
আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী অনেক, জনপ্রিয় কারা?
ত্বাইরান আবির
মুন্সিগঞ্জ জেলা ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি অঞ্চল যেখানে গত কয়েক নির্বাচনে বিরোধী দল ও ক্ষমতাসীন দলের ভারসাম্যহীন শক্তি বিকাশ লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই তিনটি আসন রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ বরাবরের মতো এখানে বিএনপি ও ইসলামি দল/জোট শক্তিশালী।
গত হওয়া মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের শেষ দিনে জেলায় ২৩ প্রার্থী থেকে ৪ জন সরে দাঁড়ালেন, ফলে মোট ১৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এই পরিবর্তিত প্রতিযোগিতার কাঠামোই এখন পুরো নির্বাচনী চিত্রকে নির্ধারণ করছে। মুন্সিগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) আসনে চলছে ভোটব্যাংক ও লড়াইয়ের ঘূর্ণি। এখানকার প্রার্থী ও তাদের রাজনৈতিক ধরন ও অবস্থান সম্পর্কে চলুন জানা যাক। শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তিনি জেলা ও উপজেলার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয়, দলীয় ভিত্তিতে বড় ভোটব্যাংক রয়েছে তার। এ কে এম ফখরুদ্দিন রাজী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি- তার রয়েছে ইসলামি জোটের শরিক, তিনি ধর্মানুভূতিপূর্ণ ভোটার তৈরি করতে সক্ষম। মোঃ আতিকুর রহমান খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ- বিশেষ করে গ্রামের ধর্ম-নীতি-ভিত্তিক ভোটারদের কাছে প্রভাব রয়েছে তার। আব্দুর রহমান, কমিউনিস্ট পার্টি অফ বাংলাদেশ- নগর ও শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে কিছুটা টিকে আছে তার দল। মীর সরফত আলী সপু (প্রত্যাহার করেছেন মনোনয়ন)- বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, দলে লড়াইয়ের সমীকরণে বিভাজন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। মোহাম্মদ মমিন আলী, রোকেয়া আক্তার- স্বতন্ত্র/ছাত্র-নারী ভোটারদের আবেদন করতে পারেন তারা। মুন্সিগঞ্জ-১ আসন বিএনপি ও ইসলামি জোট-সমর্থিত বিরোধী শিবিরের জন্য ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী। তবে এইবারের নির্বাচনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় মনোনয়ন পেয়ে আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে দলীয় ভোটারদের ঐক্যকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একইসাথে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইসলামি দল-সমর্থিত রাজীর উপস্থিতি সিটি ও গ্রামের ভোটারদের মধ্যে প্রতিযোগিতাকে কঠিন করে তুলেছে।
এখানে বিএনপির ভোটার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অংশের মধ্যে শক্ত, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও স্ট্যাটাস কোয়ালিটি নিয়ে তাদের ভোটাররা সচেতন। বিপরীতে, ইসলামি জোটের ভোটার ধর্মনির্ভর সামাজিক ইস্যুতে দৃঢ়, ধর্মমতের প্রভাব এই আসনে বেশি কাজ করে। এর বাইরে স্বতন্ত্র/কমিউনিস্ট ভোটার নগর অঞ্চলের যুব, শিক্ষিত জনতার মাঝে কিছুটা টিকে আছে, কিন্তু মূল লড়াই দল-ভিত্তিক ভোটারদের মধ্যে।
এই মিলিত অবস্থার কারণে মুন্সিগঞ্জ-১ আসনে ভোট বিভাজনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং কোন প্রার্থী দলের মোট ভোট কত ভাগে ভাগ পাবে তা এই অঞ্চলের ভোটদাতাদের অনুভূতি নির্ধারণ করবে।
এবার আসা যাক মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের প্রসঙ্গে। মুন্সিগঞ্জ-২ (টঙ্গিবাড়ী-লৌহজং) আসনে বিরাজ করছে স্থিতিশীলতা। এখানেও রয়েছে বিভিন্ন দলের প্রার্থী। চলুন তাদের বিষয়ে জেনে নেই।
আব্দুস সালাম আজাদ, বিএনপি- তিনি দলটির চূড়ান্ত প্রার্থী, দলের মতে সর্বোচ্চ ভোট ও সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
মাজেদুল ইসলাম, জাতীয় নাগরিক পার্টি- ইসলামী জোটের অংশীদার হিসেবে ভোটে জেতার চেষ্টা করবেন তিনি, কিন্তু অন্যদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রভাব এখানে নেই। কে এম বিল্লাল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ- ধর্ম-ভিত্তিক ভোটারের কাছে তার আবেদন থাকবে। আশিক মাহমুদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ- ধর্ম-সাজানো ইস্যুতে নিজের ভূমিকা রাখতে পারেন। মোঃ নোমান মিয়া, জাতীয় পার্টি (জাপা)- ক্ষুদ্র দলের ভেন্যু হলেও কিছু প্রভাব রয়েছে, দলীয় সংগঠন শক্ত।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামি ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা দলীয় সমঝোতার কারণে সরে দাঁড়িয়েছেন।
মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির শক্ত অবস্থান বিশ্লেষকরা দেখছেন। কারণ দলের কেন্দ্রীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে স্থানীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি চালাচ্ছেন এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে জনসমর্থন পাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামি ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা দলীয় সিদ্ধান্তে সরে দাঁড়ানোর ফলে বিএনপির পক্ষে কাজ সহজ হয়েছে এবং বিরোধী শিবিরের ভোট বিভাজন কিছুটা কম হবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ও নেতাদের ‘ভোটে জয়’ এর বার্তা ভোটারের মনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।
ইসলামী দলের অনানুষ্ঠানিক সমর্থক কিছু ভোটার ধর্ম-ভিত্তিক ইস্যুতেও তাদের পাশে থাকতে পারে, তবে দলীয় প্রতীক না থাকায় তাদের ভোট বিএনপির দিকে ঝোঁক পেতে পারে।
অন্য ছোট সংগঠন ও স্বাধীন প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটের অবসাদ সৃষ্টি করতে পারে, তবে মূল লড়াই হবে বিএনপির সঙ্গে বিরোধী মহলের।
এদিকে মুন্সিগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসন ইতোমধ্যেই দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংঘাতের আসন হিসেবে। এখন এই অঞ্চলের প্রার্থী ও তাদের রাজনৈতিক ধরন নিয়ে জানা যাক।
মোঃ কামরুজ্জামান রতন, বিএনপি- জেলা ও কেন্দ্রীয় স্তরে দীর্ঘ রাজনৈতিক কার্যক্রম রয়েছে তার, বিএনপির শক্ত ভোটব্যাংক হাতে রাখতে সক্ষম তিনি।
মোঃ মহিউদ্দিন, স্বতন্ত্র- তিনি জেলা বিএনপির সদস্য সচিব, দলীয় মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করছেন, এতে বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সুমন দেওয়ান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ- ধর্ম-ভিত্তিক ভোটারদের কাছে আবেদন করার চেষ্টা করছেন তিনি। শেখ মোঃ কামাল হোসেন, কমিউনিস্ট পার্টি- বাম-সমর্থক ও শিক্ষিত ভোটারদের অংশ, সামান্য ভোট নিতে পারেন তিনি। শেখ মোঃ শিমুল, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি- শ্রমজীবী ও যুব ভোটারদের কাছে কিছুটা আবেদন রয়েছে। মোঃ আরিফুজ্জামান (দিদার), জাতীয় পার্টি- দলের ঐতিহ্য রয়েছে, এটাই মূল সম্পদ।
আনিছ মোল্লা, বাংলাদেশ লেবার পার্টি- শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে কিছু প্রভাব রয়েছে।
মুন্সিগঞ্জ-৩ এইবারের অন্যতম হটস্পট হিসেবে বিবেচিত। এখানে বিএনপির ভেতরে বিভাজন ঘটে গেছে। দলীয় প্রার্থী রতনের বিপরীতে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করায় ভোট বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়াও ইসলামী দল ও বাম-সমর্থিত দলগুলো আলাদাভাবে প্রচারণা চালানোর ফলে ভোটের ফলাফলে বিভাজনের মাত্রা বাড়ছে।এখানে বিএনপির ভোটব্যাংক ঐতিহ্যগতভাবে শক্ত, তবে দলভিত্তিক বিভাজন রতন ও মহিউদ্দিনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারে।ইসলামী অভিযানকারী ভোটার ধর্ম-সম্মত ইস্যুতে কিছু ভোট ভাগ নিতে সক্ষম।
ছোট ও বাম দলগুলোর ভোটার তরুণ, শ্রমজীবী ও শিক্ষিত অংশের মধ্যে। তারা একটি নির্দিষ্ট অংশের মনোযোগ পেতে পারে।
মুন্সিগঞ্জের ভোটাররা এই নির্বাচনে নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুকে সামনে রেখেছেন- ১। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মৌলিক সেবা- বেতন-মজুরি, স্বাস্থ্যে উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ৷ ২। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা- নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটাররা বৃহত্তর নিরাপত্তা চান এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা চান। ৩। ধর্ম-সম্মান ও সামাজিক মূল্যবোধ- ইসলামি ও ধর্ম-সহমতের ইস্যুগুলোও ভোটের গন্তব্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
৪। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা- দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনা শেষে স্থিতিশীল সরকার গঠনের প্রত্যাশা।
এই ইস্যুগুলো ভোটারদের মধ্যে ‘যে প্রার্থী তাদের জীবনমান উন্নত করতে পারবে’ এমন বার্তা বেশি ধরে রাখছে। সরকারি-প্রতিপক্ষ রণনীতির বাইরে বিএনপি ও ইসলামি-সমর্থিত প্রার্থীরা ধর্ম-সম্মত ও সামাজিক ন্যায়-সম্মত ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, আর বিরোধী শিবিরের ভেতরে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা স্থানীয় ইস্যুগুলো তুলে ধরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। সার্বিকভাবে, এই তিনটি আসনে ভোটব্যাংক পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দলগুলোর কোন্দল, ধর্ম-নৈতিক উদ্বেগ ও স্থানীয় নেতাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার উপর নির্ভর করছে। যেহেতু এই অঞ্চলে তৃতীয় কোন পক্ষ জাতীয়ভাবে শক্ত নয়, তাই ভোট বিভাজন হলে কোনো প্রার্থী সরাসরি বিজয়ী হওয়া কঠিন হতে পারে এবং জোট/একক সংঘর্ষ ও ভোট বিভাজন ফলাফলে মূল ভূমিকা রাখবে। এখানে কোন প্রার্থী ঠিকভাবে সর্বোচ্চ ভোট পাবে তা বলা পূর্বাভাস ছাড়া কঠিন। কারণ এখানে ভোট বিভাজন, স্বতন্ত্র প্রার্থী, ধর্ম-ভিত্তিক মনোভাব ও দলীয় সংগঠন-সমর্থন একসাথে নানান দিক নির্দেশ করছে। তবুও যা বলা যায়- মুন্সিগঞ্জ-১ এ বিএনপি ও ইসলামি দল-সমর্থিত ভোটারের মাঝে বিভাজন বেশি, যদি বিএনপি ঐক্য ধরে রাখতে পারে, তারা এগিয়ে থাকতে পারে। মুন্সিগঞ্জ-২ এ বিএনপির পক্ষে মাঠ খুব স্থিতিশীল এবং দলের ঐক্য এখানে ফলাফল গড়ার সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। মুন্সিগঞ্জ-৩ এ ভোট বিভাজন সবচেয়ে বেশি, বিএনপিকেন্দ্রিক বিভাজন ও ধর্ম-ভিত্তিক ভোট ট্রেন্ড এখানে ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
মুন্সিগঞ্জ জেলার তিনটি আসনে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন রাজনৈতিক, ধর্ম-নৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে প্রতিযোগিতামূলক হবে। এখানে বিএনপির ভোটের ধার এখনও শক্ত, তবে দলীয় বিভাজন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি রাজনৈতিক সমীকরণকে জটিল করে দিচ্ছে। ধর্ম-ভিত্তিক ভোটাররা ইসলামী দলগুলোর প্রার্থীকে কিছুটা সমর্থন দিচ্ছেন এবং কমিউনিস্ট/বাম-সমর্থিত প্রার্থীরাও কিছু নির্দিষ্ট ভোট সেক্টরকে আকর্ষণ করছে।
সবমিলিয়ে মুন্সিগঞ্জে ২০২৬ সালের নির্বাচন একটি ফটকা-পরীক্ষার মতো, যেখানে যেই দল/প্রার্থী সবচেয়ে বেশি সংগঠনগত ঐক্য ও ভোটার-প্রত্যাশা বুঝে নিতে পারবে, সে জয় নিশ্চিত করতে পারবে।