
সৃষ্টির মধ্য দিয়ে চিরঞ্জীব এক শিল্পী গত ২০ শে জুলাই ২০২৫ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে শিল্পাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাংলাদেশের বরেণ্য ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান ৭৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ার জটিলতায় ভুগে তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার প্রয়াণে জাতি হারালো এক অসামান্য শিল্পীকে, যার সৃষ্টি বাংলাদেশের শিল্পকলা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।
১৯৪৬ সালের ১৬ই মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার সহশ্রাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হামিদুজ্জামান খান। শৈশব থেকেই শিল্পকলার প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। গ্রামের প্রকৃতির মাঝে বেড়ে ওঠা এবং স্থানীয় প্রখ্যাত শিল্পী হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের চিত্রকর্ম তাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। শুরুতে জলরঙের চিত্রকর্মেই তিনি সুনাম অর্জন করেন, এমনকি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনও তার জলরঙের কাজের প্রশংসা করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে তার প্রতিভা ভাস্কর্য শিল্পেই বিকশিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধ ও ভাস্কর্যে অবদান
হামিদুজ্জামান খানের শিল্পী জীবনে মুক্তিযুদ্ধের গভীর প্রভাব ছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে আটক করলেও পরে তিনি মুক্তি পান। ২৭শে মার্চ ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকায় অসংখ্য মৃতদেহ দেখে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও মানুষের দুর্দশা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী অনেক ভাস্কর্যের মূল অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
১৯৭০ সালে ঢাকা চারুকলায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। তার দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য কালজয়ী ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস, প্রকৃতি এবং পাখির মতো বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কিছু ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে-
‘সংশপ্তক’- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থিত এই ভাস্কর্যটি এক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার অদম্য চেতনাকে ধারণ করে, যিনি এক পা ও এক হাত হারিয়েও অস্ত্র হাতে যুদ্ধের জয়োগান গেয়ে চলেছেন। এটি তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বহুল পরিচিত কাজ।
‘একাত্তর স্মরণে’- ১৯৭৬ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণায় নির্মিত ব্রোঞ্জের ‘দরজা’ শীর্ষক এই ভাস্কর্যটি তাকে ভাস্কর হিসেবে বাংলাদেশে প্রথম খ্যাতি এনে দেয়।
‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’- এটি বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য, যা ১৯৭৩ সালে নির্মিত হয়। এই ভাস্কর্য নির্মাণে তিনি শিল্পী আব্দুর রাজ্জাকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিলেন।
‘মুক্তিযোদ্ধা’- ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমিতে স্থাপিত এই ভাস্কর্যটি মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
‘পাখি পরিবার’- ১৯৮১ সালে বঙ্গভবনে স্থাপিত এই ভাস্কর্যটি তার প্রকৃতি ও পাখির প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন।
‘বিজয় কেতন’- ঢাকা সেনানিবাসে স্থাপিত এই ভাস্কর্যটিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহন করে।
‘স্বাধীনতা চিরন্তন’- এই ভাস্কর্যটিও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ।
‘মৃত্যুঞ্জয়ী’- আগারগাঁও সরকারি কর্ম কমিশন প্রাঙ্গণে এটি অবস্থিত।
হামিদুজ্জামান খানের কাজ শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রদর্শিত ও স্থাপিত হয়েছে। ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল অলিম্পিক পার্কে তার ‘স্টেপস’ নামক ভাস্কর্য স্থাপনের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেন। তার ভাস্কর্যে এক্সপ্রেশনিজম বা মিনিমালিজম এবং স্থাপত্যের সঙ্গে ভাস্কর্যের মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। তিনি আধা-বিমূর্ত ও বিমূর্ত– উভয় ধারাতেই কাজ করেছেন।
চিত্রকলা ও সম্মাননা
ভাস্কর্যের পাশাপাশি হামিদুজ্জামান খান একজন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীও ছিলেন। জলরঙ, তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক ও স্কেচ মাধ্যমেও তিনি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। তার জলরঙ ও অ্যাক্রিলিক চিত্রকর্মে বিমূর্ত প্রকাশবাদের ধারা লক্ষ্য করা যায়, যেখানে নিসর্গ ও মানবশরীর প্রধান বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান পেয়েছে। ১৯৬০ এর দশকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন তার জলরঙের চিত্রকর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হামিদুজ্জামান খান ২০০৬ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৭৬ সালে শিল্পকলা একাডেমি পদক, ২০০৬ সালে ঢাকা সিটি পুরস্কার, ২০০৯ সালে এস এম সুলতান পদক এবং ২০১২ সালে জয়নুল সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন।
সবশেষ কথা
হামিদুজ্জামান খান ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী, যিনি সারাজীবন শিল্পচর্চায় মগ্ন ছিলেন। তার সৃষ্টিকর্ম নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। এই মহান শিল্পীর প্রয়াণে দেশের শিল্পজগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তার কর্মময় জীবন ও সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
লেখক- ত্বাইরান আবির, লেখক ও অনুবাদক