিচিতি ছিলো। তার পরেও জনাব চৌধুরী তাঁর নিজস্ব গূণাবলীর জন্য সকলের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। তাঁর বড়ভাই জনাব কামাল উদ্দিন চৌধুরী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। বড় ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর এলাকার লোকজনের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তিনি ১৯৬৫ সনে চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করেন এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করে জনসেবার সুযোগ গ্রহণ করেন। ঠিক তখন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ।
অতঃপর সততা, নিষ্ঠা এবং পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতে তিনি ক্রমশঃ বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকেন এবং এলাকার কিংবদন্তিতে পরিণত হন। ১৯৭০ সনের নির্বাচন প্রস্তুতিতে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ নজরে পড়েন এবং নির্বাচন করে এমপি হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
৭১-এর দিনগুলি
১৯৭১ সনে তিনি বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে নিজ নিজ এলাকায় বিপুল সংখ্যক লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রচার এবং প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।এলাকার জনগনকে সংগঠিত করে কোচ, বল্লম, দা, লাঠি সোটা এবং কয়েকটি পাখিমারার বন্দুক নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নেন। তিনি এবং কিছু ডিফেন্সের লোক অস্ত্র চালানার প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তিতে থানার অস্ত্র ভাণ্ডারও কাজে লাগানো হয়। সেই সঙ্গে শত্রুকে প্রতিহত করতে দিনরাত পালাক্রমে চলে ঘাট পাহারা। এ সময়ে বিক্রমপুরে প্রবেশ শুধুমাত্র নদীপথেই ছিল। তাঁদের তখন বিশ্বাস ছিল জনশক্তিই বড় শক্তি। কিন্তু ভয়াল ২৫শে মার্চ রাতে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিলে তিনি একটি সংঘবদ্ধ দলের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে এপ্রিলের মাঝামাঝি ভারতে চলে যান। এরপর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আত্মীয়স্বজন, ভাইবোন এবং স্ত্রী পুত্র কন্যাদের অনিশ্চিত অবস্থায় গ্রামের বাড়ীতে রেখে আসন্ন যুদ্ধের জন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ভারতে চলে যান।
সেই সময়ে তাঁর একমাত্র সান্তনা ছিল এই যে, তাঁর ছোট দুই ভাই, আবদুর রউফ চৌধুরী, আমান উল্ল্যাহ চৌধুরী এবং অন্যান্য ভাই বোনেরা শিশুদেরকে দেখাশোনা করেছেন।
জনাব চৌধুরীর যুদ্ধে না গিয়ে উপায় ছিল না। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার চাইতেও দেশাত্নবোধের এক সু-তীব্র আকাঙ্খায় আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি। বস্তুতঃ তিনি বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন, এ সময় তার সঙ্গীরা সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্য এবং এমপি এ, মুক্তিযুদ্ধের সমন্বয় সাধন করে যুদ্ধ করেছেন। মেধা, সাহস ও দক্ষতার কারণে তিনি ভারতের প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন।
কেবল যুদ্ধকামী মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংহত করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণই নয়, তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করে আরো বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন । তাকে এডজুডেন্ট হিসেবেও বাংলাদেশের ০৮ নং সেক্টরে কাজ করার দায়িত্ব দেয়া হয়। যুদ্ধ এলাকা হিসাবে উনার দায়িত্ব ছিল কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর এবং খুলনার উত্তরাংশ। পরে তিনি ০৮ নং সেক্টরেই সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালনা করেন। সেই সময়ে তাঁর এলাকা ছিল কাশিয়ানি থানার ভাটিয়াপাড়া, মধুখালী, কানাইপুর এবং বোয়ালমারী । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই ১৯৭১ সনের ১৭ই ডিসেম্বর দশ হাজার পাক সৈন্য ফরিদপুর সার্কিট হাউজ ময়দানে তাঁর কাছে আত্নসমর্পণ করে । তিনি যুদ্ধবন্দি হিসেবে তাদেরকে পাকিস্তানে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে দেন।
এরপর আরো কিছুদিন তিনি ফরিদপুরে এ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে অবস্থান করেন এবং শান্তি ও শৃংখলা বজায় থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফিরে আসেন ।
তিনি বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মাননা এবং পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি নিজের এলাকার মধ্যেও কঠোর হস্তে অশান্তি দূর করে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন।
এই সময়ের মধ্যেই তিনি ঢাকা শহরে একটি সমবায় ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্থাপন, লালন এবং উন্নয়ন প্রচেষ্টার পাশাপাশি রাজনৈতিক কার্যক্রমও অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৫ সনের মর্মস্পর্শী ঘটনার পর সাময়িকভাবে নেতৃত্বশূন্য রাজনীতিকে সচল রাখার জন্য তিনি মাঝে মাঝে অন্যান্য রাজনীতিবিদদেরকে নিয়ে আলোচনায় বসতেন।
উল্লেখ করা যায় যে, সর্বজনাব আবদুর রাজ্জাক, রাশেদ মোশাররফ, ওবায়দুল কাদের, তোফায়েল আহমেদ প্রমূখ নেতৃবৃন্দ তাঁর ঢাকা ও চট্টগ্রাম অফিসে নিয়মিত বৈঠক করতেন। যখন জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তত করছিলেন, সেই সময়ে তিনি সেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত না হয়ে ‘মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সেই পরিষদের সহ-সভাপতি ছিলেন।
১৯৮২ সনের ২১ শে ফেব্রুয়ারী মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের এক সভায় যোগদানের জন্য তিনি ময়মনসিংহে যান। সেই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং ২২ শে ফেব্রুয়ারী ভোর ছয়টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন । মৃত্যুর সময়ে তাঁর বয়স ছিল মাত্র পঞ্চাশ বৎসর।
অতঃপর তাঁর প্রিয় এলাকা বিক্রমপুরের কাজীর বাগে তাকে সমাহিত করা হয়। এখনও তাঁর অজস্র গুণগ্রাহী রয়েছেন, যারা তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন ।
তথ্য: আসমা চৌধুরী, সালমা জাহান চৌধুরী ও আজমা চৌধুরী।