
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সফলতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের দমনমূলক ও একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশের জনগণ এখন স্বপ্ন দেখছে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার, যেখানে তাদের ভোটাধিকার সুরক্ষিত এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য। তাই ২০২৬ সালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্রের পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু কেমন নির্বাচন দেখতে চায় জনগণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমানের আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশাগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এই কলামে আমি সেইসব প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় তথ্য, যুক্তি ও প্রাসঙ্গিক রেফারেন্সসহ একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরবো।
১। একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেন প্রয়োজন?
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা একটি বিতর্কিত ইস্যু। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পেছনে মূল কারণ ছিল দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন অসম্ভবের ধারণা। দুর্ভাগ্যবশত, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা পরবর্তীতে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের মতো বিতর্কিত নির্বাচনের জন্ম দেয়। এই নির্বাচনগুলো জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার পথ প্রশস্ত করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের সবচেয়ে জোরালো দাবি হলো, ২০২৬ সালের নির্বাচন যেন কোনো দলীয় সরকারের অধীনে না হয়। জনগণ চায় একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও স্বল্পমেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (যা ইতোমধ্যেই গঠিত হয়েছে), যার প্রধান কাজ হবে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। এই সরকারের মূল দায়িত্বগুলো হবে-
> রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা- পুলিশ, র্যাব, প্রশাসনসহ সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে তাদের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা।
> রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধ করা- বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর থেকে সব ধরনের হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক সমাবেশ ও কার্যক্রমে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া।
> গণমাধ্যমের স্বাধীনতা- সরকারি ও বেসরকারি সব গণমাধ্যম যেন পক্ষপাতিত্বহীনভাবে সংবাদ প্রচার করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ শিখেছে, ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নিজেদের পক্ষে জনমত তৈরি করে। তাই একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে পারে।
২। শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন- কেবল আইন নয়, প্রয়োজন বাস্তব প্রয়োগ
অবাধ নির্বাচনের জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন (ইসি) অপরিহার্য। যদিও আমাদের সংবিধানে ইসির স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি ইসি প্রায়শই ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে কাজ করেছে। জনগণ চায় ২০২৬ সালের নির্বাচনে এমন একটি ইসি থাকুক, যারা সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন ও নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত।
এর জন্য কিছু মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন:
১। নিয়োগ প্রক্রিয়া- রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সার্চ কমিটির মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারদের নিয়োগ দিতে হবে। এই কমিটিতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের সম্মানিত ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
২। প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা- ইসিকে নিজস্ব বাজেট ও জনবল ব্যবহারের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে তারা সরকারের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।
৩। আইনের কঠোর প্রয়োগ- ইসিকে নির্বাচনের সময় যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে, এমনকি যদি সেটি ক্ষমতাশীন দলের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেও হয়।
জনগণ চায় ইসি যেন শুধু নিয়ম নীতির প্রতিষ্ঠান না হয়ে জনগণের ভোটাধিকারের প্রকৃত অভিভাবক হয়ে ওঠে।
৩৷ জনগণের ভোটাধিকার ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা
গণঅভ্যুত্থানের একটি প্রধান কারণ ছিল জনগণের ভোটাধিকারের প্রতি চরম অবহেলা। মানুষ ভোট দিতে পারেনি। ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল প্রভাবশালীদের দখলে এবং ব্যালট বাক্স ভরা হয়েছিল রাতের আঁধারে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জনগণ এই চিত্র দেখতে চায় না। তারা চায়-
> ভোটকেন্দ্রে অবাধ প্রবেশাধিকার- প্রতিটি ভোটার যেন কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে।
> আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা- ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা যেন নির্দলীয়ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে।
> প্রযুক্তিগত সমাধান- ভোট কারচুপি রোধে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) বা বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পরীক্ষা করা আবশ্যক।
জনগণ কেবল ভোট দিতে চায় না, বরং তাদের দেওয়া ভোট যেন সঠিকভাবে গণনা হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।
৪। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা
একটি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার স্বচ্ছতার ওপর। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিগত বছরগুলোতে অনেক দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থার সরকারের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে, আবার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ারও নজির আছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে জনগণ চায়-
> দেশীয় পর্যবেক্ষক- নিরপেক্ষ ও যোগ্য দেশীয় পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হোক।
> আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক- আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর পর্যবেক্ষক মিশনকে অবাধে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হোক।
> গণমাধ্যমের পর্যবেক্ষণ- সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদের যেন ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে ছবি তোলা ও সংবাদ সংগ্রহের অবাধ সুযোগ থাকে।
৫। নির্বাচনী সংস্কার ও ভবিষ্যতের গণতন্ত্র
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি নতুন সুযোগ নিয়ে এসেছে। এখন সময় এসেছে নির্বাচনী ব্যবস্থায় কিছু মৌলিক সংস্কার আনার, যা ভবিষ্যতের জন্য টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করবে। এর মধ্যে থাকতে পারে-
> রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন- রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে। দলের নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে পরিবারতন্ত্র বা স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন নেতৃত্বের বিকাশ না ঘটে।
> নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ- নির্বাচনকে অর্থ ও পেশীশক্তির প্রভাবমুক্ত করতে নির্বাচনী ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
> স্থানীয় সরকার নির্বাচন- স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় প্রতীকের বাইরে রাখতে হবে, যাতে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীরা নির্বাচিত হতে পারেন।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্নের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, হতাশা ও ভোটাধিকার হারানোর যন্ত্রণার পর জনগণ এখন একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, সব দলের জন্য সমান সুযোগ এবং ভোটকেন্দ্রের পূর্ণ নিরাপত্তা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে জনগণ একতাবদ্ধ হলে কোনো স্বৈরাচারী শক্তি টিকে থাকতে পারে না। এখন তাদের প্রত্যাশা, নতুন রাজনৈতিক শক্তি তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি নির্বাচন উপহার দেবে, যা শুধু ২০২৬ সালের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
লেখক- ত্বাইরান আবির, লেখক ও অনুবাদক