
আতিকুর রহমান নয়ন
সম্প্রতি দেশের রাজনীতিতে বড় দুটি প্রশ্ন ছিল— নির্বাচন কবে হবে এবং তারেক রহমান কবে স্বদেশে ফিরবেন। নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত দুইদিনে এই দুটি প্রশ্নেরই উত্তর মিলেছে। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর আগামী ২৫ ডিসেম্বর দেশের মাটিতে পা রাখবেন তারেক রহমান। তফসিল অনুযায়ী কাঙ্খিত জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী।
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কারাবাস ও নির্যাতনের শিকার হয়ে গুরুতর অসুস্থ তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান। এরপর দীর্ঘ দুঃশাসনকালে রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে তার দেশে ফেরার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সময়ে সরাসরি দেশের রাজনীতিতে উপস্থিত না থেকেও দলীয় কর্মকাণ্ডে তিনি দূর থেকেই ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর দলের প্রধানের হাল ধরেন তিনি। তার নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলন, নির্বাচন বর্জন, রাজনৈতিক মামলা ও নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে বিএনপি। দলের সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রাখা, ভার্চুয়াল মাধ্যমে দলীয় সভা পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক মহলে দলের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর পাশাপাশি নিখুঁত যোগাযোগ রেখেছেন দেলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীর সাথে। যার ফলে প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাহিরে থেকেও সাংগঠনিকভাবে অক্ষত ছিল বিএনপি।
জুলাই-আগস্টে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারি শাসনের পতনের পর প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর হলেও নানারূপ আশঙ্কা— দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, নিরাপত্তা হুমকি, সেনাশাসনের সম্ভাবনা ইত্যাদি মাথাচাড়া দিচ্ছিল। তবে অভ্যুত্থানের অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের ফলে সেসকল আশঙ্কা পেড়িয়ে গণতন্ত্রিক উত্তরণের পথে এগিয়েছে দেশ।
সম্প্রতি বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় তারেক রহমানের দেশে ফেরার গুঞ্জন জোড়ালো হচ্ছিল। এ বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ২৯ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল বক্তব্যে তিনি জানান তার দেশে ফেরার বিষয়টি একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। এতে বিভিন্ন মহলে নানা রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের আগে তিনি দেশে ফিরবেন কিনা তা নিয়েও তৈরি হয় ধোয়াশা । সবকিছু ছাপিয়ে শুক্রবার দলের পক্ষ থেকে তার দেশে ফেরার ঘোষণা দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
একটি বৃহৎ দলকে নির্বাসন থেকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য তো বটেই, বিগত বছরগুলোতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব সর্বমহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে আরো নানা কারণে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে ইতিমধ্যেই তিনি ব্যতিক্রম নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তার নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা এবং গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রতিফলন, যেটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই অনুপস্থিত। বিগত আওয়ামী লীগের দুঃশাসনকালে লোকদেখানো এবং বাহ্যিক উন্নয়ন দেখিয়ে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাত প্রায় ধ্বংস করা হয়েছে। এরকম ধ্বংসপ্রায় খাতগুলোর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা পেশ করে আসছে বিএনপি।
গতানুগতিক কাঁদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার বার্তাও দিয়েছেন তারেক রহমান। তার সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্য থেকে তা অনুমেয়। গত অক্টোবরে বিবিসি বাংলাকে দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তার স্বচ্ছন্দ, বলিষ্ঠ এবং স্পষ্ট প্রশ্নোত্তর দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর গণমাধ্যমকে দেয়া সেই সাক্ষাৎকরে তিনি তার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ রাখেননি। প্রশ্নের উত্তরে সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন ব্যক্তি ও দলের আদর্শিক অবস্থান এবং দেশ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা। তার প্রদত্ত পরিকল্পনা এবং বার্তা অনুযায়ী যদি তিনি কার্যক্রম হাতে নিতে সক্ষম হন, তাহলে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতিসহ সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তন সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিবে।
তবে এসকল আশা-আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এক পাশে রেখে এই মূহুর্তে ২৫ ডিসেম্বর নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় বিএনপি এবং তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা। একই সাথে দলমত নির্বিশেষে দেশের সাধারণ মানুষও তাকিয়ে আছেন তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস-পর্ব শেষে স্বদেশ ফেরার পথের দিকে। ওপারে বসে হয়তো কোনো পতিত ফ্যাসিস্ট হিংসার আগুনে জ্বলছে অথবা নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে।