
সিরাজদিখান-শ্রীনগরে ভোটের তুফান তুলবেন বিএনপির এই তুরুপের তাস
ত্বাইরান আবির
মুন্সিগঞ্জ-১ (সিরাজদিখান-শ্রীনগর) আসনকে ঘিরে রাজনৈতিক তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে। বছরের পর বছর ধরে বিএনপি অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত এ আসনটি এবার আরও জটিল হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলীয় পর্যবেক্ষক ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এ মুহূর্তে মাঠে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। গুঞ্জন রয়েছে- এবার অগণিত ভোটে জয়ী হতে পারেন তিনি। শুধু তাই নয়, বিএনপির মূল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিরাজদিখান-শ্রীনগরে এবার ‘বিগ গেম’ খেলবে বিএনপি, আর সেই গেমের ফ্রন্টলাইনে আছেন আবদুল্লাহ।
শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ শুধু দলীয় রাজনীতির পরিচিত মুখই নন, তিনি জেলা বিএনপির সদস্য, সিরাজদিখান উপজেলা সভাপতি ও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে তৃণমূলের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতা। একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবেও তার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। আল মুসলিম গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শুধু অর্থনৈতিক শক্তিই নন, এলাকায় নানা সামাজিক সংযোগ ও কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবেও ভূমিকা রাখছেন। এ ব্যবসায়িক অবস্থান রাজনৈতিক প্রভাব ও নেটওয়ার্কে বাড়তি শক্তি যোগ করেছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সিরাজদিখান-শ্রীনগরের ভোটাররা অতীতের মতোই বিএনপি-ভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব অনুভব করছেন। স্থানীয়দের মতে, গত কয়েক মাস ধরে তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার, সংগঠন গোছানো, ভোটার কাভারেজ, কেন্দ্রভিত্তিক যোগাযোগ ও প্রাথমিক প্রচারণা- সবই প্রায় প্রস্তুত করেছেন আবদুল্লাহ। দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দাবি, ‘মাঠ পুরোপুরি গুছিয়ে এনেছেন’ তিনি।
মুন্সিগঞ্জ-১ আসন বহু বছর ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সিরাজদিখান-শ্রীনগরের সুনির্দিষ্ট কিছু ইউনিয়ন ও কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচিত। এ এলাকার ভোটার আচরণেও বিএনপির প্রভাব স্পষ্ট থাকে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা জানান, বিএনপির সাংগঠনিক মূলনীতি ও ভোট ইকুয়েশন এই আসনে খুব দীর্ঘদিনের। সে ধারাবাহিকতার কারণে এ আসনকে ঘিরে বিএনপির প্রত্যাশা এবার আরও বেশি।
এ অঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক বর্ণচিত্র ও অর্থনৈতিক গঠনও এ নির্বাচনকে স্বতন্ত্র রূপ দিচ্ছে। সিরাজদিখান-শ্রীনগরের অনেক পরিবারই বিদেশমুখী, বেশিরভাগ ভোটারই রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন এবং স্থানীয় রাজনীতির খুঁটিনাটি বিষয়ে গভীর আগ্রহী। এখানকার ভোটারদের একটা বড় অংশ ইতোমধ্যেই কাকে ভোট দেবেন, তা আগেই ঠিক করে রাখেন, এমনটিও প্রচলিত।
এ বাস্তবতায়, আবদুল্লাহর রাজনৈতিক পরিচিতি, ব্যবসায়িক সাফল্য ও সংগঠন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এই আসনে তাকে অস্বাভাবিকভাবে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।
দলীয় সূত্র বলছে- আবদুল্লাহ গত কয়েক মাস ধরে চুপিসারে কিন্তু গোছানো কৌশলে মাঠ সাজিয়েছেন। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে নৈশ বৈঠক, কেন্দ্রভিত্তিক ভোটারের তালিকা আপডেট, বুথ-ভিত্তিক সম্ভাব্য প্রতিনিধি ও ভোট দায়িত্ব বন্টন- এই সবই আগেভাগে সেরে ফেলেছেন তিনি। এর বাইরে নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক নেটওয়ার্ক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ককেও সক্রিয় করা হয়েছে ভোটযুদ্ধে।
এছাড়া ভোটারদের সার্ভে, মাঠ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ- এসবের মাধ্যমে কোন ইউনিয়নে কত শতাংশ ‘শিওর ভোট’ পাওয়া যাবে এমন হিসাবও দলীয় পর্যায়ে করা হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে বিএনপির শিবির এখন কোনোভাবে বলছে এই আসনে বড় কিছু হতে যাচ্ছে।
এ অঞ্চলে এখন আরেক ধরনের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে, বিএনপি এবার শুধু জয় নয়, বরং ম্যাসিভ ভোটে জয় চাইছে। ফলে মাঠের প্রচারণা আগেভাগেই ছন্দ পেয়েছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বীরা চাপে পড়েছেন, এটা দলীয় পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন।
তবে রাজনীতির মাঠ সবসময়ই চলমান, পরিবর্তনশীল ও শেষ মুহূর্ত নির্ভর। প্রতিদ্বন্দ্বীরা যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না, সেটা নিশ্চিত। অন্য দলের লোকেরাও বিভিন্ন কৌশল সাজাচ্ছে। শেষ সময়ে জোট, সমর্থন, সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, প্রশাসনিক অবস্থান- সব মিলেই লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে এমন পর্যবেক্ষণও রয়েছে।
এদিকে ব্যবসায়ী হিসেবে আবদুল্লাহর যাত্রা মোটেও ছোট নয়। আল মুসলিম গ্রুপ বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে পরিচিত নাম। প্রতিষ্ঠানটিতে হাজারো শ্রমিক ও কর্মী কাজ করেন। স্থানীয়দের মতে, এ কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক সফলতা বহু বছর ধরে সামাজিক সম্মানকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে রূপান্তরিত করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের প্রভাব নতুন নয়। বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবসায়িক সাফল্য রাজনৈতিক পরিচিতিকে শক্ত করে। আবদুল্লাহও সেই বাস্তবতার উদাহরণ। তার সামাজিক সংযোগ, বৈঠকি নেটওয়ার্ক ও ব্যবসায়িক লিঙ্ক রাজনৈতিক লড়াইয়ে বাড়তি সুবিধা এনে দিচ্ছে বলে দলীয়দের দাবি।
দলীয় কাঠামো ও স্থানীয় সমর্থন- এ দুইয়ের সমন্বয়ই এবার সিরাজদিখান-শ্রীনগরকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। তৃণমূল নেতাদের মতে, বিএনপির প্রায় সব শাখা সংগঠন এখন এক ছাতার নিচে। স্থানীয় এনজিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার কমিটি, ব্যবসায়ী সংঘ এসব ক্ষেত্রেও প্রভাব রয়েছে বিএনপির। ফলে মাঠে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীতা ছাড়াই পদযাত্রা, সভা, ঘরোয়া বৈঠক ও গণসংযোগ চলছে।
এমন অবস্থায় অনেকেই বলছেন, এবার সিরাজদিখান-শ্রীনগরে ভোটের হিসাব অনেক ওয়ান-ওয়ে হয়ে গেছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা সবসময় শেষ দিনেই গণনা হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পক্ষগুলো এ প্রচারণা ও গুঞ্জনকে অতিরঞ্জন বলছেন। তাদের মতে, ‘ভোটের মাঠে ফল দেখা যায় শেষ মুহূর্তে, রাজনীতি মানেই চমক।’ তবে তারাও স্বীকার করছেন, আবদুল্লাহ এবার উপেক্ষা করার মতো প্রার্থী নন। কিছু পর্যবেক্ষক বলছেন, এ আসনে অন্যান্য দলের কৌশল মূলত শেষ মুহূর্তে বুথ ও টার্গেট ভোট নিয়ন্ত্রণের। ফলে ভোটের দিনে হিসাব ও বাস্তবতা পাল্টে যাওয়ার নজির রয়েছে।
তবে স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অভিমত ভিন্ন। তরুণ ভোটাররা বলছেন, ‘বাকি সব দল কোনোরকমে চলছে, কিন্তু বিএনপির গতি সবচেয়ে বেশি।’ নারী ভোটারদের অনেকেই মনে করেন, ‘সমাজে সম্মান আছে, ব্যবসা আছে। প্রার্থী হিসেবে আব্দুল্লাহ ভালোই।’ মধ্যবয়সী ভোটারদের কেউ কেউ বলেন, ‘কে জিতবে সেটা পরে বোঝা যাবে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার এখন পুরোপুরি একতরফা।’
সবমিলিয়ে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এখন পর্যন্ত সিরাজদিখান-শ্রীনগর আসনে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। সংগঠন, ব্যবসায়িক বলয়, সামাজিক সংযোগ, দলীয় ভোটব্যাংক ও মাঠ-পর্যায়ের কৌশল সবই তার পক্ষে যুক্ত হচ্ছে। তাই বিএনপির শিবিরে আশাবাদ এবার বড় কিছু হবে। অবশ্য এমনটাই বলছে মাঠের বাস্তবতা।
তবে শেষ কথা নির্বাচনেই। রাজনীতিতে চূড়ান্ত হিসাব সবসময়ই শেষ ঘন্টায় নির্ধারিত হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীরা কত শক্ত প্রতিরোধ গড়বে, কৌশল কী হবে, কোন ভোটার গ্রুপ কোথায় ঝুঁকবে সবই এখনও অজানা। তাই প্রশ্ন এখন, আবদুল্লাহ কি সত্যিই দারুণ কিছু ঘটাবেন নাকি শেষ মুহূর্তে মাঠের সমীকরণ পাল্টে যাবে?