
শোভন সারোয়ার:
বাংলার ইতিহাসে অতীশ দীপঙ্কর শ্রেষ্ঠ জ্ঞানসাধকদের একজন। যিনি শুধু ভারতেই নয়, সমগ্র এশিয়ার বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম পরিব্রাজকদের একজন। তার জন্ম ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রাচীন বিক্রমপুরে বজ্রযোগিনীতে (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায়)। এই বিক্রমপুর অঞ্চল ছিল তৎকালীন উপমহাদেশে বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
অতীশ দীপঙ্কর তাঁর বাল্যকালেই অসাধারণ মেধা ও জ্ঞানপিপাসার পরিচয় দেন। নালন্দা এবং বিক্রমশীলা মহাবিহারে অধ্যয়ন করে তিনি বৌদ্ধ দর্শনের নানা শাখায় বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। শীল, সমাধি এবং প্রজ্ঞার সংমিশ্রণে তাঁর চিন্তাধারা তৈরি হয়েছিল গভীর আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদী বোধে সমৃদ্ধ।
১১শ শতকে তিব্বতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতার সময়ে তিব্বতের রাজা জ্যাংচুব ও (Jangchub) অতীশ দীপঙ্করকে তিব্বত আমন্ত্রণ জানান। তিব্বতে যাওয়ার ব্যাপারে অতীশের আগ্রহ ছিল না। রাজা এশেওদের তরফ থেকে প্রথম দফায় আমন্ত্রণের পর তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অনেক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে রাজদূত মার-পা সহ অনেক অনুসারী বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে অতীশকে তিব্বতে নিয়ে যান।
তিনি তিব্বতে গিয়ে “লোকজ্যুং” (তিব্বতের নবজাগরণ) নামক ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। সেখানে তিনি “বোধিপথ প্রদীপ” (Bodhipathapradīpa) নামক একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন, যা আজও মহাযান বৌদ্ধ দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
তিব্বতে অতীশ দীপঙ্করের আগমন এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করে। তিব্বতিরা তাকে ‘অদ্বিতীয় গুরুরূপে’ গণ্য করা শুরু করে। তাঁর শিষ্য ড্রোমটনপা (Dromtönpa) পরে কাদাম্পা মতবাদের সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে গেলুগ্পা মতের ভিত্তি গড়ে তোলে। এই ধারার সর্বাপেক্ষা খ্যাতিমান প্রতিনিধি ছিলেন দালাইলামারা।
বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য জীবনের শেষ পর্বে তিব্বত থেকে আর দেশে ফিরতে পারেননি অতীশ। ১৯৭৮ সালে তাঁর দেহাবশেষ চীন থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দেশে আনা হয়।
অতীশ দীপঙ্করের জীবনের এই অসাধারণ যাত্রা বাংলার বিক্রমপুর থেকে শুরু হয়ে তিব্বতের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে রূপ নেয়। বিক্রমপুরের সন্তান অতীশ দীপঙ্কর প্রমাণ করেছিলেন, এক জনপদের জ্ঞানচর্চা ও মানবকল্যাণমূলক দর্শন কিভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আজও তিব্বতের মানুষ বিনম্র চিত্তে স্মরণ করে এই জ্ঞানতীর্থযাত্রীকে, যিনি ছিলেন জ্ঞানের দীপ—‘দীপঙ্কর’।
লেখক : সাংবাদিক ও অফিস সম্পাদক, ঝিকুট ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় পরিষদ।