
বাংলাদেশ এক স্বপ্নযাত্রার কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। স্বল্পোন্নত দেশের তকমা ঘুচিয়ে উন্নয়নশীল বিশ্বের কাতারে আমাদের প্রবেশ যেমন আনন্দের, তেমনই ভবিষ্যতের পথরেখা অঙ্কনে তা আমাদের আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। আগামীর পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হলে শুধু অর্থনৈতিক সূচকের ঊর্ধ্বগতিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন টেকসই উন্নয়নের এক মজবুত ভিত্তি। শিক্ষা ও মানবসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, অবকাঠামো, এবং সুশাসন ও দুর্নীতি দমনু এই স্তম্ভগুলোতেই লুকিয়ে আছে আমাদের টিকে থাকার মন্ত্র।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ- মেরুদণ্ড মজবুত করার কৌশল:
জাতি গঠনে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। তবে আমাদের গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা এখনও একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। মুখস্থনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রায়োগিক ও বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষার দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও বহু শিক্ষার্থী কর্মসংস্থানের জন্য উপযুক্ত দক্ষতা থেকে বঞ্চিত। যেমন, একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিল্পের চাহিদা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মধ্যে একটি বড় ফাঁক রয়ে গেছে, যার ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ বেকারত্বের বোঝা টানতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে আশার কথা, নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন এবং কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এটি একটি সঠিক পদক্ষেপ। জার্মানি কিংবা জাপানের মতো দেশগুলো কীভাবে তাদের কর্মশক্তিকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে, তা আমাদের জন্য একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। আমাদের শুধু প্রয়োজন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করা এবং শিক্ষার্থীদেরকে শুধু সনদধারী নয়, দক্ষ ও উদ্ভাবনী করে তোলা।
তথ্যপ্রযুক্তি- ডিজিটাল নবজাগরণের পথচলা:
ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মোবাইল ব্যাংকিং থেকে শুরু করে ই-কমার্সের বিস্তার প্রমাণ করে তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের অর্থনীতিতে এক নতুন গতি এনেছে। রিকাব (জরশধন), পাঠাও (চধঃযধড়)-এর মতো দেশীয় উদ্ভাবনগুলো তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে অনলাইন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম তথ্যপ্রযুক্তির অপরিহার্যতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
কিন্তু এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য এখনও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষকে ডিজিটাল সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। পাশাপাশি ডেটা সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এস্তোনিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো তাদের ডিজিটাল রূপান্তরে যে সফল মডেল অনুসরণ করেছে, তা থেকে আমরা কৌশলগত শিক্ষা নিতে পারি।
কৃষি- সবুজ বিপ্লবের নতুন দিগন্ত:
কৃষি আমাদের অর্থনীতির লাইফলাইন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের সিংহভাগ মানুষের জীবিকা এই খাতের উপর নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে ধান, মাছ, মাংস ও সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অর্জন সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, আবাদি জমির সংকোচন এবং সেচ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আমাদের কৃষিখাতকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্মার্ট কৃষি এবং টেকসই কৃষি পদ্ধতি অপরিহার্য। খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শস্য বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইঅজও) বা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইজজও)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবনী কাজগুলোকে আরও বেগবান করা প্রয়োজন। কৃষকদেরকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করানো এবং তাদের কাছে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ ও ভর্তুকি পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
অবকাঠামো- উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি:
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলু এই মেগা প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে এক নবদিগন্তের সূচনা করেছে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা শুধু পণ্য পরিবহনই নয়, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরও সহায়ক। তবে, শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতেও আমাদের টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
অবকাঠামো প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন এবং পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে সুপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। জাপান বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো কীভাবে পরিবেশ-বান্ধব এবং দূরদর্শী অবকাঠামো নির্মাণ করে, তা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় মডেল হতে পারে।
সুশাসন ও দুর্নীতি দমন- টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে জরুরী ভিত্তি:
যেকোনো টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো সুশাসন এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ। দুর্নীতির কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, সরকারি সেবার মান হ্রাস পায় এবং জনগণের আস্থায় চিড় ধরে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতি এখনও আমাদের জাতীয় উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সকল স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ই-গভর্নেন্সের প্রসার এবং ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে সরকারি সেবাকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব। যেমন, ভূমি নিবন্ধন বা পাসপোর্ট সেবা অনলাইনে আনার ফলে অনিয়ম অনেকটাই কমেছে। গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা এবং জনগণের সচেতনতাও দুর্নীতি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আগামীর বিশ্বে বাংলাদেশকে সফলভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে এই খাতগুলোতে সমন্বিত এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। এটি কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়, বরং বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি দেশের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ২০৪১ সালের উন্নত, সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এই পথচলা হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।
লেখক: ত্বাইরান আবির