
বর্ষন মোহাম্মদঃ
বজ্রপাত নিঃসন্দেহে প্রকৃতির এক ভয়ংকর সুন্দর রূপ। সুন্দর এই অর্থে যে, এমন দৃশ্য মানুষের চোখে বছরের সব সময় দৃশ্যমান হয় না। বজ্রের গর্জন আর আকাশে চোখ ধাঁধানো স্ফুলিঙ্গ জানান দেয় রিমঝিম বৃষ্টির বার্তা। শীতের শুষ্ক প্রকৃতি যখন রূঢ় আচরণ করে ঠিক তখন বজ্রের গর্জন দিয়ে বৃষ্টি আসে। ইদানীংকালে এই বজ্রপাত আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ালেও অনেকের কাছে এটি বেশ উপভোগ্য। ঘন কালো মেঘে ঢেকে যাওয়া পৃথিবীকে হঠাৎ আলোকিত করে বজ্র যে ডাক দেয় তা শুনে চমকে উঠে হেসে দেন অনেকেই। প্রকৃতি এখন বেসামাল আচরণ শুরু করেছে। নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়া, বায়ুদূষণ, জলাশয় ভরাট, গাছপালা নির্বিচারে কেটে ফেলার কারণে দিন দিন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগের চেয়ে দেড় থেকে ২ ডিগ্রি তাপ বেড়ে গেছে। তাতেই বজ্রপাতসহ ভয়াবহ দুর্যোগ চারদিক দিয়ে আমাদের ঘিরে ধরছে।
সম্প্রতি সিরাজদিখানে জমি থেকে শাক তুলতে গিয়ে বজ্রপাতে তারিকুল ইসলাম নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এ সময় গুরুতর আহত হয়েছে তার ছোট ভাই মিনহাজ। মঙ্গলবার (১৩ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার পশ্চিম শিয়ালদি গ্রামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। তরিকুল ইসলাম (১২) ও মিনহাজ (৯) শেরপুর জেলার শুকরাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালামের ছেলে। তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে শিয়ালদি গ্রামের আলি হোসেনের বাড়িতে ভাড়া থাকে। তরিকুলের বাবা আব্দুস সালাম বলেন, দুই সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে অন্যের জমিতে কৃষি কাজ করি। আমার সঙ্গে ছেলেরাও সহযোগিতা করতো। সন্ধ্যায় ডাটা শাকের আঁটি বাঁধতে জমিতে গেলে হঠাৎ বজ্রপাতে আমার ছেলে মারা যায়। অপর ছেলে গুরুতর আহত হয়। জ্রপাত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে রাষ্ট্র বিবেচনা করলেও অন্যান্য ঝড়ের মতো তার প্রস্তুতি চোখে পড়ছে না। যাও প্রস্তুতি রয়েছে তাও অনিয়মের কারণে সে প্রকল্পগুলো আর বজ্রপাত রোধে কোনো ধরনের ভূমিকা রাখতে পারেনি। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল জেলার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার তস্তিপুর গ্রামে বজ্রপাতে এক স্কুল ছাত্র আবির দেওয়ানের ( ১৪) মৃত্যু এবং অরো ৩ জন আহত হয়েছে। বালিগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র আবির অন্য আরো ৩জনকে নিয়ে মাছ ধরার জন্য গাছের ডাল কেটে বাড়ির পার্শ্ববর্তী পুকুরে ফেলছিল। এ সময় বৃষ্টির সাথে হঠাৎ বজ্রপাত হলে আবির বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু বরণ করে।সঙ্গে থাকা অন্য আরো ৩ জন আহত হয়।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কালো মেঘের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে বজ্রপাতের পরিমাণ। বিদ্যুৎ প্রবাহ মানুষের শরীর দিয়ে প্রবাহিত হয় অনেকটা ইলেকট্রিক শকের মতো। বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে মানুষ যেভাবে দ্রুত শকড হয়, ঠিক একইভাবে বজ্রপাতেও মানুষ শকড হয়ে মারা যায়। কারণ মানুষের শরীর বিদ্যুৎ পরিবাহী। এ কারণে মানুষের ওপর বজ্রপাত হয়। যদি কোনো খোলা স্থানে বজ্রপাত হওয়ার মতো কোনো বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ না থাকে আর সেখানে যদি মানুষ থাকে যার উচ্চতা অন্য বিদ্যুৎ পরিবাহীর চেয়ে বেশি, তাহলে মানুষের ওপর বজ্রপাত হয়। সরাসরি মাটিতে সাধারণত বজ্রপাত হয় না। বজ্র বিদ্যুৎ পরিবাহীর ওপর পড়ে। এর পর ওই পরিবাহির মাধ্যমে বজ্রের বিদ্যুৎ মাটির সঙ্গে মিশে যায়। উঁচু গাছ, ভবন, পাহাড়ের শীর্ষে সাধারণত বজ্রপাত অধিক হয়। বজ্রপাত একটি আকস্মিক ঘটনা, যা প্রতিরোধ করা অত্যন্ত কঠিন। যদি বজ্রপাত হয়ে যায় তাহলে অনেকের মৃত্যু হতে পারে। আমাদের দেশে সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। এছাড়াও গত বছর বেশ কিছু বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটন ঘটে গজারিয়ায় বজ্রপাতে হালিমা বেগম (৬০) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। (১৮ অক্টোবর) দুপুর দেড়টার দিকে উপজেলার ভবেরচর ইউনিয়নের শ্রীনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত হালিমা বেগম ওই গ্রামের আব্দুল হান্নানের স্ত্রী। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার দুপুরে বসতবাড়ির অদূরে আকাশের নিচে কাজ করছিলেন আব্দুল হান্নান ও তার স্ত্রী হালিমা বেগম। দুপুরে হালকা বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত শুরু হলে তারা দুজন আহত হন। তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক হালিমা বেগমকে মৃত ঘোষণা করেন। আব্দুল হান্নানকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অন্যদিকে গত ৮ মে গজারিয়ায় বজ্রপাতে সুমন মিয়া(৪০) নামে এক যুবক আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। আহত সুমন মিয়া উপজেলার ভবেরচর ইউনিয়নের নয়াকান্দি গ্রামের মৃত আলাউদ্দিনের ছেলে। আজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে উল্লেখিত গ্রামে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এ সময় বাড়ির সামনের টিউবয়েলে কাজ করার সময় বজ্রপাতে আহত হন তিনি।
বিশেষজ্ঞ দের মতে, বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা এড়াতে পাশের দেশ নেপাল ইতিমধ্যে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশেও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বজ্রপাতের ফলে হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সচেতনতা তৈরি, আগাম সতর্কতামূলক টেলিযোগাযোগব্যবস্থা তৈরি, হাওর-বাঁওড় এলাকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, তালগাছ রোপণ, মোবাইলে খুদে বার্তা প্রেরণ, বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং বজ্রপাত থেকে বাঁচার বিভিন্ন কৌশল লিফলেট আকারে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বিতরণ করা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বজ্রপাত ও প্রতিরোধসংক্রান্ত যেসব যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে হবে, সেসব সরঞ্জাম সহজলভ্য করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ এর নির্দেশনা ও চাওয়া হয়েছে