
আমিরুল ইসলাম মামুন
আলুর রাজধানী হিসেবে পরিচিত মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় চলতি মৌসুমে আলুর বাজারে চরম ধসের পরও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলনের পাশাপাশি সঠিক দাম পাবার এবং আগের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্নও দেখছেন স্থানীয় কৃষকরা। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে মাঠপর্যায়ে মুন্সিগঞ্জের বার্তার চোখে ধরা পড়েছে নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ংকর এক আত্মঘাতী ঝুঁকি।
চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় ৯ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষাবাদ হয়েছে। মাঠজুড়ে সবুজ গাছ, পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক—দেখে বোঝার উপায় নেই, এই ফসল ঘিরেই তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি।
সরেজমিনে উপজেলার একাধিক আলুর বিলে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কীটনাশক প্রয়োগে কোনো নিয়ম মানা হচ্ছে না। নির্ধারিত ডোজ অনুসরণ না করে ওষুধ মেশানো হচ্ছে চোখের আন্দাজে। কোথাও অতিরিক্ত মাত্রায় কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে, যা সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। মাঠে কথা বলে জানা গেছে, অনেক কৃষকের কাছেই ‘ডোজ’ বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।
আরও উদ্বেগজনক চিত্র মিলেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। মাঠে কাজ করা ১৪ জন কীটনাশক স্প্রেকারির কারও মুখে মাস্ক বা হাতে গ্লাভস দেখা যায়নি। বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটানো হচ্ছে অরক্ষিত অবস্থায়। যদিও হাতে চালিত ম্যানুয়াল স্প্রে মেশিনের পাশাপাশি প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক চার্জে চালিত আধুনিক স্প্রে মেশিন ব্যবহার করতে দেখা গেছে, তবে সুরক্ষার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ইতিবাচক মনোভাব দেখা যায়নি।
মটুকপুর গ্রামের কৃষক হাকিম ছৈয়াল বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকে এভাবেই খেতে ওষুধ দেই। এখন নতুন নিয়ম আসছে। এগুলো কোন সমস্যা না।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহার শুধু কৃষকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তা নয়, খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের শরীরেও এর প্রভাব পড়ছে। আলু সংগ্রহের পর বাজার থেকে অজান্তেই ঢুকে পড়ছে রান্নাঘরে—কেউ জানে না, কতটা নিরাপদ খাদ্য সে গ্রহণ করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) ও খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন সুরক্ষা ছাড়া কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকলে স্নায়ু, লিভার ও কিডনি ক্ষতির পাশাপাশি ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পৃতীশ চন্দ্র পাল বলেন, কৃষকদের সচেতন করতে বহুবার উঠান বৈঠক ও মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সবুজ, হলুদ ও লাল চিহ্নিত কীটনাশকের ব্যবহার এবং নির্ধারিত ডোজ সম্পর্কেও নির্দেশনা দিয়েছি আমরা। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে অনেক কৃষক এসব নির্দেশনা মানছেন না। তিনি জানান, কৃষকদের বড় একটি অংশ অল্প শিক্ষিত ও বয়স্ক হওয়ায় পরিবর্তনের হার খুবই সীমিত।
অন্যদিকে টঙ্গীবাড়ী বাজারের কীটনাশক ব্যবসায়ী কৃষ্ণ গোপাল গোপ বলেন, “কীটনাশক বিক্রিতে প্রেসক্রিপশনের কোনো নিয়ম নেই। তাই কৃষক যেটা চায়, সেটাই দিতে হয়।” ফলে কীটনাশক সহজে পাওয়া যায় কিন্তু এর নিরাপদ ব্যবহারে কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
আলুর ভালো ফলনের আশায় মাঠে যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে ‘আলুর রাজধানী’ পরিচয়ের আড়ালে এখানে গড়ে উঠতে পারে এক দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সংকট।