
ত্বাইরান আবির
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে নজর আবারও পড়েছে মুন্সিগঞ্জ জেলার তিনটি আসনের দিকে- মুন্সিগঞ্জ-১ (সিরাজদিখান-শ্রীনগর), মুন্সিগঞ্জ-২ (লৌহজং-টংগিবাড়ী) এবং মুন্সিগঞ্জ-৩ (মুন্সিগঞ্জ সদর- গজারিয়া)। ভূগোল, অর্থনীতি, ইতিহাস, ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক ট্রেন্ড- সবমিলিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে এই তিন আসনের ভূমিকা বরাবরই আলাদা গুরুত্ব বহন করে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা মহানগর ঘেঁষা এই জেলা শুধু ভোটের হিসাবেই নয়, বরং মূলধারার দল, রাজনৈতিক পরিবার, ক্ষমতাসীন কোরের ক্যালকুলেশন ও বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায়ও প্রভাব ফেলে। মুন্সিগঞ্জের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝার প্রথম কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র হাতের নাগাল দূরে নদীবাহিত, ফ্লাইওভার, সেতু, হাইওয়ে, মেট্রোর ঘনিষ্ঠ সংযোগে জেলা হিসেবে মুন্সিগঞ্জ ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক করিডর ও নির্বাচনকালীন কৌশলগত পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনী পরিচালনা, প্রচার-প্রচারণা, গণমাধ্যম নজরদারি ও কেন্দ্রীয় দলের প্রত্যক্ষ প্রভাব এখানে দ্রুত কার্যকর হয়। ফলে এই তিন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায় সবসময়ই কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে একসূত্রে বাঁধা। মুন্সিগঞ্জ-১, ২ ও ৩ এর ভোটার গঠনও বৈচিত্র্যময়। শহর, আধা-শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের মিশ্রণে ভোটের মনস্তত্ত্ব কখনোই একমুখী নয়। কোথাও উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্ধারক, কোথাও রাজনৈতিক আনুগত্য, আবার কোথাও পরিবারিক-বংশীয় রাজনীতি ভোটের প্যাটার্ন ঠিক করে দেয়। ফলে এই জেলাকে রাজনৈতিক পরীক্ষাগার বললেও অত্যুক্তি হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে এই তিন আসন মূলত বড় দলের করিডরে থেকেছে। ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী শিবির, এমনকি স্বতন্ত্র বা ছোট দলের প্রার্থী-সবাই এই এলাকায় নিজেদের রাজনৈতিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের সুযোগ খোঁজে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের সফর, মিটিং-মিছিল, তদারকি ও কর্মী সংগঠনের মধ্যে প্রত্যক্ষ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনী মাঠে কার পক্ষে বাতাস বইছে তা বোঝার একটি সূচক হিসেবেও মুন্সিগঞ্জ ব্যবহৃত হয়েছে পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে। এ কারণে দলীয় মনোনয়নের লড়াইও এখানে কখনো হালকা হয় না। টেনশন দেখা যায় তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত। নাম, প্রভাব, পদ, পরিবার, জনপ্রিয়তা, সামাজিক শক্তি-সবকিছু মিলিয়ে মনোনয়ন তালিকা তৈরির সময় রাজধানীর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই তিন আসন। মুন্সিগঞ্জ-১, ২ ও ৩ রাজনৈতিক পরিবার ও বংশের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য। এখানকার ভোটে বংশীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। কয়েক দশক ধরে স্থানীয় নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর রাজনীতির গতি, কেন্দ্রীয় কমান্ড ও জেলা-উপজেলা ক্ষমতার ভাগাভাগি এই তিন আসনকে শক্তিশালী রাজনীতিবিদদের গড়ে ওঠার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ফলে নতুন মুখ আসলেও তাদের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায় দীর্ঘ দিনের শক্তিশালী পরিবারগুলো। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনীতিতে পরিবারিক উত্তরাধিকারের উপস্থিতি যখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন সেই অঞ্চলে ভোট আচরণ শুধু দলভিত্তিক থাকে না, বরং ব্যক্তি, বংশ ও ঐতিহাসিক রেফারেন্সও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে।
মুন্সিগঞ্জের অর্থনীতিও রাজনৈতিক গুরুত্বে ভূমিকা রাখে। ঢাকার বানিজ্য-শিল্প অঞ্চল, রিকন্ডিশন বাজার, সেতু-হাইওয়ে করিডর, নৌ-বাণিজ্য ও জমি-বিনিয়োগ সব মিলিয়ে এই জেলার অর্থনৈতিক বাস্তবতা জাতীয় অর্থনীতি ও রাজনীতিকে স্পর্শ করে। বিশেষ করে প্রবাসী ও ব্যবসায়ী ভোট এই তিন আসনে কার্যকর। উন্নয়ন, অবকাঠামো ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে প্রভাব তৈরি করতে পারে, যা জাতীয় ভোটের বিশ্লেষণে গুরুত্ব পায়।
বিরোধী দলের জন্যও (মূলত বিএনপি, জাতীয় পার্টি অথবা স্বতন্ত্র জোট) মুন্সিগঞ্জকে অনেক সময় বলা হয় পরীক্ষার মাঠ। কারণ এখানে বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক শক্তি ও জনমতের বাস্তব পরীক্ষা তুলনামূলক সহজ হয়। কেন্দ্রীয় দমন-নিয়ন্ত্রণ বা প্রচারণা ব্যালেন্স থাকায় মাঠের ভোট প্রবণতা, জনমত, সংগঠনের কার্যকারিতা ও নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্ট হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কৌশল যেমন এখানে দেখা যায়, তেমনি বিরোধীদের জনমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে ভবিষ্যতের ক্যালকুলেশনও বোঝা যায়। ফলে ভোটের ফলাফল ছাড়াও নির্বাচনী গতিমুখ পুরো ঢাকার রাজনীতিতে পড়তে থাকে।
সিরাজদিখান-শ্রীনগর থেকে লৌহজং-টংগিবাড়ী এবং সদর-গজারিয়া পর্যন্ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্পের চিত্রও জাতির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সিম্বল তৈরি করেছে। পদ্মাসেতু, আঞ্চলিক সড়ক ও সেতু-সংযোগ, নদী-নকশা, জমি ও শিল্পের পরিবর্তন এখানে ভোটার মানসিকতায় নতুন ধরনের রাজনীতি জন্ম দিয়েছে, যা উন্নয়নমূলক রাজনীতির আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।
শেষ কয়েকটি নির্বাচনে দেখা গেছে মুন্সিগঞ্জের ভোটাররা দল,ব্যক্তি, প্রতিশ্রুতি এবং উন্নয়ন এই চারটি বিষয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও রাজনৈতিক আনুগত্য এখনও প্রভাবশালী, কিন্তু তরুণ ভোটার, প্রবাসী পরিবার ও শহরমুখী অর্থনীতির কারণে ভোটের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আসছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই পরিবর্তন ঢাকার আশপাশ অঞ্চলে ভবিষ্যতের ভোট প্যাটার্নের ইঙ্গিত দেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় নেতৃত্বের চোখ কেন এখানে? কারণটি সহজ- মাঠের ক্ষমতা, প্রচারণা, সংগঠন, পরিবারিক রাজনীতি, তরুণ ভোটার, অর্থনৈতিক প্রভাব ও ঢাকাকেন্দ্রিক তত্ত্ব সবকিছু মিলিয়ে এই তিন আসন জাতীয় রাজনীতির মাইক্রোকসম। এখানে যা হয়, তা ঢাকার রাজনীতি বুঝতে কাজে লাগে। ফলে প্রতিটি নির্বাচনেই এখানে কেন্দ্রীয় ‘দৃষ্টি’ থাকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে যে নির্বাচনই হোক, মুন্সিগঞ্জ-১, ২ ও ৩ আবারও জাতীয় গণমাধ্যমে আলোচনায় থাকবে। দলীয় মনোনয়ন, বিরোধীদের অবস্থান, উন্নয়ন রাজনীতি, প্রবাসী ফ্যাক্টর, তরুণ ভোটার, রাজনৈতিক পরিবার সব মিলিয়ে এই জেলা ২০২৬-৩০ সময়কালের জাতীয় রাজনীতির ট্রেন্ড বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা দেবে। কারণ বাংলাদেশে ভোট শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটি ক্ষমতার ভাষা, মনস্তত্ত্বের বয়ান এবং ভবিষ্যতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভিত্তি।