
আমাদের মুন্সিগঞ্জের জেলা সদরে অবস্থিত জেনারেল হাসপাতালের অবস্থা জঘন্য। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নেই। নেই বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা। ছোটখাটো সমস্যা হলেও ঢাকায় রেফার করা হয় রোগীকে। এতে ঢাকা নিতে নিতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় অনেকে। বোধ করি এটা শুধু আমাদের এক জেলার চিত্র নয়, সারা বাংলাদেশেই সরকারি জেনারেল হাসপাতালের চিত্র এমন, তাও আবার জেলা পর্যায়ে। এই দুরবস্থা থেকে অচিরেই জনগণকে মুক্ত করার উপায় হচ্ছে উন্নতি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে।
মুন্সিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের করুণ চিত্র কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালেরই প্রতিচ্ছবি। উন্নত স্বাস্থ্যসেবার অভাব, বিশেষ চিকিৎসার অপ্রতুলতা এবং সামান্য অসুস্থতার জন্যও রোগীদের ঢাকায় রেফার করার প্রবণতা– এসবই আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক গুরুতর দুর্বলতা। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক রোগীর অকাল মৃত্যু ঘটছে। এই অচলাবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার এক হতাশাজনক চিত্র
বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশই আসে ব্যক্তির নিজস্ব উৎস থেকে, যা ‘আউট-অব-পকেট’ ব্যয় নামে পরিচিত। এর অর্থ হলো, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য নিজের পকেট থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে হচ্ছে, যা দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মারাত্মক বোঝা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের একটি বড় অংশই শহরকেন্দ্রিক। ফলে গ্রামাঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকট দেখা যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ৪২ শতাংশ পদই শূন্য। এর মানে হলো, দেশের সিংহভাগ মানুষ তাদের দোরগোড়ায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না।
এছাড়াও, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অফ গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BIGD) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, অপরিষ্কার পরিবেশ এবং অপ্রতুল জনবল সেবার মানকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক হাসপাতালেই এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক সরঞ্জামের অভাব রয়েছে, অথবা সেগুলো থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। এসব কারণে বাধ্য হয়েই রোগীদের জেলা শহর বা রাজধানীতে ছুটতে হয়, যেখানে চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেশি।
উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণে করণীয়
এই গুরুতর সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা একান্ত জরুরি। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন-
১। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিক সরঞ্জামের জোগান
হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, উন্নত ডায়াগনস্টিক ল্যাব এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। অনেক হাসপাতালেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে অথবা যেগুলো আছে সেগুলো অনেক পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ। অত্যাধুনিক সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, এক্স-রে মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল যন্ত্র কিনলেই হবে না, সেগুলোর সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত জনবলও নিশ্চিত করতে হবে।
২। পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ ও নিয়মিত উপস্থিতি
জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চরম সংকট রয়েছে। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, শিশু, অর্থোপেডিকস, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সংখ্যক পদ সৃষ্টি এবং দ্রুততার সাথে এসব পদ পূরণ করা উচিত। এছাড়া, তাদের কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে গ্রামীণ এলাকায় সেবাদানের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, আবাসন সুবিধা এবং উন্নত কর্মপরিবেশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৩। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধি
চিকিৎসক ছাড়াও নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। রোগীর যত্ন, জরুরি সেবা প্রদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা এবং পদোন্নতির সুষম নীতি নিশ্চিত করা উচিত।
৪। বিশেষায়িত সেবার সম্প্রসারণ
ছোটখাটো সমস্যার জন্য ঢাকায় রেফার করার প্রবণতা কমাতে হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েই অন্তত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত সেবার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন- ছোটখাটো অস্ত্রোপচার, হৃদরোগের প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি প্রসূতি সেবা, নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা (NICU), ডায়ালাইসিস ইউনিট এবং মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ইত্যাদি। এর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে দূর থেকে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা গ্রামীণ রোগীদের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
৫। ঔষধ ও জরুরি উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহ
অনেক হাসপাতালেই প্রয়োজনীয় ঔষধ ও জীবন রক্ষাকারী উপকরণের সংকট দেখা যায়। ঔষধের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ঔষধের ব্যবহার রোধ করতে হবে। জরুরি রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং ব্লাড ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত রক্ত মজুদ রাখা প্রয়োজন। জীবন রক্ষাকারী ঔষধের সহজলভ্যতা এবং বিনামূল্যে বিতরণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে দরিদ্র রোগীদের জন্য।
৬। দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। ঔষধ চুরি, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়ম এবং সেবার বিনিময়ে অবৈধ অর্থ আদায়ের মতো ঘটনা রোধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা যেতে পারে। রোগীদের অভিযোগ জানানোর এবং প্রতিকার পাওয়ার একটি সহজ ও কার্যকরী প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
৭। সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা
চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর জোর দেওয়া উচিত। জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব বোঝানো ও টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা গেলে অনেক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এতে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে।
উপরে উল্লেখিত পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মুন্সিগঞ্জের মতো অন্যান্য জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্রও পাল্টে যাবে। দেশের আপামর জনসাধারণ উন্নত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুফল ভোগ করতে পারবে এবং চিকিৎসার জন্য অকাল মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমে আসবে।
সরকারের উচিত এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কেবল একটি সরকারি দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও জাতীয় অগ্রগতির মূল নিয়ামক।
লেখক- ত্বাইরান আবির, লেখক ও অনুবাদক