
উপ-সম্পাদকীয় পাতায়
গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল:
১৯১৯ এর গোড়ার দিকে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানাধীন ভিরিচখা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ক্ষণজন্মা এই মহান ব্যক্তি। পিতার নাম হাজী এরশাদ আলী ও মাতার নাম হাজেরা বেগম। চার-পাঁচ বছর বয়সেই মায়ের ইন্তেকাল হয়ে যায়। এরপর তিনি নানির কোলে লালিত হন। লৌহজং থানাধীন কলমা নামক গ্রামে ছিল তার মাতুলালয়। এই গ্রাম্য পরিবেশেই কাটে তার শৈশবের প্রাথমিক দিনগুলো। কিছু দিনের ব্যবধানে নানিজানের ইন্তেকাল হয়ে যায়। নানির ইন্তেকালের পর পিত্রালয় ভিরিচখা গ্রামে ফিরে আসেন এবং সম্পর্কের এক দাদির কোলে লালিত হতে থাকেন। ইতিমধ্যে ৫-৬ বছর বয়স থেকেই মসজিদের মক্তবে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়ে যায়। বয়স যখন ৭-৮ বছর তখন গ্রাম ছেড়ে পিতার সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে চলে যান এবং মুজাহিদে আযম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ: এর হাতে সর্পিত হন।
গ্রামের মসজিদের মক্তবেই শুরু হয়েছিল তার পড়ালেখা। অক্ষরজ্ঞান থেকে কুরআন শরিফ নজরানা পর্যন্ত সেখানেই শিক্ষা গ্রহণ করেন। তবে তার নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে জামিয়া ইউনুসিয়াতে আল্লামা ফরিদপুরী (রহ:) এর হাতে। শাইখুল হাদীস (রহ:)- এর বিশেষ সৌভাগ্য এই ছিল যে, শিক্ষাজীবনের সূচনালগ্নেই আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী(রহ:)-এর মতো মানুষ গড়ার এক মহান কারিগরের হাতে সোপর্দ হয়ে ছিলেন। শুধু তাই নয়, এই সৌভাগ্য তার অব্যাহত ছিল শিক্ষাজীবনের সমাপ্তিকাল পর্যন্ত বরং শিক্ষকতা ও কর্ম জীবনেরও দীর্ঘ একটি সময় অবধি। এভাবে ছোট্ট শিশুকাল থেকে তিলে তিলে তাকে গড়ে তুলে ছিলেন আল্লামা ফরিদপুরী (রহ:)।
মূলত শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ:) এর শিক্ষাজীবন পর্যালোচনা করে বলা যায়, তিনি মূলত কোনো প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ:) ছাত্র। তাই আল্লামা ফরিদপুরী (রহ:)-এর সাথেই আবর্তিত ছিল তার শিক্ষাজীবনের সময়কাল। যেখানে আল্লামা ফরিদপুরী(রহ:) সেখানেই আজিজুল হক এই ছিল ওস্তাদ ও ছাত্রের সমীকরণ। সেই সূত্রে প্রাথমিক শ্রেণী সমূহের কিছু লেখাপড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের জামিয়া ইউনুসিয়াতে হয়েছে। এরপর জামিয়া ইউনুসিয়ার কর্তৃপক্ষের সাথে মত পার্থক্যের কারণে আল্লামা ফরিদপুরী(রহ:) তার অপর দুই সাতী হাফেজ্জী হুজুর (রহ:) ও পীরজি হুজুর (রহ:) সহ জামিয়া ইউনুসিয়া থেে ক ইস্তফা দিয়ে চলে আসেন। উস্তাদের সাথে সাথে ছাত্র আজিজুল হকও ইউনুসিয়া থেকে বিদায় নেন। এরপর নতুন মাদরাসার সন্ধানে কিছুদিন খুলনা জেলার গজারিয়া নাম প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কাটাতে হয়েছে। এরপরই এই তিন বুযুর্গ সিদ্ধান্ত নিলেন তদানীন্তন পূর্ব বাংলার প্রাণকে› দ্র ঢাকা শহরের কোন দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী ঢাকার বড় কাটারায় গড়ে উঠে মাদারে ইলমি আশরাফুল উলূম মাদরাসা। এখানেই শিক্ষা জীবনের মূলপর্ব অতিক্রম করেন শাইখুল হাদীস (রহ:)। আল্লামা ফরিদপুরী (রহ:) এর সার্বিক তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি নিচের জামাতগুলোতে পড়ার সময় আল্লামা রফিক আহমদ কাশ্মীরী (রহ:) নাম এক খাছ বুযুর্গ উস্তাদের বিশেষ তত্ত্বাবধান লাভ করেন।
ইত্যাবসরে এতদঞ্চলে ইলমেদ্বীনের খেদমতের লক্ষ্যে ঢাকায় তাশরিফ আনেন আল্লামা যফর আহম্মদ উসমানী(রহ:)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা আলিয়া মাদরাসার পাশাপাশি আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসায় হযরতের শিক্ষকতার কাজ চলে। এটা ১৯৩০ এর দশকের কথা। এর পর ১৯৪০ বা ৪১ সালে বড় কাটারা মাদরাসায় আল্লামা যফর আহম্দ উসমানী (রহ:) এর নিকট তাফসিরে বায়যাবি এবং তিরমিজি ও বুখারী শরিফের সবক পড়েন। এভাবেই আল্লামা উসমানী (রহ:) এর নিকট সবক পড়ার মধ্য দিয়ে বড় কাটারা মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস সমাপ্ত করেন।
ঢাকার বড়কাটারায় দাওরায়ে হাদিস পড়াকালীন সময়ে হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ সমূহের মধ্যে বিশেষ ভাবে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী(রহ:) এর ‘ফতহুল মুলহিম শরহে মুসলিম’ মুতালার মাধ্যমে হযরত শাইখুল ইসলাম (রহ:) এর প্রতি বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি হয়ে যায়। এবং হযরতের নিকট পুনঃ বুখারি শরিফ পড়ার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। হযরত শাইখুল ইসলাম (রহ:) তখন ভারতের সুরত জেলার অর্ন্তগত মশহুর এদারাহ জামিয়া ইসলামিয়া ডাভেল মাদরাসায় বুখারি শরিফের দরস দিনে। শাইখুল হাদীস(রহ:) ঢাকায় দাওরায়ে হাদীস একবার পড়ার পর ১৯৪২ সালে জামিয়া ইসলামিয়া ডাভেল মাদরাসায় গমন করেন এবং সেখানে দ্বিতীয়বার বুখারি শরিফ পড়েন হযরত শাইখুল ইসলাম শাব্বীর আহমদ উসমানী (রহ:) এর বিশিষ্ট খলীফা হযরত মাওলানা আসআদুল্লাহ (রহ:) এর নিকট রমজানে এক মাসের সোহবত হাসিল করেন এবং আহাদিসে মুসালসালাতের’ সনদ অর্জন করেন।
হযরত শাইখুল ইসলাম (রহ:) দশ-এগার বছর বুখারী শরীফের দরস দিয়েছেন। ১৯৪২ এর দরসই ছিল হযরতের আখেরি দরস। এরপর হযরত পাকিস্তান আন্দোলন এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানে ইসলামি হুকুমত বাস্তবায়নের কাজে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েন যে, পুনর্বার আর বুখারির দরস দেওয়ার সুযোগ হয়ণি। এ বছরই হযরতের বিশেষ আগ্রহে শাইখুল হাদীস(রহ:) হযরতের দরসের তাকরীর লিপিবদ্ধ করেন। এই তাকরীরের ওপর নযরে সানী ও আরও একটি কপি তৈরী করার জন্য হযরত শাইখুল ইসলাম (রহ:) শাইখুল হাদীস (রহ:) কে নিজের বাড়িতে এক বছর রেখে দেন। হযরতের বাড়ী ছিল দারুল উলুম দেওবন্দের কাছে। সেই সূত্রে দারুল উলূমে দাওরায়ে তাফসিরে দাখেলা নিয়ে নেন। শাইখুত তাফসির হযরত মাওলানা ইদরীস কান্দলভী (রহ:) তখন দাওরায়ে তাফসিরের মুশরিফ এবং খান উস্তাদ ছিলেন। এভাবে দারুল উলূমে এক বছর তাফসির পড়েন এবং এই সুযোগে হযরত হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ:) এর হাদিসের দরসেও মাঝে মাঝে শামিল হয়ে যান। দারুল উলূম দেওবন্দে দাওরায়ে তাফসিরে পড়ার মাধ্যমেই হযরতের নিয়মতন্ত্রিক শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
ইন্তেকালের সময় ১৩ জন সন্তানের পাশাপাশি ১৬০ জন নাতি-নাতনি রেখে গেছেন। তার ঔরষজাত এই সন্তানদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন হাফেজে কুরআন, আরও বহু পরিমাণ অধ্যয়নরত রয়েছেন। জীবদ্দশায় নিজ সন্তান সন্তুতিগণকে এরূপ সুশিক্ষা ও দ্বীনের পথে পরিচালিত করার বিষয়টি দ্বীন ও দ্বীনি শিক্ষার প্রতি হযরত শাইখুল হাদীস (রহ:) এর তীব্র আগ্রহ, অদম্য সংকল্প ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার পাশাপাশি আদর্শ পরিবার গঠনে তার অনবদ্য সাফল্যের স্বাক্ষর বহন করে।
শিক্ষক হিসেবে ছাত্র সমাজের কাছে তার যে তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল, সেও আরেও বিস্ময়কর ব্যাপার। সমকালীন সময়ে এর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন। ছাত্র গড়ার নিপুন কারিগররূপেই তিনি তার ছাত্রদের হৃদয়ের মণিকোঠায় অমর হয়ে থাকবেন। সুধীর্ঘ প্রায় সত্তুর বছরের শিক্ষকতাকালে তিনি বিভিন্ন সময়ে ঢাকার আশরাফুল উলূম বড় কাটারা, জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ, জামিয়া ইসলামিয়া তাঁতিবাজার, জামিয়া নূরিয়া আশরাফাবাদ কামরাঙ্গীরচর, জামিয়া মোহাম্মদিয়া আরাবিয়া, জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মোহাম্মদপুর, জামিয়া শরইয়্যা মালিবাগ, জামেউল উলূম মিরপুর-১৪, দারুস সালাম মিরপুর, জামিয়া নূরিয়া আরিচপুর টঙ্গী, জামেউল উলূম মিরপুর-১৩, জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া, জামিয়া মোহাম্মদিয়া বনানী ও ঢাকার বাইরে বরিশাল মাহমুদিয়া মাদরাসায় বুখারি শরিফের শিক্ষাদান করেন। এ ছাড়াও খন্ডকালীন শিক্ষকরূপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন।
দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে শিক্ষকতার পাশাপাশি দেশসেবা একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও তিনি গড়ে তুলেছেন। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া মোহাম্মদিয়া আরাবিয়া, যে প্রতিষ্ঠান ১৯৮৮ থেকে জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া নামে পরিচালিত হয়। তার সূচক পরিচালনায় জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়। শেষ জীবনে তিনি দ্বীনি ও সাধারণ শিক্ষার কার্যকর সমন্বয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং সে লক্ষ্যে ১৯৯৯ সনে জামিয়াতুল আযীয গড়ে তোলেন। জামিয়াতুল আযীয শিক্ষা ক্ষেত্রে এক নতুন দৃষ্টান্ত। ১৯৮৫-৮৬ সালে তিনি লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়ার প্রিন্সিপাল ছিলেন। জামিয়া রাহমানিয়ায় এসে হযরত শাইয়খ (রহ:) “শাইখ জামিয়া” পদবীতে ভূষিত হন। ৯৫-৯৬ সালে মালিবাগ জামিয়া শরইয়্যাহর প্রিন্সিপাল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেণ। এ ছাড়াও সারা দেশে বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের কওমি মাদরাসা সমূহের ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৯৯৯মালে আল আরাফ ইমলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময়ে হযরত শায়েখ (রহ:) এর শরিয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং ব্যাংকের যাবতীয় কর্মকান্ডে শরিয়া পরিচালনা কঠোরভাবে তত্ত্বাবধান করেন।