
ত্বাইরান আবির
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক গণভোটকে সফল, স্বচ্ছ এবং জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পরিচালিত করতে সরকার, নির্বাচন কমিশন (ইসি), আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান পূর্ণ প্রস্তুতিতে রয়েছে। ভোটগ্রহণের সুষ্ঠু প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন শুধু প্রশাসনিক দিক-নির্দেশনা নয়, বরং সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গ্রহণযোগ্যতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উদ্যোগগুলোকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা, আইনি ব্যবস্থা, নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিচালনাগত সমন্বয়সহ বহু স্তরে কাজ করছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ইসি কোনো বোঝা বা প্রভাবের নিচে নেই এবং তারা নিজেদের সাংবিধানিক কর্তব্য সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পালন করছে। ইসি সদস্য আব্দুর রহমান মাসুদ জানিয়েছেন, ‘আমরা কোনো চাপ অনুভব করছি না এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছি, যাতে ভোটকেন্দ্রে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন।’
ইসি ইতোমধ্যেই প্রতিটি ঘর তালিকাভুক্ত করে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেছে, মৃত ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং পুরুষ ও মহিলা ভোটারের অনুপাতের অসমতা সমন্বয় করা হয়েছে, যাতে ভোটারগণ নিখুঁত ভোটদানের সুযোগ পান।
ইসির পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে যে নয়টি আইনি সংশোধনী প্রস্তাব চলছে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে ইসি আচরণবিধির কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কার্যক্রম জোরদার করেছে। দলগুলো ইসি’র কাছে অনুরোধ করেছে অবৈধ অস্ত্র, অমিল অর্থ ও দলীয় পেশী শক্তির বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য, যাতে নির্ভয়ে ভোট প্রদান সম্ভব হয়।
সরকার কর্তৃক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা একসাথে সমন্বয় করে নিরাপদ ভোটিং পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে। বিভিন্ন সংস্থা পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ইত্যাদি মিলিয়ে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
নির্বাচনকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশের মধ্যে বডি ক্যামেরা ব্যবহার, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর ডিরেক্টর জেনারেল বলেছেন, বিজিবি পেশাদারি ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা রেখে শান্তিপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
ফৌজদারি পরিস্থিতি ও ভোটকেন্দ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পর্যবেক্ষণ অভিযান পরিচালনা করবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
সরকার ও ইসি নির্বাচনের সমস্ত পরিকল্পনা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সম্পন্ন করার উপর জোর দিচ্ছে। আগস্ট ২০২৫ থেকে প্রশাসনিক পর্যায়ে তফসিল প্রকাশ ও কাজগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্কিলড প্রশাসন ও পুলিশকে নির্বাচন সুষ্ঠু সম্পাদনের বিষয়ে নানামুখী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে ভোটাররা বাধা ছাড়া ভোট দিতে পারেন।
নির্বাচন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্তব্য করেছেন যে, ‘স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এবং সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করেছে যা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আশা করি সুন্দর নির্বাচন উপভোগ করতে পারবে সবাই।’
একইসাথে কিছু নাগরিক সংগঠন, বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক দল বলছে, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করা না হলে নির্বাচন সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে না এবং তারা সরকারের ভূমিকার উপর আরও গভীর বিশ্বাসের দাবি করে।
ইসি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটারদের বার্তা দেওয়া হয়েছে, তারা ভোট দিতে নির্ভয়ে অংশ নিতে পারবেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা তাদের মৌলিক নাগরিক কর্তব্য।
নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ভোটাধিকারকে উন্নত করার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং জনগণ তাদের ভোটাধিকার সম্পর্কে পূর্ণভাবে অবহিত হয়।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নানামুখী উদ্যোগ- আইনি প্রস্তুতি, নিরাপত্তা জোরদার, প্রশাসনিক নির্দেশ, ইসির স্বাধীন ভূমিকা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার- সবমিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যার লক্ষ্য নির্বাচনী পরিবেশকে নিরাপদ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করা।
তবে এটি যাচাই-যোগ্য যে, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পদক্ষেপগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, কোড অফ কন্ডাক্ট মানা এবং ভোটারদের পূর্ণভাবে ভয়হীন পরিবেশে ভোট প্রদান, এসব বিষয়গুলোই ভোটের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
সবমিলিয়ে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এর নির্বাচন ও গণভোট শুধু একটি সাংসদ নির্বাচন নয়, বরং বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মৌলিক ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার একটি পরীক্ষাও বটে।