
নমিনেশনের রাজনীতিতে হেরে গেলেন ত্যাগীরা
ত্বাইরান আবির
দল টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কঠিন সময়ে যে নেতারা মাঠে ছিলেন, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, মামলা-হামলা ও সংগঠনের অচলাবস্থার মধ্যে দলীয় পতাকা বহন করেছেন, সেই ত্যাগী নেতাদের কপালই যেন শেষ পর্যন্ত পোড়ে। ক্ষমতার মসনদ যত কাছে আসে, দলে শুরু হয় নমিনেশন কেন্দ্রিক দর-কষাকষি, পদের দৌড়, চাটুকারিতা ও কোরামবাজি। আর সেখানে জায়গা হয় না সেই ত্যাগীদের। এমন অভিযোগ শুধু জাতীয় রাজনীতিতে নয়, জেলার মাঠের রাজনীতিতেও ক্রমবর্ধমানভাবে দৃশ্যমান।
সাম্প্রতিক সময়ে মুন্সিগঞ্জ জেলায় বিএনপির রাজনীতিতে এমনই এক নাটকীয় উত্থান-পতন চলছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত অনেক নেতাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান। এর জেরে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দল, করা হয় বহিষ্কার, স্থায়ী বহিষ্কার এবং সাংগঠনিক সাসপেনশন। আর এই বহিষ্কারের হিড়িক নিয়ে জেলা বিএনপিতে চলছে তীব্র কানাঘুষা- ‘ত্যাগীরা কি তাহলে অপরাধী হয়ে গেলেন?’
প্রশ্ন জাগছে, স্বতন্ত্র হওয়া মানেই অপরাধ? রাজনীতির পুরোনো রীতি- মনোনয়ন না পেলে নিজস্ব জনপ্রিয়তা, মাঠের শক্তি বা কর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানো অনেক সময় স্থানীয় প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আজকের দলীয় শৃঙ্খলায় এটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতিমালায় যেকোনো নির্বাচনে দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানো সংগঠনের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে গণ্য হয়। যার ফলে বহিষ্কার এখন প্রায় অবধারিত প্রক্রিয়া, বিশেষত নির্বাচনের সময়।
মুন্সিগঞ্জের সাম্প্রতিক নির্বাচনে এই প্রবণতা আরও প্রকট। অনেক স্থানে দলীয় মনোনয়ন এমন নেতাদের দেয়া হয়েছে, যাদের ত্যাগ কম, যোগাযোগ শক্তিশালী, আবার যাদের জনপ্রিয়তা ও মাঠ দখল বেশি, তাদের বাদ পড়তে হয়েছে। বাদ পড়া নেতাদের অনেকে চুপ থাকলেও কেউ কেউ দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র হিসেবে। আর তাদের বিরুদ্ধে এখন চলছে কঠোর সাংগঠনিক অ্যাকশন।
মুন্সিগঞ্জ বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরেকটি শব্দ এখন আলোচনায়- কোরামবাজি। মূলত বিভিন্ন সভা, কর্মসূচি বা কমিটি গঠনের সময় কোরাম পূরণ দেখানোর মাধ্যমে কর্তৃত্ব দখলের নতুন রাজনীতি বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে। কোরামবাজদের হাতে দলীয় কমিটি, পদবন্টন, মনোনয়নের দর-কষাকষি এবং কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ শক্তিশালী। ফলে ত্যাগী নেতারা রাজনৈতিক বাস্তবতায় পর্যবসিত হচ্ছেন অপ্রয়োজনীয় হিসেবে।
রাজনীতির গবেষকদের মতে, কোরামবাজি বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। তবে জেলায় এটির প্রভাব এখন ব্যাপক, বিশেষ করে বিএনপির মতো একটি দীর্ঘ সময় সংঘটিত সংকটে থাকা দলীয় কাঠামোতে। কোরামবাজরা সাধারণত ক্ষমতাসংলগ্ন, কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং নির্বাচনী সময়ে নেটওয়ার্কভিত্তিক লবি কার্যক্রম চালান। এদের কারণে ত্যাগী হলেও কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন নেতারা বঞ্চিত হন।
মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপিতে গত কয়েক দফায় যে বহিষ্কারের তরঙ্গ দেখা গেছে তা কৌশলের অংশ বলেও অনেকে মনে করছেন। দল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কমাতে এক ধরনের দমন নীতি গ্রহণ করেছে, যাতে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র দাঁড়ানো নেতারা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নকে সর্বশেষ ভরসা হিসেবে বিবেচনা করেন, স্বাধীন ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বহিষ্কার দীর্ঘ মেয়াদে উল্টো ফল দিতে পারে। কারণ মাঠ পর্যায়ের ত্যাগী নেতাদের মাধ্যমেই দল সংগঠিত থাকে, কর্মীরা সক্রিয় থাকে এবং সংকটে দল বেঁচে থাকে। সেই ত্যাগীদের যদি সুযোগ না দিয়ে শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে সংগঠন দুর্বল হবে, এটাই বাস্তবতা।
মুন্সিগঞ্জ বিএনপির ইতিহাসে ত্যাগীদের অভাব নেই। ২০০১-২০০৬ পরবর্তী সময়, ২০০৮-২০১৪ এর কঠিন সাংগঠনিক সংকট, রাষ্ট্রীয় দমন, মামলা, নিপীড়ন- এসব সময়েই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পৌর পর্যায়ের নেতারা। জেলা ও কেন্দ্রের বৃহৎ রাজনীতিতে এই মাঠ নেতাদের ভূমিকা বেশি, কিন্তু পুরস্কার কম। নির্বাচনের আগে-পরে তাদের মূল্য হঠাৎ বেড়ে যায়, পরে আবার ভুলে যাওয়া হয়।
সাম্প্রতিক নির্বাচন ও জাতীয় পটপরিবর্তনের পরে মুন্সিগঞ্জেও সেই চিত্র আরও স্পষ্ট। মনোনয়ন বঞ্চিত অনেকে বলছেন, ‘দুঃসময়ে আমরা দলকে বাঁচিয়েছি, কিন্তু এখন আমাদের আর দরকার নেই।’
স্বতন্ত্র হওয়া নেতাদের যুক্তি স্পষ্ট ও বাস্তবতানির্ভর-
১। তারা জনপ্রিয় এবং জয়ের সম্ভাবনা ছিল
২। দলীয় মনোনয়ন বন্টন হয়েছে পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে
৩। মাঠের কর্মীরা তাদের ওপর ভরসা রেখেছে
৪। দীর্ঘদিনের ত্যাগের মূল্য না পাওয়া
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নেতা জানিয়েছেন, ‘দলের পতাকা ও সম্মান রক্ষার জন্য মামলা-হামলা খেয়েছি। নির্বাচনের সময় দল অন্য কাউকে এনে মনোনয়ন দিল! তাহলে আমরা কীসের জন্য ছিলাম?’ এমন ক্ষোভ এখন জেলা রাজনীতির বাস্তবতা।
দলীয় শৃঙ্খলা একটি রাজনৈতিক সংগঠনের অস্তিত্ব বজায় রাখার মূল শর্ত। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে শৃঙ্খলা এবং মাঠের বাস্তবতা সবসময় মিল খায় না। একটি দল যদি শুধু নির্বাচনী সময়ে শৃঙ্খলার কথা বলে এবং বাকি সময় কর্মীদের ত্যাগ ভুলে যায়, তাহলে সেই শৃঙ্খলা মুখস্ত নিয়মে পরিণত হয়, সংগঠনের শক্তিতে নয়।
মুন্সিগঞ্জ বিএনপিতে এখন এই দ্বন্দ্ব প্রকট-
১। সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় কেন্দ্র
২। মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান স্থানীয়রা
৩। নমিনেশন নিয়ন্ত্রণে চান লবিস্টরা
৪। আর দুঃসময়ে সংগঠন ধরে রাখেন ত্যাগীরা
এভাবে শেষমেষ শাস্তি পাচ্ছেন কারা? ত্যাগীরা।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিএনপি যদি ভবিষ্যতে নির্বাচনী রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা নিতে চায়, তাহলে তাদের তিনটি বিষয় সংস্কার জরুরী-
১। মনোনয়ন প্রক্রিয়া- জনপ্রিয়তা বনাম যোগসাজশ কোনটি প্রাধান্য পাবে
২। সংগঠনের পুনর্গঠন- কোরামবাজি ও কেন্দ্রীয় লবির দৌরাত্ম্য বন্ধ
৩। ত্যাগীদের মূল্যায়ন- মাঠ পর্যায়ের ত্যাগকে পুরস্কৃত করার কাঠামো
মুন্সিগঞ্জে এই তিনটি সংস্কার হলে বিএনপি আগামী নির্বাচনে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরতে পারে, এমনই দাবি স্থানীয়দের।
রাজনীতিতে ত্যাগী ও সাহসীদের কপাল পোড়া, এ যেন বহু পুরোনো সত্য। দুঃসময়ের সঙ্গী ভালো সময়ে উপেক্ষিত হওয়া, নমিনেশন থেকে বঞ্চিত হওয়া, শেষ পর্যন্ত বহিষ্কৃত হওয়া- এটাই এখন মুন্সিগঞ্জের বিএনপিতে বাস্তব চিত্র। দলীয় স্বার্থ বনাম ব্যক্তির ত্যাগের এই সংঘাতে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়বে তা সময়ই বলে দেবে। তবে রাজনৈতিক গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই বহিষ্কারের হিড়িক অব্যাহত থাকলে বিএনপির সংগঠন কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং দল হারাবে তার রাজনৈতিক মূলধন ত্যাগী নেতাদের।
#মুন্সিগঞ্জ_বিএনপি
#নমিনেশন_রাজনীতি
#ত্যাগী_নেতা
#স্বতন্ত্র_প্রার্থী
#বিএনপি_রাজনীতি
#কোরামবাজি
#দলীয়_শৃঙ্খলা
#বাংলাদেশ_রাজনীতি
#জেলা_রাজনীতি
#রাজনৈতিক_বিশ্লেষণ
#বহিষ্কার_রাজনীতি
#BNPPolitics
#Munshiganj