
মুন্সিগঞ্জের বার্তার গুণীজন সংবর্ধনা ২০২৬
সম্মাননা পাচ্ছেন জাহিদ নিরব ও কাজী হাসান
স্টাফ রিপোর্টার
দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মুন্সিগঞ্জ জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দিতে গুণীজন সংবর্ধনার আয়োজন করেছে দৈনিক মুন্সিগঞ্জের বার্তা। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, গবেষণা, ক্রীড়া, পরিবেশ ও মুক্তিযুদ্ধসহ নানা খাতে অবদান রাখা জেলার প্রায় ৩০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আগামী ২২ মার্চ ২০২৬ মুন্সিগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এর মধ্যে শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা পাচ্ছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও সংগীত পরিচালক জাহিদ নিরব এবং পরিবেশবান্ধব কাজের জন্য সোনারং তরু ছায়ার কাজী হাসান। আজকের পর্ব বিশিষ্ট দুই গুণীজনকে নিয়ে।
জাহিদ নিরব
বাংলাদেশের সমসাময়িক সঙ্গীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম। ১৯৯৪ সালের ২১ অক্টোবর মুন্সিগঞ্জের ঐতিহাসিক ইদ্রাকপুর এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের পরিবেশে বেড়ে ওঠা নিরবের জীবনে সুর যেন ছিল জন্মগত সঙ্গী। তার বাবা ছিলেন একজন লোকশিল্পী ও সঙ্গীত শিক্ষক, যার কাছ থেকেই খুব অল্প বয়সে সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। পরিবারেও ছিল সঙ্গীতের গভীর ঐতিহ্য—তার মামা মুজিব পরদেশী একজন খ্যাতিমান লোকশিল্পী এবং দাদা ছিলেন একজন দক্ষ বাঁশিবাদক।
শিক্ষাজীবনে তিনি মুন্সিগঞ্জের কে কে সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং পরে সরকারি হরগঙ্গা কলেজে পড়াশোনা করেন। নিজের ভাষায়, তিনি একজন ভালো ছাত্র ছিলেন, তবে পড়াশোনার চেয়ে সঙ্গীতের প্রতিই তার আগ্রহ ছিল বেশি। পরিবারের উৎসাহে তিনি পেশাদারভাবে সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন। বাবার কাছ থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখার পাশাপাশি শরীফ মাহমুদের কাছে তবলায় প্রশিক্ষণ নেন। মাত্র তেরো বছর বয়সে মিনহাজ বাবুর কাছে গিটার ও পিয়ানো শেখা শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তার সঙ্গীতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
নিরবের পেশাদার সঙ্গীতজীবনের সূচনা হয় ২০১১ সালে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো “নেসক্যাফে গেট সেট রক”-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। যদিও তখন তিনি তেমন পরিচিতি পাননি, কিন্তু এই প্ল্যাটফর্ম তাকে সঙ্গীতজগতে নিজের পথ তৈরি করার অনুপ্রেরণা দেয়। ২০১৫ সালে জনপ্রিয় রক ব্যান্ড চিরকুটে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে তার ক্যারিয়ারে আসে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। “আয়নাবাজি” চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান “দুনিয়া”-তে হারমোনিয়াম বাজানোর মাধ্যমেই চিরকুটের সঙ্গে তার যাত্রা শুরু হয়। ব্যান্ডটির ড্রামার ও প্রযোজক পাভেল আরিন তার এই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
চিরকুটে যোগ দেওয়ার পর নিরব ব্যান্ডটির সঙ্গে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে পারফর্ম করেন এবং সঙ্গীতচর্চায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করেন। একই সময়ে তিনি পাভেল আরিনের মালিকানাধীন “বাটার কমিউনিকেশন” স্টুডিওতে সঙ্গীত প্রযোজক হিসেবেও কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই তার সঙ্গীত পরিচালনা ও প্রযোজনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
একক শিল্পী হিসেবেও জাহিদ নিরব সমানভাবে সফল। বিজ্ঞাপন জগতের অন্যতম ব্যস্ত সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তিনি ইতোমধ্যে চার শতাধিক টেলিভিশন ও অনলাইন বিজ্ঞাপনের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তৈরি করেছেন। নাটক, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ওয়েব সিরিজেও তার সুর ও সংগীত পরিচালনা ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। আশফাক নিপুণের জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ “মহানগর” এবং অমিতাভ রেজা চৌধুরীর “মুন্সিগিরি”-র পটভূমি সংগীত পরিচালনা করে তিনি দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করেন।
তার একক সংগীতকর্মের মধ্যেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু সৃষ্টি। ২০১৮ সালে “প্রেমিক ১৯৮২” নাটকের জন্য নির্মিত “এ মন তোমার মনে” ছিল তার প্রথম একক গান। এছাড়া “প্রথম উপহার”, “কর লাগিয়া” এবং “তোমাকে চাই” গানগুলোও দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনেও তিনি নিজের স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেছেন। “পদ্মপুরাণ” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে “পোরাণ” চলচ্চিত্রের সঙ্গীত ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং “দেশান্তর” তার সঙ্গীত পরিচালনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৪ সালে প্রায় নয় বছর চিরকুট ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করার পর জাহিদ নিরব নিজের একক প্রকল্প ও অন্যান্য সঙ্গীত উদ্যোগে আরও বেশি মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ব্যান্ডটি থেকে সরে দাঁড়ান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার কাজের স্বীকৃতি মিলেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে বাউল, লোকজ ও সমসাময়িক ধারার সমন্বয়ে এক অনন্য সংগীত পরিবেশনা উপস্থাপন করা হয়, যার মধ্যে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” গানের একটি বহুভাষিক পরিবেশনাও ছিল।
বাংলা লোকসঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ নিয়ে বেড়ে ওঠা জাহিদ নিরব প্রখ্যাত শিল্পী মেহেদী হাসান, মান্না দে ও সুবীর নন্দীর মতো কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞদের দ্বারা অনুপ্রাণিত। পাশাপাশি কুমার বিশ্বজিৎ, মাইলসসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি রক ব্যান্ডের গানও তার সঙ্গীতচর্চায় প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমানে তিনি নতুন কিছু সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তার আসন্ন কাজের মধ্যে রয়েছে “বনলতা এক্সপ্রেস” এবং “প্রেশার কুকার” চলচ্চিত্র, যেগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
নিজস্ব সৃজনশীলতা, বহুমাত্রিক প্রতিভা এবং নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে জাহিদ নিরব আজ বাংলাদেশের আধুনিক সঙ্গীত জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। ব্যান্ড সংগীত, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন এবং ওয়েব সিরিজ—সব ক্ষেত্রেই তার অবদান তাকে সমসাময়িক সঙ্গীতাঙ্গনে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
কাজী হাসান
১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি (সার্টিফিকেট অনুযায়ী) নানাবাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার আলীপুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক পড়াশোনা মুন্সীগঞ্জ শহরের পিটিআইতে। সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে কলা বিভাগে স্নাতক পাশ করেছেন। সরকারি চাকুরে প্রয়াত পিতা কাজী আবদুল বাতেন ছিলেন চিত্রশিল্পী। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বিএফএ পাশ করেছিলেন। চাকুরিস্থল পিটিআইতে তাঁর লেখা বই পাঠ্যভুক্ত ছিলো। পিতার প্রভাব সন্তানের ওপর ব্যাপকভাবে পড়ে।
কাজী হাসান তালিকাভুক্ত গবেষক হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও এটিএন নিউজ এ কাজ করেছেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক পত্রিকা ‘মাসিক বিক্রমপুর’ এ সহ-সম্পাদক, ‘আমাদের বিক্রমপুর’ ও ‘বক্স অফিস’ পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এখন তিনি নিয়মিত আঞ্চলিক পত্রিকায় ব্যক্তিত্ব ও নিসর্গ বিষয়ক লেখারেখি করেন। তার লেখা জীবনীগ্রন্থ ছোটদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও বেগম রোকেয়া। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় জীবনীবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ আলোয় আলোয় ইমদাদুল হক মিলন, রন্ধনশিল্পী কেকা ফেরদৌসী।
কাজী হাসান এর যৌথ গবেষণায় প্রকাশিত হয় চলচ্চিত্রাচার্য আলমগীর কবির, অভিনয়শিল্পী নাজমা আনোয়ার, চিত্রশিল্পী কাজী হাসান হাবিব, অভিনয়শিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার, চিত্রনির্মাতা, চাষী নজরুল ইসলাম, নাট্যজন আতিকুল হক চৌধুরী, রন্ধনশিল্পী সিদ্দিকা কবীর এর ওপর তথ্যবহুল গ্রন্থ।
২০১২ সালে গ্রামীণ নিসর্গের কাছে ফেরেন কাজী হাসান। ওই বছরের ২৩ জুন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় নিজেদের জমিতে গড়ে তোলেন বৃক্ষরোপণ ও বিতরণ বিষয়ক কেন্দ্র ‘সোনারং তরুছায়া’। প্রথমে নিজের বাগান গড়াই ছিলো মূল কার্যক্রম। পরে তিনি অন্যের বাগান সৃজনে তিনি ভূমিকা রাখতে থাকেন। ‘সোনারং তরুছায়া’ এখন শুধুমাত্র একটি বাগান নয়, একটি নিয়মিত কল্যাণমুখী কার্যক্রম। একটি এগ্রিকালচার ও কালচার সেন্টার। গত বছর ২০২১ সালে এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন ‘সোনারং তরুছায়া পাঠাগার’। ‘সোনারং তরুছায়া’ এখন বৃক্ষরোপণ, বৃক্ষ বিতরণ, বই বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র। এখন প্রায় প্রতিদিন সেখান থেকে বৃক্ষপ্রেমী শিক্ষার্থীসহ আগ্রহীদের গাছের চারা ও বই উপহার দেয়া হয়। গত প্রায় দশ বছর ধরে ওই এলাকা ও দেশের আরও কিছু অঞ্চলের বৃক্ষপ্রেমী শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দিয়েছেন তারা এবং দিয়ে যাচ্ছেন।
তারা বৃক্ষরোপণ বা গাছের চারা উপহার দিয়ে বৃক্ষপ্রেমীকে তাঁর জন্মদিনে বরণ ও প্রয়াত ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকীতে অন্যদের গাছের চারা উপহার দিয়ে তাঁকে স্মরণ করে থাকেন। শিশুর জন্মদিনে ও কোমলমতি শিশুর স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনে, কারও কোনও সাফল্যকে স্মরণীয় করে রাখতে গাছের চারা রোপণ করেন ও রোপণ করার পরামর্শ দেন তারা। শিল্প-সাহিত্যের অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্বের উপহার দেয়া গাছের চারা রোপণের পর ‘সোনারং তরুছায়া’য় বেড়ে উঠছে।
‘সোনারং তরুছায়া’য় বৃক্ষপ্রেমী শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে ‘সোনারং তরুছায়া কো-অপারেটিভ গ্রীন ক্লাব’। এর সদস্যরা স্কুল, কলেজের ছুটিতে ‘সোনারং তরুছায়া’র গাছের পরিচর্যা করে। গাছের বীজ ও কাটিং থেকে চারা তৈরি করে। যে কারণে ওরা গাছ বিষয়ে প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষিত হচ্ছে। পাশাপাশি সবাই প্রতিদিন একটা হারে সম্মানী পায়। যা ওদের পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহে সহায়ক হয়। গজারিয়ার ভবেরচরস্থ ঈদগাহপাড়াস্থ ‘সোনারং তরুছায়া’র কম্পাউন্ড থেকে নয়াকান্দি গ্রামমুখী ৮০০ ফুট আয়তনের মাটির একটি সংযোগ সড়কও নির্মাণ করা হয়েছে। যার নামকরণ করা হয়েছে ‘সোনারং তরুছায়া সড়ক’।
ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মোনালিসা দাশগুপ্ত ‘সোনারং তরুছায়া’র কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘সবুজে সোনারং তরুছায়া’ নামে ২১ মিনিট ব্যাপ্তিকালের একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি করেছেন। ইতোমধ্যে প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’ ‘সোনারং তরুছায়া’র ওপর তিন পৃষ্ঠার প্রতিবেদন ছেপেেেছ। ২০২৩ সালে কাজী হাসান ‘দ্বিজেন শর্মা সিটি ব্যাংক বৃক্ষসখা সম্মাননা’ লাভ করেছে। ক্রেস্ট, সনদসহ ৫০ হাজার টাকা ছিলো তার অর্থমূল্য।
গত ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সোনারং তরুছায়া’র ভিডিও ইউনিট ‘সোনারংভিজ্যুয়াল আর্টস’। সেখান থেকে কাজী হাসানের পরিচালনায় ইতোমধ্যে যদ্যপি আমার গুরু, গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদের ৫০ বছর, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারম্যান্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটাল, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, সরকারি হরগঙ্গা কলেজসহ অনেক তথ্যবহুল ডক্যুমেন্টারি তৈরি হয়েছে।