
মোহাম্মদ ছিবগাতুল্লাহ
ঢাকা–মাওয়া–ভাঙ্গা রেলপথকে বলা হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের নতুন দিগন্ত। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে দ্রুতগতির ট্রেন ছুটে চলেছে খুলনা, যশোর, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জের দিকে। কিন্তু যে রেললাইন মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং, শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলার বুক চিরে গেছে, সেই এলাকার মানুষের জন্য আজও থামছে না ট্রেন।
সরকারি নথি অনুযায়ী লৌহজংয়ের মাওয়া, শ্রীনগরের শ্রীনগর ও সিরাজদিখানের নিমতলা—এই তিনটি স্টেশন নির্মাণ করা হলেও কোনো নিয়মিত যাত্রীবাহী বা আন্তঃনগর ট্রেন এখানে যাত্রাবিরতি দেয় না। ফলে উন্নয়নের প্রতীক হয়ে ওঠা এই রেলপথ স্থানীয়দের কাছে পরিণত হয়েছে বঞ্চনার প্রতীকে।
আরও পড়ুন: মুন্সিগঞ্জের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২২৬ টি প্রধান শিক্ষক পদ শুন্য
রেললাইন নির্মাণের জন্য মুন্সীগঞ্জের এসব এলাকায় হাজার হাজার মানুষ বসতভিটা ও আবাদি জমি ছেড়েছেন। অনেকে ক্ষতিপূরণ পেলেও হারানো শেকড় আর ফিরে পাননি। প্রকল্প ঘোষণার সময় বলা হয়েছিল, এই রেলপথ স্থানীয় যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করবে এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়াবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ট্রেন ছুটে যাচ্ছে—থামছে না।
লৌহজংয়ের মাওয়া স্টেশন পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও সেখানে কোনো আন্তঃনগর ট্রেন থামে না। শ্রীনগর স্টেশন দাঁড়িয়ে আছে নীরব ও পরিত্যক্ত অবকাঠামো হিসেবে। সিরাজদিখানের নিমতলা স্টেশন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
এই তিন উপজেলার মানুষের জীবন ও জীবিকা ঢাকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কাজ, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াত করেন। কিন্তু রেলসেবার সুবিধা না থাকায় তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে সড়কপথের ওপর, যেখানে যানজট ও সময়ক্ষেপণ নিত্যদিনের বাস্তবতা।
স্থানীয়দের দাবি, দূরপাল্লার ট্রেন নয়—ঢাকা–মাওয়া রুটে কমিউটার বা লোকাল ট্রেন চালু করা হলে এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।
রেলওয়ের প্রাথমিক পরিকল্পনায় একসময় লোকাল বা শাটল ট্রেন চালুর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ থাকলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে মুন্সীগঞ্জের মানুষ অনুভব করছেন, এই রেলপথ তাদের জন্য নয়—তারা কেবল অন্যদের জন্য পথ তৈরি করে দিয়েছেন।
এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে সম্প্রতি স্থানীয়রা মানববন্ধন করেছিলেন। ব্যানারে লেখা ছিল— “আমাদের জমির উপর দিয়ে রেল যায়, কিন্তু আমরা সুফল পাই না।”
এক বয়স্কা নারী বলেন, “সরকার বলেছিল উন্নয়ন হবে। আমরা জমি ছেড়ে দিয়েছি, ঘর হারিয়েছি। কিন্তু আজ দেখি, আমাদের জন্য কিছুই নেই।”
স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে মানুষের দাবি স্পষ্ট- লৌহজংয়ের মাওয়া স্টেশন কার্যকর করা, শ্রীনগর স্টেশনে অন্তত কিছু যাত্রীবাহী ট্রেন থামানো, নিমতলা স্টেশনকে লোকাল বা শাটল ট্রেনের জন্য ব্যবহার, ঢাকা–মাওয়া রুটে কমিউটার ট্রেন চালু
কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা স্থানীয় মানুষের জীবনকে সহজ করে। নইলে মুন্সীগঞ্জের মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত এই কথাই সত্য হয়ে থাকবে “আমাদের জমির উপর দিয়ে রেল যায়, কিন্তু আমাদের জন্য নয়।”