
কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবনকে কেবল সাল-তারিখে বাঁধা যায় না। তাদের জীবনের প্রতিটি দিন একটি আলাদা অধ্যায়, প্রতিটি নিঃশ্বাস একটি সাক্ষ্য। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন মানুষ। তিনি কোনো একক রাজনৈতিক দলের সীমায় আবদ্ধ নন, তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক দীর্ঘ, কঠিন, রক্তাক্ত অথচ দৃঢ় অধ্যায়।
তার বিদায় কোনো আকস্মিক মুহূর্ত নয়। এটি যেন বহুদিনের ক্লান্তির অবসান। যেন দীর্ঘদিনের বোঝা নামিয়ে রাখার এক নীরব অনুমতি। তিনি বিদায় নিলেন এমন এক সময়ে, যখন তার জীবনের গল্পটি পূর্ণতা পেয়েছে, যেখানে বিজয় আছে, বেদনা আছে, অপমান আছে, কিন্তু পরাজয় নেই।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরু কোনো পরিকল্পিত ক্ষমতার বাসনা থেকে হয়নি। তার শৈশব কিংবা যৌবন তাকে রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত করেনি। তিনি প্রথমে ছিলেন একজন স্ত্রী, একজন গৃহিণী। নীরব, আড়ালে থাকা এক নারী। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার আগ পর্যন্ত তার পরিচয় ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে।
কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। ইতিহাস কাউকে প্রস্তুতির সময় দেয় না।
১৯৮১ সালের সেই রক্তাক্ত দিন, যেদিন জিয়াউর রহমান নিহত হন, সেদিন শুধু একজন রাষ্ট্রপতির মৃত্যু হয়নি, ভেঙে পড়েছিল একটি পরিবার, একটি নারীর নির্ভরতার জায়গা। সেই মুহূর্তে খালেদা জিয়া হারিয়েছিলেন তার জীবনসঙ্গীকে। কিন্তু ইতিহাস তার কাছে তখনই দাবি জানায় এই শোক নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।
স্বামীহারা জীবনের অসীম শূন্যতা বুকে নিয়েই তাকে নামতে হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। এটি কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল নয়, এটি ছিল দায়িত্বের, উত্তরাধিকারের এবং প্রতিরোধের ডাক।
বাংলাদেশের সমাজ তখনও নারীর নেতৃত্বকে সহজভাবে গ্রহণ করতে শেখেনি। রাজনীতি ছিল পুরুষদের একচ্ছত্র এলাকা। কঠোর, নিষ্ঠুর, ক্ষমাহীন। সেই অঙ্গনে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া শুধু বিরোধিতা করেননি, নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
এই অর্জন কেবল একটি সাংবিধানিক পদ নয়, এটি ছিল একটি মানসিক বিপ্লব। এটি প্রমাণ করেছিল, রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর সক্ষমতা কোনো অনুকম্পা নয়, বরং অধিকার।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শাসনকাল ছিল নানা টানাপোড়েনে ভরা। ক্ষমতার রাজনীতিতে তিনি যেমন দৃঢ় ছিলেন, তেমনই ছিলেন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু তিনি ছিলেন আপোষহীন বিশেষ করে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আধিপত্যবিরোধী মনোভাব। এটি তাকে যেমন জনপ্রিয় করেছে, তেমনই আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে করেছে অস্বস্তিকর।
তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে। এই অবস্থান তাকে কিংবদন্তী বানিয়েছে তার সমর্থকদের কাছে, আবার কঠোর সমালোচনার মুখেও ফেলেছে।
ইতিহাস বলে, যারা প্রশ্ন তোলে, তারাই শাসকের চোখে অপরাধী হয়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য তিনি আমৃত্যু অপরাজিত সাংসদ হিসেবে পরিচিত। এটি কেবল নির্বাচনী পরিসংখ্যান নয়, এটি ছিল জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রতীক।
জনগণ তাকে দেখেছে একজন শক্ত নারীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে, যিনি হার মানেন না, যিনি বারবার ফিরে আসেন।
ক্ষমতা বদলায়। রাষ্ট্র বদলায়। কিন্তু প্রতিহিংসা অনেক সময় থেকে যায়। খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হলো কারাবাস। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হয়েও তাকে দিনের পর দিন বন্দি থাকতে হয়েছে। অসুস্থ শরীর, চিকিৎসার সংকট, নিঃসঙ্গতা সবমিলিয়ে কারাগার তার জন্য ছিল এক নিষ্ঠুর পরীক্ষা।
কারাগারের দেয়াল যেকোনো অপরাধীর জন্য যেমন, একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্যও তেমনই নির্দয়। এই বন্দিদশা কেবল তার ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিহিংসাপূর্ণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
রাজনৈতিক আঘাত সহ্য করা যায়। কিন্তু সন্তানের শোক কোনো মতাদর্শ বোঝে না। খালেদা জিয়ার জীবনে সবচেয়ে গভীর ক্ষত রাজনীতি দেয়নি। দিয়েছে মাতৃত্ব। ছোট ছেলের মৃত্যু একজন মায়ের জীবনে সবচেয়ে অপ্রাকৃত ঘটনা। সন্তানকে কবর দিতে হয়, এই দৃশ্য কোনো রাষ্ট্রীয় পদে ঢেকে রাখা যায় না। আর বড় ছেলের দূর দেশে নির্বাসিত জীবন একটি জীবন্ত বিচ্ছেদ। সন্তানের মুখ দেখা যায় না, কন্ঠ শোনা যায় না, ছুঁয়ে দেখা যায় না- থাকে শুধু অপেক্ষা। এই বেদনা কোনো রাজনৈতিক মঞ্চে উচ্চারিত হয়নি, কিন্তু এটি তার চোখে জমে ছিল বছরের পর বছর।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধিতা শুধু নীতিগত ছিল না, তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেমে এসেছে বহুবার। অপবাদ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, চরিত্রহনন সবকিছুই ব্যবহার করা হয়েছে তাকে কোণঠাসা করার জন্য। তাকে অপর বানানো হয়েছে, ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সময় সবকিছু লেখে নতুন করে। তাই তার ইতিহাস লেখা হয়েছে সোনালী সুদিনের গান হিসেবে। অতঃপর সবাইকে ছেড়ে তিনি বিদায় নিলেন। ক্লান্ত জীবনের শেষ হলো। এখন তিনি ঘুমাবেন। স্বস্তির ঘুম। শান্তিতে নিথর দেহে নীরব হয়ে রবেন।
এই বিদায় কোনো হঠাৎ প্রস্থান নয়। এটি দীর্ঘ যাত্রার স্বাভাবিক সমাপ্তি। অবশেষে তিনি মুক্তি পেলেন, ক্ষমতা থেকে নয়, বরং অবিরাম লড়াই থেকে। তিনি মুক্তি পেলেন সেই বোঝা থেকে, যা একজন নারী, একজন মা, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তাকে বহন করতে হয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়া আজ ইতিহাসের পাতায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন সংগ্রামী নারীর প্রতীক হয়ে। তিনি প্রমাণ করেছেন নারী নেতৃত্ব মানে কোমলতা নয়, দৃঢ়তা। সংগ্রাম মানে শুধু জয় নয়, টিকে থাকা।
বেগম খালেদা জিয়ার গল্প শেষ হলেও তার নাম বাংলার বুকে চিরকাল বহমান থাকবে। কারণ ইতিহাস কখনো সংগ্রামী মানুষকে ভোলে না।
লেখক: অনুবাদক, লেখক ও কলামিস্ট।