
ভোটার টানতে ইমাম কনফারেন্সেই আস্থা?
ত্বাইরান আবির
মুন্সিগঞ্জে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত, তখন ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে প্রশাসন। একদিকে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, অন্যদিকে ভোটারদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ইমাম কনফারেন্স। এই দুই বিপরীত চিত্রের মাঝেই প্রশ্ন উঠছে, মুন্সিগঞ্জে ভোটের পরিবেশ কি আদৌ স্বস্তিদায়ক হচ্ছে নাকি সংকট আরও গভীর হচ্ছে?
সাম্প্রতিক সময়ে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলায় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা রাজনৈতিক অস্থিরতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় কোন্দলের গভীরতা স্পষ্ট করে তুলেছে । স্থানীয়রা বলছেন, এসব সংঘর্ষ শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন ও চলাচলেও।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম বলেছেন, ‘নির্বাচন এলেই এলাকায় উত্তেজনা বাড়ে। দোকানপাট আগেভাগেই বন্ধ করতে হয়। এতে ভোট দিতে যাওয়ার আগ্রহ অনেকেরই কমে যাচ্ছে।’
মুন্সিগঞ্জে ভোটার উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে কম উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন মহলে। রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা-হামলা ও সংঘর্ষের কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয় কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই প্রেক্ষাপটে ভোটারদের সচেতন ও উৎসাহিত করতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জে একটি ইমাম কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। কনফারেন্সে জেলার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও ধর্মীয় নেতারা অংশ নেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ধর্মীয় নেতারা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তারা যদি শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন, তাহলে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে পারে ।
কনফারেন্সে বক্তারা ভোট দেওয়া নাগরিক দায়িত্ব- এমন বার্তা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়। এসময় জেলা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ভোটাররা যেন ভয় না পায়, এটাই আমাদের লক্ষ্য। ধর্মীয় নেতারা সমাজে আস্থার জায়গা, তাদের মাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।’
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, কেবল ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভোটার অনীহা দূর করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, মূল সমস্যা হলো রাজনৈতিক সহিংসতা ও আস্থার সংকট। এগুলোর সমাধান না হলে ইমাম কনফারেন্স দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।
রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সিরাজদিখানে একটি ভাড়া বাসা থেকে মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গোটা জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এটি সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়, তবে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এই ঘটনা। এ ব্যাপারে স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন, ‘এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে রাতে ঘুম আসে না। তার ওপর চারপাশের হানাহানি দেখলে ভোটের দিন কেন্দ্রে যেতে আরও ভয় লাগবে।’
মুন্সিগঞ্জে ভোটের পরিবেশ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে- রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং ভোটারদের আস্থা। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সহিংসতা প্রশাসনের উদ্যোগকে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। অন্যদিকে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ছাড়া শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে স্থানীয় একজন শিক্ষক বলেছেন, ‘ভোটাররা এখন শুধু কথা শুনে বিশ্বাস করতে চায় না। তারা মাঠে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়।’
সবমিলিয়ে প্রশ্ন এখন- সামনে কী হবে? বিশ্লেষকদের মতে, ইমাম কনফারেন্স একটি তাৎক্ষণিক ও কৌশলগত উদ্যোগ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ভোটার আস্থা ফেরাতে হলে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ, সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত এবং ভোটকেন্দ্রে দৃশ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। তা না হলে ধর্মীয় আহ্বানও হয়তো ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে পারবে না।
মুন্সিগঞ্জের ভোটের রাজনীতি এখন দাঁড়িয়ে আছে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। সংঘাতের রাজনীতি ও শান্তির আহ্বানের মাঝখানে সাধারণ ভোটার কোন পথে হাঁটবেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।