
ফারদিন হাসান আবির
“১৬ জুলাই, ২০২৪” রাজনীতির আবেশ থেকে বহু দূরে থাকা এক সাধারণ ছেলের পাল্টে যাওয়া জীবনের শুরু! দুটি অংশে আমি এই দিনের আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো ভাবছি। এই অংশে আমি ১৬ জুলাইয়ের আন্দোলন পরবর্তীতে আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা শেয়ার করবো যা সম্পর্কে আগে কখনো লিখিনি এবং সেই সময়ে উপস্থিত থাকা কয়েকজন ছাড়া তেমন কেউ জানেও না এই ঘটনা সম্পর্কে। তবে আজ শেয়ার করতে ইচ্ছে করছে।
বেলা ১২.৩০/১ টার দিকে হবে। সুপারমার্কেট থেকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে কোটাবিরোধী আন্দোলনের প্রথম দিন মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রেস কনফারেন্স শেষ করে আমি ও আমার চার বন্ধু (Ashikur Rahman Ashik মোহাম্মদ নিরব হোসেন Ajmain Hossain Mehebub Rozan Gunjon) সরকারি হরগঙ্গা কলেজের দিকে যাচ্ছিলাম। সবে মাত্র কলেজের গেইট অতিক্রম করেছি, সাথে সাথে কলেজের ছাত্রলীগ কর্মীরা আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলো যেন ওরা আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলো। পরবর্তীতে জানতে পারলাম তৎকালীন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতিসহ সবাই আমাকে ধরে আনার জন্য লোক পাঠাইছে কিন্তু ফরচুনেটলি আমিই কলেজে চলে আসছি। আমাকে দেখামাত্রই রাগান্বিত কণ্ঠে বলা হলো, “তরে ভাইয়ে খুঁজে। যা ভিতরে যা!” আমি একবিন্দুও ভয় না করে একাই ঢুকে গেলাম কলেজের লাইব্রেরির ভিতরে। ঢুকতে ঢুকতে দেখলাম আশেপাশে হকিস্টিক, বাঁশসহ অন্যান্য অস্ত্র রেডি করা আছে। আগে থেকে রাউন্ড আকারে সেট করে রাখা চেয়ারসমূহের মাঝে একটা চেয়ারে আমাকে বসানো হলো। আগেই বলেছি রাজনৈতিক মারপ্যাচ থেকে দূরে থাকায় এসব অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনোই ছিলো না। স্বভাবতই এসব সেটআপ দেখে আমার ঘাবড়ে যাবার কথা কিন্তু আল্লাহর মেহেরবান কেন জানি বিন্দু পরিমাণ ভয় কাজ করলো না। পরক্ষণেই দেখলাম আমার বন্ধু আশিক আর নীরবও রুমে ঢুকে পরছে। ওদের কিন্তু ভিতরে ঢুকতে বলে নাই। আমাকে নিয়া আসছে বিধায় ওরাও রুমে ঢুকে পরছে। কাজ থাকায় ওরা দুইজন কিন্তু সেদিন বিক্ষোভ মিছিলেও অংশ নেয় নাই। ওদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের কোনো ক্ষোভও ছিলো না, কিন্তু তবুও ওরা আমার জন্যই রুমে ঢুকছে।
এরপর শুরু হয় আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ। প্রথমে ওরা জানালো কয়েকজন ছেলে নাকি কলেজে এসে বলছে আমি ওদেরকে আন্দোলনে আসতে বলছি অথচ সত্যি বলতে সেদিন আমি কাউকেই আসার জন্য বলি নাই। আমি নিজ থেকে গিয়েছিলাম শুধুমাত্র ১৫ জুলাই ঢাবির মেয়েদের গায়ে ছাত্রলীগের নৃশংস হামলার প্রতিবাদ জানাতে। যাইহোক, এরপর ওরা জানায় যে ওরা এতক্ষণ ফেসবুকে লাইভ দেখছে। আমি সামনে থেকে কেন নেতৃত্ব দিলাম এবং তাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সামনে কথা কেন বললাম এটা ছিলো আমার দোষ। আমার প্রতি সবচেয়ে বেশী ক্ষোভ ছিলো এই কারণে যে আমি ছাত্রদের মিছিলটা কাচারির পর পতাকা একাত্তর ভাস্কর্যের দিকে অগ্রসর হতে না দিয়ে কেন শহীদ মিনারে অবস্থান নেয়ালাম। কারণ পতাকা একাত্তর ভাস্কর্যের ওদিকে টোকাইদের দিয়ে আগেই তারা ছাত্রদের ওপর হামলা করানোর জন্য সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখছিলো। সাংবাদিক Arafat Rayhan Sakib ভাইয়ের কাছে এই নিউজ পাওয়ার পরই আমি প্রথমবার মিছিলের সামনে গিয়েছিলাম ও সবাইকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং পতাকা একাত্তর ভাস্কর্যের অভিমুখে না গিয়ে শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়েছিলাম। নাহলে হয়তে ১৭ জুলাইয়ের হামলাটা ১৬ জুলাইয়েই হতো।
এরপর আমার ফোন চেক করা হয়। ফোনে একাধিক গ্রুপে আমার অবস্থান ওরা দেখতে পারে, কয়েকটা গ্রুপের মেসেজ পড়ে। এর মধ্যেই বন্ধু আজমাইনও আমার জন্য ভিতরে চলে আসে। হঠাৎ একজন আমার ছবি তুলতে থাকে এবং আরকেজন ভিডিও কলে মুন্সীগঞ্জের ছাত্রলীগের টপ ক্যাডারকে আমাকে দেখায়। সে ভিডিও কলে বলছিলো, “ওরে রাইখা দে। অনেক দিন হইছে মানুষের মাংস খাই না। আজকে ওরটা খামু।” এই কথা শোনার পর আমার মতো ছেলের ঘাবড়ে যাবার কথা কিন্তু আল্লাহর কসম এক বিন্দুও ভয় কাজ করে নাই ওই মুহুর্তে। হয়তো এরকম সিচুয়েশনে ট্রমাটাইজড হয়ে কোনো অনুভূতিই কাজ করে নাই আমার মধ্যে নয়তো মনে অসীম সাহসের সঞ্চার হয়েছিলো সেদিন। এরপর একজন সিনিয়র ছাত্রলীগ কর্মী আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা যেকোনো সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে তোমাদের ব্যাচটা অনেক বেশী এক্টিভ। কারণটা কী?” (তার কিছুদিন আগেই সারা বাংলাদেশে যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইফতার নিষিদ্ধ করা হয় তখন আমরা কলেজে তাদের নাকের ডগায় প্রথমবারের মতো কলেজে ঘটা করে গণ ইফতারের আয়োজন করেছিলাম। তখন থেকেই ওরা আমাদেরকে মার্ক করে রাখছিলো)
আমি শুধু জবাব দিলাম, “আমি ভুল কিছু করি নাই। যৌক্তিক কারণেই আন্দোলন করছি। ভুল মনে হলে শাস্তি দিতে পারেন।” সাথে সাথে একজন অশ্রাব্য ভাষায় আমাকে গালি দিলো আর একজন বলে উঠলো ভাই অনুমতি দেন কয়েকটা দেই ওরে। সেখানে যেই ২৫/৩০ জন ছিলো বেশীরভাগের মুখ আমার চেনা। আমার ব্যাচমেটের সংখ্যাই বেশী ছিলো। আমরা একসাথে কে.কে স্কুলে লেখাপড়া করছি। তখনতো আর কেউ রাজনীতি করতো না। সেদিন কেউ একবারের জন্যও আমার পক্ষে একটা কথা বলে নাই, আমার ফোনও চেক করছিলো আমার ব্যাচমেটের একজনই। এমনকি একজন বলছিলো যে আমাকে নাকি ও চিনে না! জীবনের অনেক কিছুই শিখছি সেদিন। যাইহোক, পরবর্তীতে যখন চেলাবেলারা আমারে মারতে পারতাছে না তখন আমার সাথের বন্ধু গুঞ্জনরে মারার জন্য খোঁজা শুরু করলো কারণ ও বিএনপি সনর্থন করতো। গুঞ্জন আগেই কোনো এক কাজে কলেজ থেকে চলে গেছিলো। ওই সময়েই হঠাৎ গুঞ্জন আমার নাম্বারে কল দেয় এবং আমার ফোন তখন ওদের হাতে। ওরাই তখন কল রিসিভ করে। ওই মুহুর্তে সর্বপ্রথম আমার মধ্যে ভয় কাজ করা শুরু করে। কারণ আমি জানতাম ওরা গুঞ্জনরে পাইলে আমার ওপরের সব রাগ-ক্ষোভ ওর ওপর মিটাবে। আল্লাহরই মেহেরবান ঠিক ওই সময়েই একজন পুলিশ রুমে আসে। পরবর্তীতে যতোটুকু জানতে পারছি আমারে রুমে নেয়ার পর কলেজের সিনিয়র রোভার রাকিব ভাই শ্রদ্ধেয় Shirajul Haque Monir স্যারকে বিষয়টা সম্পর্কে জানায় এবং স্যার পুলিশ আনায়। পুলিশের প্রবেশ দেখে ওরা গুঞ্জনের কলটা কেটে দেয় আর আমার ফোন আমাকে ফেরত দিয়ে এমন একটা ভান ধরে যেন এখানে কিছুই হয় নাই। তবে আমি সবচেয়ে অবাক হই তখন যখন দেখি সেই পুলিশ রুমের ভিতর ঢুকে ভিক্টিমের সাথে কোনো কথা না বলে ছাত্রলীগদের ভাই সম্বোধন করে তাদের কাছেই জিজ্ঞেস করতে থাকে যে এখানে কিছু হয়েছে কিনা, তাকে নাকি ইমারজেন্সি পাঠানো হয়েছে। পুলিশটার মাঝে একরকম বিরক্তির ভাব। আমার দিকে একবারের জন্য তাকায় নাই পর্যন্ত! তারপরও পুলিশের সেদিনের ওই টাইমিং এর জন্য গুঞ্জনের সাথে খারাপ কিছু হয় নাই। পরবর্তীতে পুলিশের সামনেই আমাদের শাসানো হয় এবং আমাকে অনেক নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। আর যেহেতু ছাত্রলীগ ও ঢাবির ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে ৩ টা পোস্ট করে ফেলছিলাম তাই ওয়ার্নিং দেয়া হয় যেন ফেসবুকে কিছু লেখালেখি না করি (যদিও লেখালেখি বন্ধ করি নাই)। বন্ধু আজমাইনের এলাকা বিএনপি এলাকা হওয়ায় ওরেও শাসানো হয়। শেষমেষ জানানো হয় হাসিনা নাকি ওদের মা। মায়ের বিরুদ্ধে গেলে সে যেই হোক না কেন লা*শ ফেলতে দ্বিতীয়বার ভাববে না। যেহেতু আমরা সবাই একদম মেইন শহরের মানুষ ছিলাম, ছোটকাল থেকে এখানেই বড় হইছি তাই আমাদেরও একটা সুপরিচিতি ছিলো। হয়তো এ কারণেই সেদিন আমাদের গায়ে হাত তুলে নাই তবে সর্বোচ্চ শাসানি দেয়া হয়। পরে বাসায় এসে কাউকে ঘটনা শেয়ার করি নাই। পরবর্তীতে কিভাবে যেন বিদেশে থাকা আমার বড় ভাইয়া ও কাজিনরা এ বিষয়ে জানতে পারে। তারা আমাকে নিয়া বিচলিত হয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় খবর আসে ডিবি/ডিএসবির লিস্টে আমার নাম উঠে গেছে। জাহিদ ভাই, শাহারিয়ার, রাজুর নামও সে লিস্টে ছিলো। ১৬ জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত কয়েকবার রাস্তার মধ্যেই আমার ফোন চেক করা হয়। এমন একটা অবস্থা হয়ে গেছিলো যে, যে যখন ইচ্ছা আমার ফোন চেক করতো। জীবনে কখনো কেউ একটা কথা শুনানোর সাহস পায় নাই সেখানে রাস্তার মধ্যে এমন অপমান সহ্য করতে পারতাম না। পরবর্তীতে একটা সময়ে বাটন ফোন নিয়ে বের হতাম।
এরপর ধাপে ধাপে সদরে ১৭ জুলাই, ১৯ জুলাই ও ৪ আগস্ট আসে। তারও আগে ১৩ জুলাই হরগঙ্গা কলেজের জামতলায় কয়েকজনের বৈঠকের মাধ্যমে আন্দোলনের বীজ বপন করা হয়। তবে প্রথম আদোলনের সূচনা ঘটে ১৬ জুলাই। আজ ১ বছর পর হঠাৎ ১৬ জুলাইয়ের কিছু স্মৃতি শেয়ার করতে ইচ্ছে করলো। জুলাই অস্বীকারকারীরা জানে না এ জুলাই কি! জুলাই সফল না হলে আমাদের অবস্থা কি হতো আল্লাহ তা’য়ালাই ভালো জানতেন। কারণ আমরা একেবারে বাঘের মুখে থেকে বাঘের বিরুদ্ধে লড়াই করছি।
জুলাই শহিদদের প্রতি জানাই অন্তরের অন্তরস্থ থেকে সম্মান ও শ্রদ্ধা! তারাই প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা। আরিফ সোহেলের মতো আমরা সবাই ওভাররেটেড!