রমজান মাহমুদ
শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য সুযোগ সুবিধার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মধ্যে আকাশ সমান বৈষম্য ছিলো। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারী শিক্ষকরা এ বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসলেও সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কর্ণপাত করেনি। এ বছর ২২/০৪/২০২৫ তারিখে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীকরণ প্রত্যাশী জোট শিক্ষা উপদেষ্টার নিকট লিখিতভাবে সরকারি নিয়মে ৪৫% বাড়ি ভাড়া, ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ও ১০০% উৎসব ভাতার আবেদন করেন। কিন্তু সরকারের পক্ষে আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকায় আলোচনার মাধ্যমে এ দাবিকে ২০% বাড়ি ভাড়া, ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ও কর্মচারীদের জন্য ৭৫% উৎসব ভাতার দাবী পুন:নির্ধারণ করে। এ দাবী বাস্তবায়ন নিয়েও সরকার সময়ক্ষেপন ও নানা তালবাহানা করে। এতে শিক্ষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দিয়েও যখন দাবীর ব্যাপারে কোন সাড়া পাচ্ছিলো না। তখনই আলটিমেটাম দিয়ে ১২/১০/২৫ তারিখে জাতীয় প্রেসক্লাবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি আহ্বান করে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীকরণ প্রত্যাশী জোট। কিন্তু সেদিনের কর্মসূচিতে পুলিশ বেশ ক’জন শিক্ষককে গ্রেফতার ও হামলা করে আহত করে। এতে সারাদেশের শিক্ষকরা প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেন। শিক্ষকরা কারো করুণা চান না, তারা তাদের ন্যার্য দাবির বাস্তবায়ন চান। কিন্তু এ ন্যার্য দাবীর বাস্তবায়নে তাদের লাঞ্চিত হতে হলো। প্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলারা শিক্ষকদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলো। তাদের ভাব এমন আমাদের ইচ্ছে হলে দাবি পূরণ করবো, না হলে নাই! দাবীর পক্ষে মতামত আরো জোড়ালো হতে থাকে। এরমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ দাবীর পক্ষে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করেন। সরকার অবস্থা বেগতিক দেখে ১৯/১০/২০২৫ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ০৭.০০.০০০০.১৭৩.৩১.০৪৮.১০.২৬০ মাধ্যমে বাড়ি ভাড়া ৫% বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন দেয়। তিনটি দাবির মধ্যে বাকি দুটির কোন ব্যাখ্যা দেয়নি। এতে আন্দোলনরত শিক্ষকরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। ক্লাস বর্জন ১৩/১০/২০২৫ তারিখ হতে কার্যকর ছিল। আর ঢাকায় আন্দোলনে সারাদেশ থেকে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে। ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি ভেঙে পরে। এবারের আন্দোলনে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীকরণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজিসহ শিক্ষক নেতারা সার্বক্ষণিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। এতে সাধারণ শিক্ষকরা বেশ উৎফুল্ল ও উৎসাহ নিয়ে সব সময় আন্দোলনে নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছিলেন। অতীতে শিক্ষকদের আন্দোলনে এমন স্বতঃস্ফূর্ততা কখনো দেখা যায়নি। এবার বেসরকারি শিক্ষকরা আন্দোলনে দল, মত ও নানা বিভাজনের উর্ধ্বে নিজেদের দাবীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় স্মারক নং ০৭.০০.০০০০.১৭৩.৩১.০৪৮.১০.২৬৩ মাধ্যমে আজ ২১/১০/২৫ তারিখে বাধ্য হলেন ৫% থেকে বাড়ি ভাড়া ১৫% বৃদ্ধি করতে। যদিও সরকার বাহাদুর এতে শর্তজুড়ে দিয়েছেন ০১/১১/২০২৫ তারিখ হতে ৭.৫ % কার্যকর হবে এবং আগামী বাজেটে অর্থাৎ ০১/০৭/২০২৬ তারিখ হতে ৭.৫% সহ মোট ১৫% কার্যকর হবে। বাকি দুটি দাবি ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ও কর্মচারীদের জন্য উৎসব ভাতা ৭৫% এ ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই! এতে হয়তো অনেক শিক্ষক ও কর্মচারীরা আশাহত হবেন। কিন্তু গত ১২ অক্টোবর হতে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত টানা নয়দিন আন্দোলনের মাঠে যারা ছিলেন তারা জানেন এ দাবি টুকু বাস্তবায়নে তারা কতো কষ্ট করেছেন, ত্যাগ শিকার করেছেন। ঘুম, গোছল, পরিবার ও আহার ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এ স্বীকৃতি। সুতরাং কিছুটা ক্ষোভ থাকলেও তাদের মধ্যে আনন্দও ছিলো। এ আনন্দ কষ্টের, এ আনন্দ দাবি পূরণের!
এবারের শিক্ষক আন্দোলনে দশ দিনের কর্মসূচিতে যা ছিলো-
১২/১০/২৫ অবস্থান কর্মসূচী জাতীয় প্রেসক্লাব
১৩/১০/২৫ অবস্থান কর্মসূচী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার
১৪/১০/২৫ লং মার্চ সচিবালয়
১৫/১০/২৫ ব্লকেড শাহবাগ
১৬/১০/২৫ লং মার্চ যমুনা
১৭/১০/২০২৫ অনশন পালন
১৮/১০/২০২৫ কালো পতাকা মিছিল
১৯/১০/২৫ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েত ও শিক্ষা ভবনের উদ্দেশ্যে ভুখা মিছিল
২০/১০/২৫ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ ও অবস্থান
২১/১০/২৫ শাহবাগে মাথায় কালো কাপড় বেঁধে মৌন মিছিলের কর্মসূচি পালন
গত ২০-২২ বছরে শিক্ষকদের এমন আন্দোলনের নজির ছিলো না। এসএসসি পরীক্ষাদের নির্বাচনী পরীক্ষা, অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও বার্ষিক পরীক্ষা খুব সন্নিকটে। টানা দশদিনের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এখন ক্লাসে ফেরার পালা। হয়তো শিক্ষক নেতারাও এমন ঘোষণাই দিবেন। সরকারের উচিত বাকি দুটি দাবির ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যাতে শিক্ষকরা বর্তমান উচ্চ বাজার মূল্যের দিনে নুন্যতম জীবন ধারণ থেকে বঞ্চিত না হন। জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই! এ আন্দোলনে শিক্ষকদের দাবি কতোটুকু পূরণ হলো সেটি বড় কথা নয়, তবে সমগ্র জাতি শিক্ষকদের জীবন ধারণ সম্পর্কে স্পষ্ট খোঁজ পেলো। হয়তো আগামী দিনে সরকার শিক্ষকদের জন্য করুণা করে নয়, যত্ন নিয়ে উদ্যোগ নিবে জীবনমান উন্নয়নের। আর এভাবেই দেশে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হবে। শিক্ষকদের আগামী দিনের দাবী হোক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই উপকৃত হবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর হবে।