
সম্পাদকীয়
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস যা সচরাচর মে দিবস নামে অভিহিত। প্রতি বছর পয়লা মে তারিখে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদ্যাপন দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। ভারত ও বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে পয়লা মে জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়।
শ্রমিকের ঘামেই সভ্যতার অট্টালিকা। কিন্তু শ্রমিক দিবস যেন কিছুটা কৃত্রিমতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। একদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা, কিছু আনুষ্ঠানিক মিছিল-মিটিং, ব্যানার-ফেস্টুনের বাহার—তারপর ৩৬৫ দিনের অবহেলা! প্রশ্ন জাগে, কেন শ্রমিক দিবস একদিনের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যাচ্ছে? আসলে এ সংকট গভীর। এর শেকড় রয়েছে আমাদের সামষ্টিক চেতনায়, অর্থনৈতিক কাঠামোয় এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে।
শ্রম দিয়ে, মেহনত করে, গতর খেটে যারা জীবিকা জোগাড় করে তাদের বলা হয় শ্রমিক বা মেহনতি মানুষ। ইসলাম এদের মর্যাদা প্রাথমিককাল থেকেই দিয়ে আসছে। শ্রম দ্বারা যে মানুষ হালাল জীবিকা উপার্জন করে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ভূষিত করেছেন আল্লাহর বন্ধু উপাধিতে। যে কোনো পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শ্রম প্রদান করে শ্রমিক। তাই ইসলাম শ্রমিকদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে থাকে। শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের কাজের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম।
শ্রমিকদের একটি বড় অংশ জানেই না মে দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য কী। কারখানার মজুর, কৃষিজ শ্রমিক, গৃহকর্মী বা নির্মাণ শ্রমিক—তাদের অনেকের দিন কাটে দিনমজুরিতে, অনিশ্চয়তায়। শ্রমিক দিবসে তাদের অংশগ্রহণ নেই, নেই সচেতনতা। ফলে মে দিবস এক ধরনের ‘ঊর্ধ্বমুখী’ অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার শিকড় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত নয়।
২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে নিয়ে যাওয়ার সরকারের যে লক্ষ্য, সে লক্ষ্যে যদি পৌঁছতে হয় তাহলে অবশ্যই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সব শ্রমিকের দৈনিক কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, পেশাগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, শ্রমিকের অধিকার ও কল্যাণসহ সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার আজ প্রায় ৪৮ বছর হতে চলল। এখন পর্যন্ত স্বাধীন এ দেশটিতে শ্রমজীবী মানুষের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরির কোনো ব্যবস্থা নেই। এখনই সময় একটি জাতীয় মজুরি বোর্ড গঠন করে দেশের সব শ্রমিকের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা। যাতে অপ্রাতিষ্ঠানিকসহ কোনো খাতের শ্রমিকই ন্যূনতম মজুরিপ্রাপ্তি থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত না হয়। এখন পর্যন্ত খাত ভিত্তিক ৪৩টি খাতের ন্যূনতম মজুরি থাকলেও অধিকাংশের ক্ষেত্রেই তার বাস্তবায়ন নেই। এমনকি প্রতি পাঁচ বছর পর পর এ মজুরি পর্যালোচনার কথা থাকলেও অনেকগুলো খাতের ক্ষেত্রেই ২০/৩০ বছর ধরে তা হয়নি। ফলে ঘোষিত ন্যূনতম মজুরির বাস্তবায়ন এবং মজুরি পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি যে ৫৭টি খাতের মজুরি বোর্ড অবধি গঠন করা হয়নি, সেসব খাতের জন্যও খাতভিত্তিক মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে।দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, উন্নয়ন আরও হবে। কিন্তু খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের উন্নয়ন কতটুকু হচ্ছে? অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি শ্রমিকরা কি দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার অধিকার পাচ্ছে? তারা কি বেঁচে থাকার ন্যায্য মজুরির অধিকার পাচ্ছে? স্বাস্থ্যসম্মত উপযুক্ত কর্মপরিবেশ পাচ্ছে? না পাচ্ছে না। তাহলে এ উন্নয়নকে কি দেশের সামগ্রিক মানুষের উন্নয়ন বলা যায়? না বলা যায় না। বৃহৎ-সংখ্যক এ শ্রমজীবী মানুষকে অধিকার বঞ্চিত করে কখনই বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বিশাল অংশের এ শ্রমিকদের জন্য অর্থাৎ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের এ শ্রমিকদের জন্য এখন পর্যন্ত তেমন আইনি সুরক্ষাই গড়ে উঠেনি। উপযুক্ত মজুরি, কর্মপরিবেশ ও দৈনিক কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের কাছে আজও শুধুই স্বপ্ন। তাই প্রয়োজন একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন। যে শ্রম আইন দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতসহ সব শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা দেবে। নিশ্চিত করবে উপযুক্ত মজুরি, কর্মপরিবেশ ও দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময়। দুনিয়ার মজদুর এক হও জয় হোক মেহনতি মানুষের।