
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় যখন কোনো প্রাণহানি ঘটে, তখন মৃতদেহগুলো কেবল এক শোকাহত পরিবারের সন্তান বা প্রিয়জন থাকে না; হয়ে ওঠে এক বীভৎস রাজনৈতিক হাতিয়ার।
রাজনৈতিক দলগুলো নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে টানাটানি করে, একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয় এবং নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে হতাশাজনক দিকটি হলো, কোনো দলই বিচারহীনতার এই গভীর শিকড় গেড়ে বসা সংস্কৃতি পরিবর্তনের কথা বলে না। বরং, মৃতদেহকে কেন্দ্র করে এই রাজনীতি দেশের জন্য এক ভয়াবহ কুফল বয়ে আনছে, যা রাষ্ট্রের স্তম্ভগুলোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
লাশের রাজনীতির ভয়াবহ কুফল ও কয়েকটি দৃষ্টান্ত
১। বিচার প্রক্রিয়ার প্রহসন ও দীর্ঘসূত্রিতা
যখন একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, তখন প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা। কিন্তু লাশের রাজনীতিতে এই লক্ষ্যটি গৌণ হয়ে যায়। দলগুলো দ্রুত একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে দেয়, যা সুষ্ঠু তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। গণমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আর অভিযোগের বন্যা বইয়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ২০১২ সালের সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলা। হত্যাকাণ্ডের পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে দোষারোপের পালা শুরু হয়। তৎকালীন বিরোধী দল সরকারি দলের ব্যর্থতার অভিযোগ তোলে, আর সরকার অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেয়। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। র্যাব বারবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
এই ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আরেকটি উদাহরণ হলো ২০১৯ সালের বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ড। প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাতকে। এই ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ভিডিও ফুটেজ দেখে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা গেলেও রাজনৈতিক চাপ এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া এক জটিল রূপ নেয়। যদিও এই মামলায় দ্রুত রায় দেওয়া হয়, তবুও অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
গত পরশু মিটফোর্ডে সোহাগ হত্যার ক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখলাম। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, অথচ বিচার চাওয়া এবং স্বজনদের প্রতি সমবেদনা মানুষের মাঝে ছিল অনুপস্থিত। এটা সত্যিই হতাশার।
২। প্রতিশোধের চক্র তৈরি ও সংঘাতের বিস্তার
একবার যদি কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার না হয় বা বিচার বিলম্বিত হয়, তবে নিহত ব্যক্তির স্বজন এবং সমর্থকরা প্রতিশোধের পথ বেছে নিতে পারে। এটি সমাজে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্ম দেয়, যেখানে সহিংসতা এবং পাল্টা সহিংসতা একটি অবিরাম চক্র তৈরি করে। রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রতিশোধের আবেগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে।
যেমন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে প্রায়শই এই প্রতিশোধের চক্র দেখা যায়। এক পক্ষের কর্মী নিহত হলে অপর পক্ষ পাল্টা হামলার শিকার হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট ছিল। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হয়।
৩। রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বিভাজন এবং অস্থিরতার উৎস
লাশ নিয়ে রাজনীতির মাধ্যমে দলগুলো নিজেদের অবস্থানকে আরও কঠোর করে তোলে। তারা নিহত ব্যক্তিকে নিজেদের ‘শহীদ’ হিসেবে উপস্থাপন করে, যা তাদের সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের বিভাজন তৈরি করে। এই বিভাজন সমাজে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ায় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
২০১৪ পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় প্রতিটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক মেরুকরণ দেখা যায়। একদিকে সরকার ও তার জোট, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে রাজপথে সহিংসতা উস্কে দেয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই মেরুকরণ এতটাই তীব্র ছিল যে, তা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে, যা সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে দেয়। দেশের মৌলিক সমস্যাগুলো যেমন – দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান – এসবের দিকে মনোযোগ না দিয়ে শুধুমাত্র পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতিতে লিপ্ত থাকা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা দেয়।
৪। আইনের শাসনের দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
যখন রাজনৈতিক কারণে হত্যাকাণ্ডের বিচার হয় না বা বিচার প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়, তখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। অপরাধীরা মনে করে তারা পার পেয়ে যাবে এবং এর ফলে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। জনগণ দেখতে পায় যে, ক্ষমতাশালীদের জন্য আইন একরকম, আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক রকম। এই পরিস্থিতি সমাজে নৈরাজ্য তৈরি করে এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।
২০১৩-১৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতায় অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার অনেকগুলোরই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে অভিযুক্তরা অনেক সময় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে গেছে অথবা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ দুর্বল হয়ে পড়েছে। যখন একজন সাধারণ মানুষ দেখে যে, প্রভাবশালীদের সন্তান বা অনুসারীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হয়। আইন সবার জন্য সমান – এই বিশ্বাস না থাকলে একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৫। নৈতিক অবক্ষয় ও মানবিকতার পতন
রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য মৃতদেহকে ব্যবহার করা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের চরম দৃষ্টান্ত। এটি মানবিক সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দেয়। যখন রাজনৈতিক নেতারা মানুষের মৃত্যু নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা খোঁজেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হয়। এমন একটি সংস্কৃতি যেখানে জীবন এবং মৃত্যু কেবল খেলার পুতুল, সেখানে নৈতিক মূল্যবোধের আর কোনো স্থান থাকে না।
রাজনৈতিক সমাবেশে নিহত ব্যক্তিদের ছবি ব্যবহার করে বা তাদের লাশ নিয়ে শোক মিছিল করে রাজনৈতিক সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা প্রায়শই দেখা যায়। এই ঘটনাগুলো মানুষের মৃত্যুকে রাজনীতির উপকরণে পরিণত করে, যা অত্যন্ত অমানবিক। একটি সমাজ যখন মানুষের জীবনকে রাজনীতির চাল হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না, তখন সেই সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে।
সমাধানের পথ- বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি
এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। মৃতদেহ নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করে তাদের উচিত বিচারহীনতার সংস্কৃতি পরিবর্তনের জন্য কাজ করা। এর জন্য প্রয়োজন-
* দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত- প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।
* স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া- বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা। উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে নিম্ন আদালত পর্যন্ত বিচারকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
* আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা- ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ এই নীতি প্রতিষ্ঠা করা এবং অপরাধীদের দল-মত নির্বিশেষে বিচারের আওতায় আনা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে, তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
* রাজনৈতিক সদিচ্ছা- সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি বোঝাপড়া থাকা যে, সহিংসতা এবং হত্যাকাণ্ডের রাজনীতি দেশের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং তাদের কর্মীদের সহিংসতা থেকে বিরত রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
* গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা- গণমাধ্যমকে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
রাজনৈতিক নেতাদের বুঝতে হবে, একটি সভ্য সমাজে মৃতদেহ নিয়ে কোনো ধরনের নোংরা রাজনীতি চলতে পারে না। এর পরিবর্তে, প্রতিটি মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের সকলেরই প্রশ্ন করা উচিত, আর কত লাশ পড়লে এই রাজনীতি বন্ধ হবে, আর কবে আমরা একটি বিচারপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন দেখতে পাবো?
লেখক- ত্বাইরান আবির, লেখক ও অনুবাদক