
শোভন সারোয়ার:
জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র-নজরুলের পর সর্বাধিক জনপ্রিয় ও বিখ্যাত কবি। জীবনানন্দ দাশকে আমরা কবি হিসেবেই জানি। কিন্তু তাঁর যে আরো কিছু পরিচয় থাকতে পারে, প্রায় অজানাই থেকে যেত যদি না তাঁর মৃত্যুর পর চারটি ট্রাঙ্ক আবিষ্কৃত হতো। জীবনানন্দ দাশ প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ- নিবন্ধ রচনা করেছিলেন। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে অকাল মৃত্যুর পূর্বে তিনি ২১টি উপন্যাস এবং ১২৬টি ছোটগল্প রচনা করেছিলেন, যার একটিও তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে তিনি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন এবং ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে যখন তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছিল, ততদিনে তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবিতে পরিণত হয়েছেন। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গ জগৎ জীবনানন্দের কাব্যে হয়ে উঠেছে চিত্ররূপময়, তাতে তিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ অভিধায় খ্যাত হয়েছেন। বুদ্ধদেব বসু তাঁকে নির্জনতম কবি বলে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে, অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁকে ‘শুদ্ধতম কবি’ অভিধায় আখ্যায়িত করেছেন।
কবি জীবনানন্দ দাশের নামটি বিক্রমপুরের ইতিহাসে অংশ হয়ে আছে বিশেষ কারণে। জীবনানন্দ দাশ বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করলেও তার পূর্বপুরুষগণ ছিলেন বিক্রমপুর অঞ্চলের অধিবাসী । তৎকালীন বিক্রমপুর পরগণার গাঁওপাড়া গ্রামে (বর্তমান লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ এলাকায়) তাদের ভিটে ছিল, যা এখন কীর্তিনাশা পদ্মায় বিলীন হয়ে গিয়েছে। কবির পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৩৮-১৮৮৫) বিক্রমপুর থেকে বরিশালে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন? সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। কবির ঠাকুমা অর্থাৎ সর্বানন্দ দাশের স্ত্রীর নাম ছিল প্রসন্নকুমারী দাশ। তাঁর মুখ থেকে জীবনানন্দ শৈশবে বিক্রমপুর আর পদ্মা নদীর অনেক গল্প শুনেছিলেন। সে সব গল্পের মধ্যে ছিল অষ্টাদশ শতকের রাজা রাজবল্লভের স্মৃতি, যাঁর একুশ চূড়াযুক্ত প্রাসাদকে বলা হত ‘একুশ রত্ন’। সেই স্মৃতিই পরবর্তীকালে উঠে এসেছে কবির রূপসী বাংলা কবিতায়। কবি লিখেছিলেন-
“তবু তাহা ভুল জানি-রাজবল্লভের কীর্তি ভাঙে কীর্তিনাশা; তবুও পদ্মার রূপ একুশরত্নের চেয়ে আরো ঢের গাঢ়” (রূপসী বাংলা) জীবনানন্দের পিতামহ সর্বানন্দ দাশ সরকারি চাকরি করতেন। সেই সুবাদে কীর্তিনাশার পাড়ে গাঁওপাড়া গ্রামটি কীর্তিনাশার জলে তলিয়ে যাওয়ার অনেক আগেই সর্বানন্দ দাশ ‘কার্যোপলক্ষে’ বরিশাল শহরে যান। বরিশাল শহরে এসে তিনি নব্য ভাবধারায় উজ্জীবিত হন, অর্থাৎ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। দাশ পরিবারের উপাধি ছিল দাশগুপ্ত । সর্বানন্দ দাশ উপাধি থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দটি ছেঁটে ফেলেন, কেবলই ‘দাশ’ লিখেন। এরপর তাঁর বিক্রমপুরের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক আর রইল না। পরবর্তীকালে জীবনানন্দ দাশ বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএ পাশ করে চলে যান কলকাতায়। জীবনানন্দ দাশ দুই বাংলার বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
“আ পোয়েট আপার্ট” নামের একটি গ্রন্থে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে ইংরেজিতে লিখেছেন মার্কিন লেখক ক্লিনটন বি সিলি ।
কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় অসুস্থ হয়ে ২২ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে জীবনকাল সমাপ্ত হয় এই প্রবাদপ্রতিম কবির।
লেখক: অফিস সম্পাদক, ঝিকুট ফাউন্ডেশন sarwarhshovon@gmail.com